হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনে হেরে গেলেন ‘ট্রাম্প’, শান্তিবাদীদের উচ্ছ্বাস
যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ইউরোপ। তথা, ইউরোপীয় ইউনিয়েনের (ইইউ) সদস্য দেশগুলো। কেননা, ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের জন্য ‘বাধা’ হয়ে থাকা ব্যক্তিকে সরতে হয়েছে ক্ষমতার মসনদ থেকে।
দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি হাঙ্গেরির ক্ষমতায় টিকেছিলেন। তাকে অনেকে দেখতেন ইউরোপের ঐক্যের পথে ‘কাঁটা’ হিসেবে। ইতোমধ্যে অনেকেই বুঝে গেছেন, কথা হচ্ছে হাঙ্গেরির সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানকে নিয়ে।
হাঙ্গেরির এই উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিককে জেতানোর জন্য মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত উঠেপড়ে লেগেছিলেন। এই ইউরোপীয় নেতার নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দিয়েছিলেন খোদ মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স।
গত ৭ এপ্রিল বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়েছিল: ‘ভিক্তর অরবানের পুনর্নির্বাচনে সমর্থন জানাতে জেডি ভ্যান্সের বুদাপেস্ট সফর, আবারও ক্ষোভ ঝাড়লেন ইইউয়ের ওপর।’
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—হাঙ্গেরির আইনপরিষদ নির্বাচনের ৫ দিন আগে যখন ভিক্তর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তখন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে প্রচারণায় নামেন মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি ভ্যান্স।
শুধু তাই নয়, এই মার্কিন রাজনীতিক তীব্রভাবে কটু-কথার বাণ ছুড়েন ইইউকে লক্ষ্য করে।
ভিক্তর অরবানের পাশে দাঁড়িয়ে জেডি ভ্যান্স বলেন, তিনি হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে এসেছেন ‘ভিক্তরের নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তার’ জন্য।
এ কথাও বলতে ভুলেননি, ‘নির্বাচনে জিতে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন যুক্তরাষ্ট্র তারই সঙ্গে কাজ’ করবে।
কেননা, অধিকাংশ নির্বাচন-পূর্ব জরিপে দেখা গিয়েছিল যে অরবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিটার মাগিয়ার নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছেন।
‘আপনার সেবায় নিয়োজিত’
আজ ১৩ এপ্রিল বিবিসির অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়: হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়, পিটার মাগিয়ারের হাত ধরে অরবান যুগের অবসান।
গতকাল ১২ এপ্রিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান ও লেবানন তথা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বিশ্বের সব শান্তিবাদী মানুষের চোখ ছিল হাঙ্গেরির ওপর।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য—উগ্র রক্ষণশীল বক্তব্য দিয়ে ভিক্তর অরবান দীর্ঘ ১৬ বছর জন-তোষণের মাধ্যমে নিজের শাসন বজায় রেখেছিলেন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতা থাকায় তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোয় ক্ষয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
তাই অরবানের অবসান শান্তিবাদী মানুষের কাছে একান্ত কাম্য হয়ে উঠেছিল।
গতকাল আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অরবানের পরাজয় ব্রাসেলস ও বুদাপেস্টের রাজনৈতিক দূরত্ব কমাবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আঘাত করার কারণে হাঙ্গেরির জন্য ইইউ তহবিল আটকে দেওয়া হয়। এখন সেই তহবিল ছাড়ের সুযোগ তৈরি হবে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে—ভিক্তর অরবানের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছিলেন বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর ব্যক্তি। একজন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। অপরজন, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন।
এ বিষয়ে ট্রাম্প যতটা সরব ছিলেন ঠিক ততটাই নীরব দেখা গিয়েছিল পুতিনকে।
তারা ভিন্ন ভিন্ন কারণে হাঙ্গেরির সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সখ্যতা রেখেছিলেন। অতি রক্ষণশীল রাজনীতি ও ইইউ-বিরোধী মনোভাবের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন অরবানকে ইউরোপীয় মিত্র হিসেবে দেখতো।
একই সঙ্গে, ভিক্তর অরবান ক্রেমলিনে তার বন্ধুদের সঙ্গে সখ্যতা বজায় রাখতেন।
গত ৭ এপ্রিল ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—গত অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি পুতিনকে এক ফোনে ভিক্তর অরবান বলেছিলেন, ‘আপনার সেবায় নিয়োজিত’।
তিনি রুশ রাষ্ট্রপতিকে আরও বলেছিলেন, যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, অরবানের সার্বিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইউরোপীয় জোটের সদস্যরা তাকে ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে দেখতেন।
আর তাই বুঝি, বিজয়ী পিটার মাগিয়ার উৎফুল্ল জনতার উদ্দেশে বলেন—‘আমরা সবাই মিলে অরবানকে উৎখাত করেছি। তার শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছি। সবাই মিলে হাঙ্গেরিকে মুক্ত করেছি। সবাই মিলে আমাদের দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবো।’
ট্রাম্পের পরাজয়
গত ৪ এপ্রিল দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এর গবেষণা পরিচালক জেরেমি শাপিরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাঙ্গেরিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতর ‘একটুকরো রাশিয়া’ গণ্য করা হতো।
তিনি আরও জানান, শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান সভ্যতার ‘মশাল’ তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান আধিপত্যবাদীদের শীর্ষনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মধ্য ইউরোপের এই অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিক।
আজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—২০১৫ সালে ইউরোপে অভিবাসন সংকট শুরু হলে ভিক্তর অরবান নিজেকে হাঙ্গেরির জাতীয় পরিচয় ও খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের ধারকবাহক হিসেবে তুলে ধরেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিজ নিজ দেশে নেওয়ার জন্য ইইউ যে কোটা বেঁধে দিয়েছিল তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন ভিক্তর অরবান।
এ ছাড়াও, তিনি এলজিবিটিকিউ প্লাস ব্যক্তিদের অধিকার ধীরে ধীরে কমানোর উদ্যোগ নেন। সংবাদপত্র ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ওপর হস্তক্ষেপ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাঙ্গেরির জনসংখ্যা কমে যাওয়া সত্ত্বেও ভিক্তর অরবানের কঠোর অভিবাসননীতি বহির্বিশ্বে ট্রাম্পসহ অন্যান্য রক্ষণশীল নেতাদের প্রশংসা পেয়েছিল।
ইতালির রক্ষণশীল নেতা জর্জিয়া মেলোনি, ফ্রান্সের কট্টরবাদী নেতা মারি লো পেন ও জার্মানির উগ্রবাদী বা নব্য-নাৎসি আখ্যা পাওয়া অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) নেতারা হাঙ্গেরির জাতীয়তাবাদী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
অরবানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন—যুক্তরাষ্ট্র ও হাঙ্গেরির সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায়’ পৌঁছেছে।
ওয়াশিংটনে তৎকালীন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের সঙ্গে ভিক্তর অরবানের প্রশাসনকে দীর্ঘ লড়াই চালাতে হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভিক্তর অরবান রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। যদিও, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা আছে।
একই দিনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—হাঙ্গেরিতে অরবানের পরাজয় প্রভাব ফেলছে ট্রাম্প ও মার্কিন রক্ষণশীলদের ওপর।
এতে বলা হয়, নানান কারণে ট্রাম্প হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে জোরালো সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
আরও বলা হয়, অরবান এমন এক নেতা যার পরাজয় সারাবিশ্বে আলোচিত হচ্ছে। কারণ, এই ইউরোপীয় নেতা রাশিয়ার পুতিনের বেশ ঘনিষ্ঠ। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন সত্ত্বেও অরবান সেখানে ইইউয়ের সহায়তা পাঠাতে বাধা দিয়েছেন।
হাঙ্গেরির অরবানের পরাজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের অনেকে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দুই প্রধান দলের বেশ কয়েকজন নেতা সমাজমাধ্যমে নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই নির্বাচনে হাঙ্গেরির স্বাধীনচেতা মানুষ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জয় হয়েছে।
আজ আল জাজিরার অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি তথ্য অনুসারে—প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোট হিসাব করে দেখা গেছে যে পিটার মাগিয়ার দল দেশটির পার্লামেন্টে ১৯৯ আসনের মধ্যে ১৩৮টিতে জয় পেয়েছেন। অরবানের দল পেয়েছে ৫৫ আসন।
এর মাধ্যমে হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনে ট্রাম্পপস্থি অরবানের পরাজয় নিশ্চিত হয়। আর এতে স্বস্তি পান সারা দুনিয়ার শান্তিপ্রিয় মানুষ।




