ঢাকা-১৭: উচ্চ ও নিম্নবিত্তের ভোটের সমীকরণে তারেক রহমান

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

বনানী ডিএনসিসি মার্কেটে ঘোরাঘুরি করছিলেন কনা ও জান্নাত। হঠাৎ নির্বাচনী প্রচারণার একটি মিছিলের সামনে পড়ে গেলেন এই দুই তরুণী। মিছিলটি চলে যেতেই একজন আরেকজনের কাছে জানতে চাইলেন কে কাকে ভোট দেবেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জীবনে প্রথমবার ভোট দেবেন কনা ও জান্নাত। একজন সম্প্রতি স্নাতক শেষ করেছেন, আরেকজন শেষ বর্ষে।

তারা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন যারা করবে, তারা ভোট পাবে। ভোটের পর যারা সরকার গঠন করবে তাদের ওপর অনেক দায়িত্ব। এবারের নির্বাচনটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ভোটারদেরও দায়িত্ব আছে দায়িত্বশীল প্রার্থীকে ভোট দেওয়া।’

ঢাকা-১৭ আসনের এই দুই তরুণ ভোটার এখনো নিশ্চিত নন তারা কাকে ভোট দেবেন। একদিকে যেমন দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফিরে আসা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি তাদের সহানুভূতি আছে, অন্যদিকে বিগত আমলে প্রকাশ্যে রাজনীতি না করতে পারা এবং এক পর্যায়ে নিষিদ্ধ হওয়া দল জামায়াতে ইসলামীকেও সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন কনা ও জান্নাত।

বনানী-গুলশান এলাকাটি পড়েছে ঢাকা-১৭ আসনে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫, ১৮, ১৯ ও ২০ ওয়ার্ডে গুলশান, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট থানা মিলে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনে একদিকে যেমন অভিজাত এলাকা, অন্যদিকে আছে বস্তি এলাকাও। একদিকে যেমন বারিধারা, ডিওএইচএস, নিকেতন এলাকার বিত্তশালী ভোটার, তেমনি অন্যদিকে ভাসানটেক, কড়াইল, মহাখালীর বস্তিবাসীর ভোট।

এ আসনে মোট ১২ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও, বিএনপি চেয়ারম্যানের কারণে এ আসনের দিকে নজর এখন পুরো দেশের। এদিকে তারেক রহমানের বিপরীতে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী জামায়াত প্রার্থী।

কড়াইল বস্তির বাসিন্দা তাছলিমা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী অনেক আগে থেকেই বস্তিতে আসেন। বিভিন্ন সময়ে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তারেক রহমানও কয়েকদিন আগে এসেছিলেন। একজনকে তো ভোট দিতেই হবে। কিন্তু আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হবে কি না, জানি না।’

নিকেতনের বাসিন্দা ব্যাংকার রেজাউল করিম (৩৬) বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত একসময় একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। এখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে। এ কারণে হয়তো নির্বাচনের উত্তেজনা তুলনামূলক কম মনে হচ্ছে।’

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থেকে ‘প্রত্যাশিত বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার বনানীতে নিজ নির্বাচনী আসনে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ যদি ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করতে পারে এবং ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় করতে পারে, তবে দেশ পুনর্গঠনও অবশ্যই করতে পারবে। আমাদের সামর্থ্য আছে, শুধু প্রয়োজন সবার একসঙ্গে কাজ করা।’

তারেক রহমান যখন নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে দলের প্রার্থীদের সঙ্গে সারা দেশে জনসংযোগে ব্যস্ত, জামায়াত প্রার্থী খালিদুজ্জামান তখন পুরোপুরি ব্যস্ত নিজ আসন নিয়ে।

খালিদুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি মানুষের কাছে থাকার চেষ্টা করছি প্রথম থেকেই। এখানে একটি অভিজাত সমাজ আছে, আবার কয়েকটি বস্তিও আছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে এলিট সমাজের সঙ্গে যেমন আমার সম্পর্ক আছে, তেমনি দরিদ্র বস্তিবাসীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার আসনে ক্যান্টনমেন্ট আছে, ডিওএইচএস আছে। সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। এই ভোটারদের একটা বড় অংশের সমর্থন আমি পাব।’

জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এই প্রার্থী বলেন, ‘বড় নেতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি, কিন্তু এতে ভয়ের কিছু নেই। ভোটাররা এখন ব্যক্তির কাজ ও গুণাগুণ দেখে ভোট দেন। নতুন প্রজন্ম চায় না, রাজার ছেলে রাজা হোক।’

ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমানের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভোটাররা মনে করছেন তাদের সমস্যার সমাধান শুধু তারেক রহমানের মাধ্যমেই সম্ভব। এ এলাকার মানুষ তাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছেন।’

ঢাকা-১৭ আসনের অন্তর্গত বস্তি ও নিম্ন আয়ের মানুষের উন্নয়নে তারেক রহমানের কিছু পরিকল্পনা আছে বলে জানান আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘বস্তিবাসীর জন্য উন্নত বাসস্থান, নিজস্ব স্কুল, খেলার মাঠ এবং বয়স্ক ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।’

এ ছাড়া, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গুলশান লেক পরিষ্কার রাখা, মশা নিধন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূল করে শান্তি-শৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জনগণ বিএনপির পক্ষেই থাকবে এমন আশা প্রকাশ করে আব্দুস সালাম বলেন, ‘দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে ভোটাররা ধানের শীষকে বেছে নিয়ে দেশে একটি স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত করবে বলে আমরা মনে করি।’

দীর্ঘ বছর নির্বাসিত থাকার পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের রাজনীতির মাঠে ফিরে আসায় ঢাকা-১৭ আসন এখন বিএনপির এই শীর্ষ নেতার গ্রহণযোগ্যতার বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। অন্যদিকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে ভোটের মাঠে ফিরে আসা জামায়াতেরও রয়েছে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় মর্যাদা রক্ষার তাড়না।

এ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭, যার মধ্যে এক লাখ ৭৪ হাজার ৭০৯ পুরুষ, এক লাখ ৫৯ হাজার ৬০ নারী ও আটজন হিজড়া।

ভোটের লড়াইয়ে আরও আছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির কামরুল হাসান নাসিম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মনজুর হুমায়ুন, জাতীয় পার্টি–জেপির তপু রায়হান, জাতীয় পার্টির আতিক আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. শামীম আহমদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের এস এম আবুল কালাম আজাদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনিসুজ্জামান খোকন ও কাজী এনায়েত উল্লাহ।