জেমিনাই-চ্যাটজিপিটিকে একটি প্রশ্ন করলে কত বিদ্যুৎ ও পানি খরচ হয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু গবেষণাগারের প্রযুক্তি নয়। চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনাই, মাইক্রোসফট কোপাইলটের মতো এআই টুল প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের নানা কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সাধারণত আমরা পর্দায় একটি প্রশ্ন লিখি, তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর পেয়ে যাই। পুরো ব্যাপারটা আমাদের কাছে খুব সহজ মনে হয়।
কিন্তু পর্দার আড়ালে প্রতিটি প্রশ্নের জন্য কাজ করছে বিশাল ডেটা সেন্টার। আর এসব ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজন হচ্ছে বিদ্যুৎ। কম্পিউটার ঠাণ্ডা রাখতেও প্রয়োজন হচ্ছে পানি। ফলে এআই যত বেশি ব্যবহার হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর পরিবেশগত প্রভাব।
গত বছরের জুনে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছিলেন, চ্যাটজিপিটিতে একটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৩৪ ওয়াট-ঘণ্টা শক্তি এবং শূন্য দশমিক ৩২২ মিলিলিটার পানি লাগে।
তিনি তুলনা করে বলেছিলেন, একটি ওভেন এক সেকেন্ডের একটু বেশি সময় চালানোর মতো এটি।
একই বছরের আগস্টে গুগল ক্লাউডের এক ব্লগে জানানো হয়, জেমিনাইতে একটি প্রশ্নের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় শূন্য দশমিক ২৪ ওয়াট-ঘণ্টা শক্তি বিদ্যুৎ ও শূন্য দশমিক ২৬ মিলিলিটার পানি, যা প্রায় পাঁচ ফোঁটা পানির সমান। বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি সহজ করে বললে, একটি জেমিনাই প্রশ্নের জন্য যতটা বিদ্যুৎ লাগে, তা দিয়ে ৯ সেকেন্ডেরও কম সময় টেলিভিশন চালানো যায়।
একটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ খুবই সামান্য মনে হতে পারে। কয়েক ফোঁটা পানির মতোই নগণ্য। কিন্তু যখন প্রতিদিন কোটি কোটি প্রশ্ন করা হয়, তখন হিসাবটা বদলে যায়।
ধরা যাক, একজন মানুষ দিনে কয়েকবার এআই ব্যবহার করছেন। তার ব্যবহারের পরিমাণ হয়তো পরিবেশের ওপর চোখে পড়ার মতো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু একই কাজ যদি কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন করেন, তাহলে সেই সামান্য সামান্য ব্যবহার একসঙ্গে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা তৈরি করে।
কেবল উত্তর দেওয়ার সময় নয়
এআইয়ের পরিবেশগত খরচ বোঝার সময় দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হয়। প্রথমটি হলো প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ মডেলকে শেখানোর প্রক্রিয়া।
একটি বড় এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহার করা হয়। হাজার হাজার জিপিইউ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই প্রশিক্ষণ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। এই সময় প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়।
সমস্যা হলো, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের মডেল কীভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, কতক্ষণ প্রশিক্ষণ দিয়েছে কিংবা ঠিক কী ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে; এসব তথ্য সবসময় প্রকাশ করে না।
তাই মডেল প্রশিক্ষণের কার্বন নিঃসরণের পুরো হিসাব করা কঠিন।
দ্বিতীয় বিষয় হলো ইনফারেন্স। কেউ যখন এআইকে প্রশ্ন করেন এবং সে উত্তর তৈরি করে, তখন সেটিই ইনফারেন্স।
একটি প্রশ্নের খরচও এক নয়
ধরি, কেউ ঢাকার আবহাওয়া জানতে চাইলেন।
আরেকজন ব্যবহারকারী এআইকে বললেন, ‘আমার জন্য ১০ দিনের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করো, প্রতিদিনের খাবার, যাতায়াত, খরচ ও সম্ভাব্য ঝুঁকিসহ।’
দুটি প্রশ্নের জন্য কম্পিউটারের কাজ এক হবে না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে অনেক বেশি হিসাব করতে হতে পারে। উত্তরও হতে পারে অনেক বড়।
এআই যে পরিমাণ লেখা প্রক্রিয়া করে, সেগুলোকে বলা হয় টোকেন। সাধারণভাবে বেশি টোকেন মানে বেশি গণনা ও বেশি শক্তি ব্যবহার।
জার্মানির মিউনিখ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের গবেষক ম্যাক্সিমিলিয়ান ডনার ও গডরান ছোচার ১৪টি ওপেন-সোর্স এআই মডেল নিয়ে গবেষণা করেন। মডেলগুলোর আকার ছিল ৭ বিলিয়ন থেকে ৭২ বিলিয়ন প্যারামিটার পর্যন্ত।
গবেষণায় দেখা যায়, সব এআই মডেলের শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ এক নয়।
বিশেষ করে রিসোনিং মডেল উত্তর দেওয়ার আগে সাধারণ মডেলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে। এআইয়ের যে মডেল তুলনামূলক বেশি ধাপে হিসাব করে তাকে রিসোনিং মডেল বলে।
গবেষকরা বলছেন, প্রতিটি প্রশ্নের জন্য সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করা প্রয়োজন হয় না। সহজ একটি প্রশ্নের উত্তর যদি ছোট ও সাধারণ একটি মডেল ভালোভাবেই দিতে পারে, তাহলে শুধু অভ্যাসের কারণে সবচেয়ে বড় মডেল ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
গবেষণায় এমন উদাহরণও পাওয়া গেছে, যেখানে একটি সাধারণ মডেল প্রায় একই ধরনের নির্ভুলতা বজায় রেখে রিসোনিং মডেলের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম কার্বন নিঃসরণ করেছে।
অর্থাৎ সঠিক কাজের জন্য সঠিক মডেল বেছে নেওয়াও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তুলনাও উঠে এসেছে।
সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ বিলিয়ন প্যারামিটারের ডিপসিক আর১ রিসোনিং মডেল দিয়ে ৫ লাখ প্রশ্নের উত্তর তৈরি করলে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হতে পারে, তা লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক যাওয়া-আসার একটি বিমানযাত্রার কার্বন নিঃসরণের কাছাকাছি হতে পারে।
এখানে অবশ্য মনে রাখতে হবে, এটি একটি নির্দিষ্ট মডেল ও নির্দিষ্ট পরীক্ষার হিসাব। সব এআই মডেলের ক্ষেত্রে একই সংখ্যা প্রযোজ্য নয়।
দিনে ২৫০ কোটির বেশি প্রশ্ন
চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এআই ব্যবহারের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে টেকক্রাঞ্চ এক প্রতিবেদনে বলা জানিয়েছিল, চ্যাটজিপিটিতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি প্রশ্ন বা প্রম্পট পাঠানো হচ্ছে।
অর্থাৎ মানুষ এখন কেবল আলাদা করে এআই অ্যাপ খুলে প্রশ্ন করছে না। নানা কাজের মধ্যেই এআই ঢুকে পড়ছে।
মাইক্রোসফট তাদের অফিস সফটওয়্যারে এআই যুক্ত করেছে। গুগল তাদের সার্চ ও জিমেইল সেবায় এআই ব্যবহার করছে। ফলে ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন, এত এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পানি আসবে কোথা থেকে?
ডেটা সেন্টারই আসল জায়গা
আমরা যখন ফোন বা কম্পিউটার থেকে কোনো প্রশ্ন পাঠাই, তখন উত্তরটি আমাদের যন্ত্রের ভেতরে তৈরি হয় না। প্রশ্নটি চলে যায় দূরের কোনো ডেটা সেন্টারে।
সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার বা সার্ভার একসঙ্গে কাজ করে উত্তর তৈরি করে।
এই সার্ভারগুলো চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে সার্ভারগুলো গরম হয়ে যায়। তাই এগুলো ঠাণ্ডা রাখার জন্য বিশেষ ধরনের কুলিং ব্যবস্থা দরকার হয়।
কিছু ডেটা সেন্টারে এই ঠাণ্ডা রাখার প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবহার করা হয়।
ফলে একটি এআই প্রশ্নের পরিবেশগত খরচ শুধু বিদ্যুতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে তৈরি হওয়া কার্বন নিঃসরণও।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এ প্রতিবেদনে বলেছিল, বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টার বেশি হতে পারে।
ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি জাপানের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের কাছাকাছি!
এর পেছনে এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এআই মডেল যত বড় হচ্ছে, সেগুলো চালাতে তত বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষও এআই ব্যবহার করছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।
অর্থাৎ একদিকে প্রযুক্তি আরও দক্ষ হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে।
এআই কোম্পানিগুলো অবশ্য বসে নেই। কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বেশি কাজ করা যায়—এমন নতুন চিপ তৈরি হচ্ছে। ডেটা সেন্টারের কুলিং প্রযুক্তিও উন্নত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির ব্যবহার কমানোর জন্য নতুন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকেও বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা আছে। প্রযুক্তি আরও দক্ষ হলে সাধারণত সেটি ব্যবহার করাও সস্তা ও সহজ হয়ে যায়। ফলে মানুষ আরও বেশি ব্যবহার করতে শুরু করে।
অর্থনীতিতে এই ঘটনাকে বলা হয় জেভন্স প্যারাডক্স। অর্থাৎ একটি কাজ করতে যত কম সম্পদ লাগে, সেই প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়ে গেলে মোট সম্পদের ব্যবহার আবারও বাড়তে পারে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে।
একটি প্রশ্নের জন্য হয়তো এখন আগের চেয়ে কম বিদ্যুৎ লাগবে। কিন্তু যদি প্রশ্নের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তাহলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার কমার বদলে বেড়েও যেতে পারে।
তাহলে কি এআই ব্যবহার বন্ধ করতে হবে
ব্যাপারটা তা নয়। এআইয়ের অনেক ইতিবাচক ব্যবহার রয়েছে। এটি চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, যোগাযোগ, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা এবং নানা ধরনের কাজকে সহজ করে তুলতে পারে।
সমস্যা হলো, এই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর পরিবেশগত খরচকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
একটি প্রশ্নের জন্য কয়েক ফোঁটা পানি বা সামান্য বিদ্যুৎ হয়তো বড় বিষয় নয়। কিন্তু কোটি কোটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে সেই সামান্য পরিমাণই বড় হয়ে ওঠে।
তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ হলো, কম সম্পদ ব্যবহার করে আরও কার্যকর এআই ব্যবস্থা তৈরি করা।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন ডেটা সেন্টারের পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার।
এআই আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার মূল্য যেন পৃথিবীর পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশকে অতিরিক্ত চাপের মুখে ফেলে না সেদিকেও নজর দিতে হবে।


