ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চাপে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

সোহেল পারভেজ
সোহেল পারভেজ
দীপংকর রায়
দীপংকর রায়
আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু
আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু

প্রতিবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পাবনায় আব্দুস সালামের ওয়ার্কশপে কাজ জমতে থাকে। ধামরাইয়ে রেজবিন হাফিজের ছোট্ট জুতা তৈরির কারখানার শ্রমিকদেরও কাজ বন্ধ করে বারবার বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় থাকতে হয়। কেরানীগঞ্জে আবুল কাশেমের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, ফলে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তিনি পণ্য সরবরাহ করতে পারেন না।

এগুলো সবই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বড় উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের মতো জেনারেটর চালিয়ে মেশিন সচল রাখার সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় কমছে।

কোনো কোনো এলাকায় এখন দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং থাকছে।

ধামরাই বিসিক শিল্প নগরীর পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদারগুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজবিন হাফিজ বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে আমরা ঠিক মতো জুতা তৈরি করতে পারছি না। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’

কাঁচামালের দাম বাড়ায় গত তিন বছরে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে জানিয়ে তিনি গতকাল ফোনে ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন।’

এই পরিস্থিতিতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন বিলম্বিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যয় আরও বাড়ছে, বলেন রেজবিন।

তার কারখানার মতো বাংলাদেশে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ১ কোটি ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিংয়ের দোকান, চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী ও পাড়ার লন্ড্রি—এসব ব্যবসা অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, আবার কেউ কেউ পণ্য সরবরাহে সময়সীমা পূরণ করতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছেন। শ্রমিকদের মজুরি দিতে কিছু উদ্যোক্তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।

পাবনার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আবদুস সালাম বলেন, স্বাভাবিক কর্মদিবসে তিনি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করতে পারতেন, কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে সেই আয় অনেক কমে গেছে।

‘আমার চারটি ভারী মেশিন আছে, এর মধ্যে দুটি লেদ মেশিন। কিন্তু বেশির ভাগ দিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা মেশিন বন্ধ থাকছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গত কয়েক মাসে এটাই সাধারণ চিত্র হয়ে গেছে,’ যোগ করেন তিনি।

সালাম বলেন, ‘এখন সঞ্চয় থেকে শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে।’

গত ৩০ বছর ধরে এই ব্যবসায় আছেন সালাম। তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট এ রকমই থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। তবে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন প্রায় অর্ধেক উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নতুন কিছু নয়। কয়েক দশক ধরেই শীতকাল ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর জেরে কমেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন।

সারা দেশে ১১ আগস্ট লোডশেডিং ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক দিনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি ওয়ার্কশপ—মাফিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক আবুল কাশেম টিটু বলেন, ‘দিনের অর্ধেক সময় আমরা বিদ্যুৎ পাই না।’

তিনি আরও বলেন, দিনের পরিবর্তে তারা রাতে কাজ করছেন। তবু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে সময় মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

কাশেম বলেন, ‘আমরা একটি প্যাকেজিং মেশিন ৪০ দিনের মধ্যে সরবরাহ করতে পারতাম। কিন্তু লোডশেডিং তীব্র হওয়ায় একই কাজ দুই মাসেও শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছি।’

‘আমরা সত্যিই খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে আছি।’

এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ আমাদের ৪ লাখ টাকা দিতে হয়। শ্রমিকেরা কাজ করতে না পারছে না, তারপরও আমরা তাদের বেতন দিচ্ছি।’

স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস, বেসরকারি খাতে দুর্বল বিনিয়োগ এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মতো অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।

এ সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম শহর খুলনায় একটি ছোট লেদ ওয়ার্কশপের মালিক বুলবুল মিয়া হাতভর্তি নাট-বল্টু পরিষ্কার করছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী তোফাজ্জল। বিদ্যুৎ চলে গেলেই তারা দুজন এ ধরনের ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণের কাজে হাত দেন।

লেদ মেশিনে বুলবুল মূলত পাওয়ার টিলার, ইজিবাইক ও স্থানীয়ভাবে নছিমন নামে পরিচিত শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করেন। সাধারণত তিনি প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে ৮ থেকে ১০টি অর্ডার পান। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন ১ থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করতে পারতেন।

বুলবুল বলেন, ‘এখন খরচই মেটাতে পারছি না,’ বলেন বুলবুল।

বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচসহ তার মাসিক ব্যয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। অথচ গত ১০ দিনে তিনি আয় করেছেন মাত্র প্রায় ৫ হাজার টাকা।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং তাদের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ফলে তারা আরও বড় সংকটে পড়ছেন।’

‘তারা যদি ঠিক মতো উৎপাদন করতে না পারেন, তাহলে পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন না এবং ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য পরিশোধের দায় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত আয়ও করতে পারবে না। ফলে এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে,’ যোগ করেন আনোয়ার।