বিশ্বকাপ বদলে দিল একটি জাতির বিশ্বাস
শেষ বাঁশি বাজতেই স্টেলে সোলবাক্কেনের চোখ ভিজে উঠেছিল। ইংল্যান্ডের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে নরওয়ে, কিন্তু সেই কান্না ছিল না শুধুই পরাজয়ের। প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপে ফিরে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে, ব্রাজিলকে হারিয়ে এবং পুরো দেশকে এক সুতোয় গেঁথে নরওয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, এটি কেবল একটি বিশ্বকাপ অভিযান নয়, বরং নতুন এক ফুটবল বিশ্বাসের সূচনা।
পরিসংখ্যান বলবে, ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের যাত্রা থেমেছে শেষ আটে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে অনেক সময় অর্জনের মূল্য কেবল ট্রফিতে মাপা যায় না। কিছু দল বিদায় নিয়েও ভবিষ্যতের জন্য এমন এক বিশ্বাস রেখে যায়, যা পরবর্তী প্রজন্মের পথচলার ভিত্তি হয়ে ওঠে। নরওয়ের এবারের বিশ্বকাপ ঠিক তেমনই এক গল্প।
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে নরওয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা ছাপিয়ে গেছে বাস্তবতা। গ্রুপ পর্বে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে তারা জায়গা করে নেয় নকআউটে। এরপর শেষ ষোলোতে ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে অতিরিক্ত সময়ে স্বপ্নভঙ্গ হলেও নরওয়ের লড়াকু মানসিকতা সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কোচ স্টেলে সোলবাক্কেন বলেন, 'আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেছি। ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল না, কিন্তু এটাই জীবন। এখন আমাদের একটু শ্বাস নেওয়ার সময়।'
নিজেদের যাত্রা নিয়ে গর্ব লুকাননি তিনি, 'বিশ্বকাপে এসে নিজেদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলাম এবং আমরা সেটা করতে পেরেছি। পুরো নরওয়ে আমাদের পাশে ছিল, আর আমরা সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রাখতে পেরেছি। আমি ভীষণ গর্বিত।'
শুধু মাঠের পারফরম্যান্সই নয়, নরওয়ের ফুটবল সংস্কৃতিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আর্লিং হালান্ড গোল করে যেমন শিরোনাম হয়েছেন, তেমনি সমর্থকদের সমন্বিত 'ভাইকিং রো' উদযাপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। লাল জার্সির চাহিদা বেড়েছে, শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
সবচেয়ে বড় বিষয়, বিদায়ের পরও হতাশা নয়, আনন্দই ছিল নরওয়ের মানুষের মুখে। বিভিন্ন শহরে সমর্থকদের গান, আতশবাজি আর উদযাপন যেন বলে দিয়েছে, এই বিশ্বকাপ তাদের কাছে হার নয়, একটি নতুন শুরুর প্রতীক। বহু সমর্থক ইতোমধ্যেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
হালান্ডও এই বিশ্বকাপকে সমাপ্তি নয়, সূচনা হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, 'অনেক দিন ধরেই এটা আমার স্বপ্ন ছিল। এই বিশ্বকাপের পর আমরা নরওয়েকে ফুটবল মানচিত্রে তুলে ধরতে পেরেছি। এখন সেই মান ধরে রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি ভীষণ গর্বিত।'
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার আত্মবিশ্বাস আরও স্পষ্ট, 'আমরা প্রমাণ করেছি ব্রাজিলের মতো দলকেও হারানো সম্ভব। ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছি ঠিকই, কিন্তু তাদেরও শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছে। ফল অন্যরকমও হতে পারত। সামনে আরও বিশ্বকাপ, আরও ইউরো আছে। এখন সময় এসেছে নরওয়েকে সত্যিকার অর্থেই প্রতিষ্ঠিত করার। আমাদের দারুণ একটি প্রজন্ম আছে।'
ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক দল আছে, যারা ট্রফি জেতেনি, কিন্তু একটি প্রজন্মের মানসিকতা বদলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ে সেই তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, বড় দলের বিপক্ষে ভয় নয়, সমান তালে লড়াই করাও সম্ভব। তারা শিখিয়েছে, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে ফুটবল ইতিহাসও বদলে যেতে পারে।