গণভোট: এক প্রশ্নের পিঠে সাতচল্লিশ প্রস্তাব
আসন্ন গণভোটটি একদিক থেকে ব্যতিক্রমী। কারণ এই গণভোটে শেষ রায় নাগরিকের হাতে থাকছে না। ভোটারের কাছে সাধারণত পুরো প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে হ্যাঁ বা না বলার যে এখতিয়ার থাকে, তা এখানে থাকছে না। বরং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে একটি প্রক্রিয়ার সূচনা হবে। সাধারণত কোনো একটি বিষয় জনপরিসরে আলোচিত হয়, সমালোচিত হয়, তারপর এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার পরই, অর্থাৎ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে গণভোটের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রের নাগরিকেরা তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এটি তারা গ্রহণ করবেন নাকি প্রত্যাখ্যান করবেন।
কিন্তু এবারে সেটি হচ্ছে না। এখানে ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হবে তারা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশ এবং সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে এমন প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেন কি না। এরকম একটি ধাঁধাঁর মতো প্রশ্নের নিচে কয়েকটি প্রস্তাব সংক্ষেপে লেখা থাকবে।
এখানে বাস্তবায়ন আদেশে একাধিক ধাপের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আরেকটি আদেশ জারি করে গণভোটের বিস্তারিত ঘোষণা, একটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠন (এটি কার্যত সংসদের আরেক রূপ), সেই পরিষদের সময়সীমা নির্ধারণ এবং পরবর্তীতে তা বিলুপ্ত করা এবং একটি উচ্চকক্ষ গঠনসহ অন্যান্য ব্যবস্থা।
গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি ইতিমধ্যেই জারি করা হয়েছে। এটি নির্বাচন কমিশনকে ভোট আয়োজনের আইনি ভিত্তি দিয়েছে। কারণ বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই। এই কারণেই এই আইনি কাঠামোকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়েছে।
এ আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অর্থাৎ ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১৫১ ভোট পেলেই জুলাই সনদের সুপারিশগুলো অনুমোদন করতে পারবে। এটি কার্যত সংবিধান সংশোধনের শামিল হবে। পরিষদের কাছে সব সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য ১৮০ কার্যদিবস সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এতে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিষদ ব্যর্থ হলে বা জুলাই সনদের সব বিষয় নিয়ে কাজ না করলে কী হবে, সে বিষয়ে আদেশে কোনো প্রকার দিকনির্দেশনা নেই।
পরিষদ বিলুপ্ত হওয়ার পর তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং গেজেট আকারে তা প্রকাশ করা হবে। ফলে চূড়ান্তভাবে সংবিধানের ভাষ্য কেমন থাকবে তা আগাম বলা সম্ভব নয়। তবে ভোটাররা যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, তাহলে সেই ফলাফলের ওপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
অন্যদিকে ‘না’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংস্কার প্রক্রিয়াটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে, যেটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি মূল দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
ব্যালটে সংক্ষিপ্তভাবে যে কয়েকটি প্রস্তাবের উল্লেখ রাখা হয়েছে, এগুলোকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো পড়ে কিন্তু বোঝার উপায় নেই যে এই বিষয়ে পরে পরিষদে বিতর্ক হবে, ভোটাভুটিও হবে। সরকার প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে বলেছে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদ পরাজিত হবে। যারা সংস্কার চান তাদের অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে।
কিন্তু জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত পুরো প্রক্রিয়া বা সব ব্যবস্থার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে এতগুলো বিষয় একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা স্বভাবতই কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যালটের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।’
এর পরের অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।’
একবার পড়লে মোটামুটি ধারণা করা যায় একেকটি বিষয় পরস্পরের থেকে একেবারে আলাদা। কোনোটা ব্যাপক সমর্থন পেতে পারে, আবার অনেকগুলো নাও পেতে পারে। কিছু প্রস্তাব পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় দিকেই প্রবল অনুভূতি ও আবেগ সৃষ্টি করতে পারে, আবার কিছু বিষয় তেমন সাড়া জাগাবে না। কোনো একটি প্রস্তাব কারও কাছে অত্যাবশ্যক মনে হতে পারে, আবার অন্যের কাছে অগ্রহণযোগ্যও মনে হতে পারে। আবার অনেকের কাছে এটি যেকোনো মূল্যে অক্ষুণ্ণ রাখতেই হবে এমনটিও বিবেচিত হতে পারে। তবু ব্যালটে এসব পার্থক্য প্রতিফলিত হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এর ফলে এই গণভোট নাগরিকদের একটা শৃঙ্খলের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সবাইকে যেন একটু ছাড় দিতে বলা হচ্ছে। একটু মানিয়ে নিতে বলা হচ্ছে। বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও, বেশ কিছু প্রস্তাব অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে হচ্ছে। নয়তো কিছু প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলেও তাদের পুরোটা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল তাতে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নিশ্চিত করা ছিল না, ছিল সংখ্যালঘুদের স্থান দেওয়া। একই সঙ্গে এটি ছিল প্রত্যেক নাগরিকের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সর্বাত্মকভাবে গ্রহণযোগ্যতা চাপিয়ে না দেওয়া। অথচ সংস্কারগুলো যেভাবে একত্রে প্যাকেজ করা হয়েছে তাতে এই গণভোট নাগরিকদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কঠিন করে তুলেছে। নাগরিকদের ‘না’ বলার অধিকার বা স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়নি বটে, কিন্তু ‘না’ বলার স্বাচ্ছন্দ্য যেন নেই।
একনজরে আগের গণভোটগুলো
সর্বশেষ গণভোট আয়োজনের তিন দশকেরও বেশি সময় পরে বাংলাদেশ আবার একটি গণভোটের মুখোমুখি হচ্ছে। এবারের বিষয় জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক প্রশ্ন। পূর্ববর্তী তিনটি গণভোটই এমন একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে হয়েছিল যখন শাসকেরা নিজেদের শাসনব্যবস্থা বা নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন।
১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোটকে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক সরকারকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল। তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এই গণভোটটি ছিল একটি সাংবিধানিক উদ্যোগ, যা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত করে।
প্রথম গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। এই গণভোটে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও তার গৃহীত নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতি আস্থা রাখেন?’
এই গণভোটের সময় দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৮ জন। গণভোটে ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ভোটদানকারীদের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন। ‘না’ ভোট দিয়েছিলেন বাকি ১ দশমিক ১২ শতাংশ ভোটার।
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। এই গণভোটে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গৃহীত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা রাখেন, এবং সংবিধান স্থগিত থাকা অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার থাকার বিষয়ে সমর্থন করেন?’
এই গণভোটের সময় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৯৬৪ জন। গণভোটে ভোট দিয়েছিলেন ৭২ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোটার। যার মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন ৯৪ দশমিক ১১ শতাংশ ভোটার। ‘না’ ভোট দিয়েছিলেন ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোটার।
তৃতীয় গণভোট আয়োজিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এই গণভোটে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধনী) বিল, ১৯৯১ এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি কি দেওয়া উচিত?’ এই গণভোটের সময় দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২২ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন। যার মধ্যে ৩৫ দশমিক ১৯ শতাংশ ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছিলেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার। না ভোট দিয়েছিলেন ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোটার।
তথ্যসূত্র:
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত প্রতিবেদন
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও ফলাফল, সম্পাদনা: নেসার আমীন।