'ভিএআরের ভুল, নাকি নিয়মই মানা হয়েছে?'—বিতর্কে ভিন্নমত বিশেষজ্ঞদের

স্পোর্টস ডেস্ক

মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় ৩-২ জয়ের পরও সবচেয়ে বড় আলোচনা গোল বা প্রত্যাবর্তন নয়, বরং ভিএআরের দুটি সিদ্ধান্ত। মূলত ৫৮ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোল বাতিলের ঘটনায় ফুটবলবিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। কেউ বলছেন, ভিএআর তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। আবার কেউ মনে করছেন, নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে।

ম্যাচের ৫৮ মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে জিকো বল জালে জড়িয়ে মিসরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। কিন্তু ভিএআরের পরামর্শে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে গোলটি বাতিল করেন। কারণ, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে চাপ দিয়েছিলেন।

ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক ও ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক রব গ্রিন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই এটি ভিএআরের পর্যালোচনার বিষয় নয়। ঘটনাটি তো পুরো মাঠের এক প্রান্তে হয়েছিল।‘

তার মতে, প্রায় ১০০ গজ দূরে ঘটে যাওয়া সামান্য সংস্পর্শের কারণে এত সুন্দর একটি গোল বাতিল করা ভিএআরের উদ্দেশ্য ছিল না।

‘আর্জেন্টিনা বড় রকমের বেঁচে গেছে। কারও পায়ের আঙুলে চাপ পড়েছিল, আর সেটি ১০০ গজ দূরে। ভিএআর এ জন্য আনা হয়নি। আমরা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে প্রযুক্তি তার প্রয়োজনীয় সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রেফারি ঘটনাটি দেখেছিলেন এবং খেলা চালিয়ে যেতে দিয়েছিলেন। অথচ মিসরকে দুই গোলের লিড থেকে বঞ্চিত করা হলো,‘ বলেন গ্রিন।

সাবেক ফিফা রেফারি ও ফক্স স্পোর্টসের নিয়ম বিশ্লেষক মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করেন, ‘আমার মতে, প্রথমত এটি ফাউলই ছিল না। দ্বিতীয়ত, এমন ঘটনায় ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ভিএআর অপ্রয়োজনীয়ভাবে খুব গভীরে গিয়ে এমন কিছু খুঁজেছে, যাতে গোলটি বাতিল করা যায়। এত দীর্ঘ সময় ও এতগুলো পাসের পরের গোলকে ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হয়নি।‘

তবে ক্ল্যাটেনবার্গের মতে, রেফারিং দলের জন্য আরও বিব্রতকর বিষয় ছিল আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টির দাবি। আর্জেন্টিনার বক্সে সালাহ পড়ে গেলে তার অভিযোগ ছিল, হুলিয়ান আলভারেজ তাকে ফাউল করেছেন। অনেকের প্রশ্ন, যদি আতিয়ার ঘটনাটি ভিএআর দেখতে পারে, তাহলে এটিও কেন পর্যালোচনা করা হলো না?

এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ক্ল্যাটেনবার্গ। তার মতে, দুটি ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সালাহর ঘটনাটি ঘটেছে পেনাল্টি এলাকার ভেতরে। ফলে সেখানে ভিএআরকে সম্ভাব্য পেনাল্টি দেওয়ার মতো স্পষ্ট ও জোরালো প্রমাণ খুঁজতে হয়, যার মানদণ্ড সাধারণ ফাউলের চেয়ে অনেক কঠোর।

তার বিশ্লেষণ, 'সালাহ যদি বক্সের বাইরে একইভাবে ফাউলের শিকার হতেন, তাহলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভিএআরের হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল। কিন্তু পেনাল্টি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোল বহাল থাকে।'

অন্যদিকে, ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ড. জো মাখনিক জিকোর গোলে দেওয়া ফাউলের বিষয়ে মনে করেন, সিদ্ধান্তটি নিয়মের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘আক্রমণের ধারাবাহিকতায় কোনো ফাউল থেকে যদি বলের দখল আসে এবং সেই দখল থেকেই গোল হয়, তাহলে গোল বাতিল করে ফ্রি-কিক দেওয়া যায়,’ বলেন তিনি।

ম্যাচ শেষে 'ওয়ার্ল্ড কাপ নাউ' অনুষ্ঠানে তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, ‘ভিএআর প্রটোকলে কোথাও বলা নেই যে ফাউলটি পাঁচ সেকেন্ড আগে বা ৭৫ গজের মধ্যে হতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ নতুন করে বলের দখল না পায় এবং একই ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে গোল আসে, ততক্ষণ প্রটোকল অনুযায়ী গোল বাতিল করা সম্ভব।‘

রেফারি মাঠে ঘটনাটি দেখেও কেন ফাউল দেননি, এ প্রশ্নের জবাবে মাখনিক বলেন, ‘রেফারির অবস্থান ও দেখার কোণ সবসময় সেরা নাও হতে পারে। ভিএআরের কাজই হলো ভিন্ন কোণ থেকে ঘটনাটি দেখানো। সেখানে স্পষ্ট দেখা গেছে, খেলোয়াড়টি প্রতিপক্ষের পায়ে চাপ দিয়েছেন।‘