বিশ্বকাপে সর্বকালের সেরা কে: মেসি, ম্যারাডোনা নাকি পেলে?
ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার মঞ্চ আলোকিত করেছেন। তবে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে, এই বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তিনটি নাম—পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলার মধ্যে সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ফুটবলপ্রেমী, বিশ্লেষক ও সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এই তিন কিংবদন্তিই সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও র্যাংকিং বিশ্লেষণ করে বিশ্ব সেরাদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
পেলে: বিশ্বকাপের রাজা
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত নাম পেলে। ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি একমাত্র ফুটবলার, যিনি তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন।
১৯৫৮, ৬২ ও ৭০ সালের শিরোপাজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন পেলে। ফাইনালে তিনি দুটি গোল করেছিলেন।
বিশ্বকাপে তার মোট গোল ১২টি।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, একাধিক যুগে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্য ধরে রাখার কারণে পেলের অবস্থান এখনো অনন্য।
ম্যারাডোনা: একাই বিশ্বকাপ জেতানোর কারিগর
পেলের পরই সাধারণত আলোচনায় আসে আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম।
১৯৮৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সেই বিশ্বকাপে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতান ম্যারাডোনা।
তার পারফরম্যান্সকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী একক প্রদর্শনী হিসেবে দেখেন।
মেসি: অসমাপ্ত গল্পের পূর্ণতা
তৃতীয় নামটি লিওনেল মেসির। দীর্ঘদিন বিশ্বকাপ না জেতায় নানা সমালোচনার মুখে পড়লেও ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে সেই বিতর্কের অবসান ঘটান মেসি। ওই আসরে সাত গোল করেন তিনি ও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসিস্ট দেন।
৩৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেন।
২০২৬ তার শেষ বিশ্বকাপও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনেকের মতে, বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে অবশেষে পেলে ও ম্যারাডোনার কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন মেসি।
এরপর কারা?
বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকা শুধু এই তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় আরও আছেন— ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, কাফু ও গারিঞ্চা, ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান এবং জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও মিরোস্লাভ ক্লোসা।
রোনালদো নাজারিও
ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিওকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে পরিচিত এই ফুটবলার ২০০২ সালে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন এবং ফাইনালেও গোল করেন। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ১৫।
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার
জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারকে আধুনিক ‘লিবেরো’ পজিশনের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়।
লিবেরো হলো রক্ষণভাগের এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি ডিফেন্স লাইনের একটু পেছনে থেকে পুরো রক্ষণভাগকে সংগঠিত করেন এবং বিপদ হলে তা সামাল দেন।
রক্ষণ সামলানোর ভূমিকাকে আরও সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক রূপ দেন বেকেনবাওয়ার। শুধু রক্ষণেই সীমাবদ্ধ না থেকে বল নিয়ে সামনে উঠে এসে আক্রমণও করতেন তিনি।
১৯৭৪ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং ১৯৯০ সালে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন বেকেনবাওয়ার।
গারিঞ্চা
বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরেক কিংবদন্তি ব্রাজিলের গারিঞ্চা। পুরো নাম ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো ডস সান্তোস। তবে সবাই তাকে গারিঞ্চা নামেই ডাকে।
১৯৬২ সালে পেলে চোট পাওয়ার পর ব্রাজিলকে শিরোপার পথে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল হলো ড্রিবলিং।
এ কাজে রীতিমত দক্ষ ছিলেন গারিঞ্চা। তার একটি পা অন্য পায়ের তুলনায় প্রায় ৬ ইঞ্চি ছোট ও বাঁকা ছিল।
আর তার এই বাঁকা পায়েই লুকিয়ে ছিল ব্রাজিলের দুটি বিশ্বকাপ জয়ের গল্প। গারিঞ্চা আজও ব্রাজিলিয়ানদের কাছে এক মিথ।
জিনেদিন জিদান
ফ্রান্সের জিনেদিন জিদানও এই তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জোড়া গোল করেন তিনি।
২০০৬ সালেও অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন, যদিও ফাইনালে তার হেডবাটের ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়।
কাফু
ব্রাজিলের কাফু বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ডের মালিক।
তিনি টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছেন—১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে। এর মধ্যে দুটি শিরোপাও জিতেছেন।
মিরোস্লাভ ক্লোসা
জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ১৬, যা এখনো রেকর্ড।
এর বাইরে অনেক তালিকায় ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে, ইংল্যান্ডের ববি মুর কিংবা ইতালির পাওলো রসির নাম উঠে এসেছে।
তাহলে সেরা কে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রভাব, নেতৃত্ব, যুগ, প্রতিপক্ষের মান ও টুর্নামেন্টে রেখে যাওয়া স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেউ শিরোপার সংখ্যা দিয়ে বিচার করেন, কেউ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যকে বেশি গুরুত্ব দেন, আবার কেউ পুরো ক্যারিয়ারের অর্জনকে বিবেচনায় নেন।
যারা শিরোপাকে গুরুত্ব দেন, তাদের কাছে পেলে এগিয়ে। যারা একক নৈপুণ্য ও ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেন, তাদের পছন্দ ম্যারাডোনা। আর আধুনিক ফুটবল যুগের সমর্থকদের বড় অংশের কাছে মেসিই সর্বকালের সেরা।
তাই কে সেরা—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই তিন কিংবদন্তির নামই সবার আগে উঠে আসে।
যত বিতর্ক চলুক না কেন অধিকাংশ বিশ্লেষক একটি বিষয়ে একমত যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের তালিকায় রয়েছেন—পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসি।