৩৯-এ এসেও নিজেকে নতুন করে ভাঙছেন মেসি
লিওনেল মেসি নিচের দিকে তাকালেন। মুখে এক চিলতে হাসি, তবে তাতে অস্বস্তির ছাপও স্পষ্ট। পেনাল্টিটা ভালো হয়নি—এ কথা তিনি নিজেও জানতেন। বলটি পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যাওয়ার পর মেসির অভিব্যক্তি ছিল এমন একজনের, যিনি জানেন যে তিনি হয়তো একটু বেশিই ভেবে ফেলেছেন।
একসময় এমন সুযোগ হাতছাড়া হলে আর্জেন্টিনা শিবিরে নিশ্চিত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু এবার যেন দৃশ্যটা ভিন্ন। পেনাল্টি মিস করলেও মেসিকে মনে হলো দ্রুতই নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর মধ্যে এখন এক ধরনের মুক্ত ভাব কাজ করছে, যে মুক্তি এত সহজে আসেনি। বহু বছর ধরে জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতার বোঝা বয়ে বেড়ানোর পর এসেছে।
২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার অভিযান। সেই ম্যাচের পর থেকে প্রতিটা ম্যাচেই যেন এক ধরণের চাপা শোরগোল মেসির দলকে নিয়ে। এরপর নানা নাটকীয়তা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জেতে আলবিসেলেস্তেরা। সেই জয়ে ফুটবল যেন তার সবচেয়ে বড় ঋণ শোধ করেছিল মেসির কাছে।
কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ দেখে মনে হচ্ছে, ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার প্রতি মেসির নিজের দায় বোধ হয় এখনও শেষ হয়নি। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য সাফল্য অর্জনের পরও জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জিততে না পারা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা। নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ আসরে মেসি যেন সব প্রচলিত ভুল ধারণাকে ওলট পালট করার জন্যই নেমেছেন।
কাতারে বিশ্বকাপ জয় মেসিকে শুধু অমরত্বের স্বাদই দেয়নি। যেন তাঁর কাঁধ থেকে বিশাল এক বোঝা নেমে গেছে। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা দলের অনুপ্রেরণা ছিল মেসির হাতে একটি বিশ্বকাপ তুলে দেওয়া। আর ২০২৬ সালে যেন ঠিক উল্টোটা। এবার মেসিই বাকি দলকে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন, আগের সব অর্জনকে ছাপিয়ে যাওয়ার।
চার বছর আগে চাপের মুহূর্তগুলোতে মেসির ভেতর যে দ্বিধাবোধ, যে সতর্কতা দেখা যেত, এবার তা বিন্দুমাত্র নেই। মাঠে নেমে ফুটবলে প্রতিটি স্পর্শে যেন তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, আমি এখন মুক্ত।
চলতি বিশ্বকাপে রেকর্ডের পর রেকর্ড তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব যেন মেসির কাছে কেবলই রেকর্ডের পাতায় থেকে যাওয়া কিছু সংখ্যা মাত্র। এসব সংখ্যা, রেকর্ড কোনোদিনই তাঁকে খুব বেশি আন্দোলিত করেনি। সবুজ গালিচায় মেসির একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান শুধু ওই ফুটবলটাই। আর সেই বল পায়েই এবার তিনি আরও বিধ্বংসী।
২০২২ সালে সেই বোঝা নেমে যাওয়ার পর মেসি এবার যা যা সম্ভব সবই যেন করছেন। প্লেমেকার মেসি এখনও পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রায় সময় নিজেই আক্রমণ গড়ে তুলে আবার নিজেই সেটিকে গোলে পরিণত করছেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তীব্র প্রেসিংয়ে আর্জেন্টিনা যখন কিছুটা দিশেহারা, তখন উদ্ধারকর্তা হয়ে এসেছেন সেই মেসিই। প্রতিপক্ষ যখন উইং ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, মেসি তখন বারবার তাদের মাঝমাঠে টেনে এনেছেন। মেসির উপস্থিতি যেন ঠিক মহাকর্ষের মতো—সবকিছু নিজের দিকে টেনে নিয়ে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেওয়াই যার কাজ।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে তিনি ছিলেন ক্লাসিক নাম্বার টেন। সতীর্থদের পাসের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, নিজে নিচে নেমে এসে প্রতিপক্ষের প্রেসিংয়ের জবাব দিয়েছেন। আবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তাঁকেই দেখা গেছে ‘ফলস নাইন’-এর ভূমিকায়। একই খেলোয়াড়, অথচ দুই ম্যাচে দুই ভিন্ন রূপ।
পেনাল্টি মিসের পর ১৯তম মিনিটে আরেকটি সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোলরক্ষককে সামনে পেয়েও শেষ পর্যন্ত গোলটা করতে পারেননি। কিন্তু সেই ব্যর্থতাই যেন মেসির ভেতরের আগুনটাকে জ্বালাতে বারুদের ভূমিকায় কাজ করেছে।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলা হলে যেকোনো দলই মেসিকে কেন্দ্র করে তাদের রক্ষণ পরিকল্পনা সাজায়। কিন্তু তবুও ম্যাচের ৩৮ মিনিটে লেফট উইং থেকে কখন যে মাঠের মাঝামাঝি বক্সের বাইরে চলে এসেছেন তিনি, অস্ট্রিয়ার কেউ সেটা ধরতেই পারেনি। বাঁ পায়ের সেই বিখ্যাত বাঁকানো শটে প্রথম গোল। সবার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকছেন, কিন্তু তবুও চোখের পলকে নিজের কাজটা সেরে ফেলছেন।
বয়সকে যেন ক্রমেই অস্বীকার করছেন মেসি। অস্ট্রিয়া ম্যাচের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য, বক্সের ভেতরে পাঁচজন ফুটবলার তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তবুও ওই অবস্থায় সবাইকে ফাঁকি দিয়ে তিনি বের করে আনেন আরেকটি গোল। সবাই তাঁর দিকেই তাকিয়ে, কিন্তু তাঁকে থামানোর কাজটা কেউ করতে পারেনি।
৩৫ বছর বয়সের পর বিশ্বকাপে যত গোল করেছেন মেসি, অনেক কিংবদন্তিই পুরো ক্যারিয়ারে তত গোল করতে পারেননি। তিনি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন, যেখানে স্বাভাবিকতা নয়, বরং বিস্ময়ই যেন নিয়ম।
সম্প্রতি মেসির সাবেক ক্লাব সতীর্থ ইব্রাহিমোভিচ বলেছিলেন, ‘মাঠে মেসি যেভাবে নড়াচড়া করে, যেভাবে পুরো খেলাটাকে মাকড়সার মতো নিয়ন্ত্রণ করে, তাতেই সবকিছু কাজ করে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মনোভাবটা যেন এমন- তুমি পথ দেখাও, আমরা ঠিক অনুসরণ করব’।
ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে মেসি বার্সেলোনাকে সবকিছু দিয়েছেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে সাফল্য ছিল অধরা। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে সেই অপূর্ণতাই যেন তাঁর হৃদয়ে বহ্নি হয়ে জ্বলেছে।
মেসি এখন নির্ভার, কিন্তু নিস্তেজ নন। শান্ত, কিন্তু ভেতরে এখনও জয়ের তীব্র ক্ষুধা।
মেসি যেন নিজের খেলাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। ঠিক যেমন পুরনো অণু ভেঙে পরমাণুর সমন্বয়ে নতুন অণু তৈরি হয়, তেমন।