স্পেন-আর্জেন্টিনা: রাজনীতি সচেতনদের কাকে সমর্থন করা উচিত

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি আর্জেন্টিনা’—গানটির কথা মনে পড়ে? ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী জুলি কোভিংটনের গাওয়া সেই গানটি সারা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর্জেন্টিনার সাবেক ফার্স্টলেডি ইভা পেরনের স্মরণে কালজয়ী গানটি লিখেছিলেন ব্রিটিশ গীতিকার অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার ও টিম রাইস।

তবে এই লেখার বিষয়বস্তু তারা নন।

সবাই জানেন যে, এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। সারা পৃথিবী দেখবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশের খেলা। খোলা চোখে এই খেলাটি ৩৯ দিনব্যাপী চলা ফুটবল উৎসবের চূড়ান্ত দিন। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে দিনটি মহা-আনন্দের। তথাপি, এই ম্যাচকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনাও।

গত ১৮ জুলাই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুসালেম পোস্ট এক সংবাদ বিশ্লেষণের শিরোনাম করে—‘বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের খেলা কেন ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়ালো?’

এতে বলা হয়, অতীতে ইসরায়েলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির ঘনিষ্ঠতা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। অন্যদিকে, স্পেনের লামিন ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছেন।

এই দুই দলের ভক্তরা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে টেনে নিয়ে অনলাইনে বেশ হইচই করছে উল্লেখ করে বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়—এটি এখন ইসরায়েলবিরোধী ও ইহুদিবিদ্বেষের রূপ নিয়েছে।

Lionel Messi
লিওনেল মেসি। ছবি: রয়টার্স

গত ১৫ জুলাই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রিয়ান রজবিয়ানি সমাজমাধ্যম এক্সে ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা ও ফিলিস্তিন-স্পেনের পতাকা কোলাজ করে পোস্ট করেন। তিনি লিখেন, ‘আমরা ইসরায়েল বনাম ফিলিস্তিন বিশ্বকাপ পাচ্ছি।’

জেরুসালেম পোস্টের সেই বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়—অপর এক এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সব দলের মধ্যে ইসরায়েলকে প্রকাশ্যে ও ক্রমাগত সমর্থনকারী একমাত্র হচ্ছে আর্জেন্টিনা।’

আর্জেন্টিনাকে দক্ষিণ আমেরিকার ‘ইসরায়েল’ বলেও মন্তব্য করেছেন অপর একজন।

আর্জেন্টিনার বর্তমান রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেই যেভাবে ইসরায়েলের মিত্র হয়ে উঠেছেন সে তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্লেষণটিতে এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়, আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার দিয়াগো ম্যারাডোনা ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসকে বলেছিলেন, ‘আমার হৃদয়ে ফিলিস্তিন।’

এ ছাড়াও, স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ কীভাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ইউরোপের প্রধানমুখ হয়ে উঠেন সে তথ্যও প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে সানচেজ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার বলেও এতে মন্তব্য করা হয়।

একই দিনে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—বিশ্বকাপ ফাইনালে নিউইয়র্কের ‘লিটল প্যালেস্টাইনে’ স্পেনের পক্ষে আওয়াজ তুলবে ভক্তরা।

এতে বলা হয়, ব্রুকলিনের আরব-আমেরিকানরা স্পেন-আর্জেন্টিনার খেলাটিকে ফিলিস্তিনের প্রতি একতা ও সংহতি প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখছে।

Football Match

সেখানকার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী জাইন রিমাবি আল জাজিরাকে জানান, ফুটবল খেলা তেমন না দেখলেও এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে তিনি স্পেনকে সমর্থন দিচ্ছেন।

রিমাবির ভাষ্য, ‘আমি তাদেরকেই সমর্থন দেবো যারা ফিলিস্তিনকে সমর্থন দেবে’। তার মতে, ফুটবলকে রাজনীতি থেকে আলাদা করা যায় না। তিনি মনে করেন, ফুটবল বিশ্বকাপ হচ্ছে একটি ‘রাজনৈতিক সম্মেলন’।

২০২৪ সালে স্পেন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার তীব্র বিরোধিতা করে। এর ফলে স্পেন আরবদের ভক্ত হয়ে পড়ে বলে মনে করেন জাইন রিমাবি।

ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের আল রিফ বেকারির তালাল আবদরাবুহ একই ভাবনা পোষণ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হৃদয়জুড়ে স্পেন।’ তবে তিনি এই সমর্থনকে আর্জেন্টিনার প্রতি বিদ্বেষ হিসেবে দেখেন না।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়—আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি মিলেই ইসরায়েলের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ায় অনেক ফুটবলপ্রেমী আর্জেন্টিনার জাতীয় দলকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করছেন।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর আজ এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—‘আর্জেন্টিনা-স্পেন বিশ্বকাপ ফাইনাল কীভাবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠলো?’

Football
ছবি: এএফপি

সবাই খেলার দলগুলোকে রাজনীতির প্রতীক করে ফেলেছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিশ্বকাপের জন্য স্পেন ও আর্জেন্টিনা খেললেও অনেক ভক্তের কাছে খেলাটি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংঘাতের ‘ক্ষেত্র’ হয়ে পড়েছে।

এতে আরও বলা হয়—মূলত আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

এক পডকাস্টে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি আশা করছেন বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার হাতে উঠবে। তিনি আরও বলেন, আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি মিলেই ইসরায়েলের ‘মহান বন্ধু’।

আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠায় ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সমাজমাধ্যম এক্সে স্প্যানিশ ভাষায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সারও তার আনন্দের কথা সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

এ কথাও সবাই জানেন যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের এই নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আছে।

আল-মনিটরের প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়—দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে সবচেয়ে বেশি ইহুদি আর্জেন্টিনায় বসবাস করে। তাদের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার। সেখানে প্রায় ৩০ লাখ আরব বা আরব বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়—সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে আর্জেন্টিনার ৫৫ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন ২১ শতাংশ মানুষ।

Football
ছবি: রয়টার্স

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বিজয়ী হলে লিওনেল মেসির জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে একইসঙ্গে ইসরায়েল অধিকৃত জেরুসালেমে ইহুদিদের পবিত্রস্থান ওয়েস্টার্ন ওয়ালে মেসির প্রার্থনা করার ছবি ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে সেই ছবিটি তোলার সময় মেসি স্পেনের বার্সেলোনার হয়ে খেলতেন।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সফরের সময় মেসি ও তার দলের অন্যান্য সদস্যরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি আব্বাসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন।

মেসি নিজে রাজনৈতিক বিষয়ে নীরব থাকলেও তার সমালোচকরা বলেছেন যে ২০২০ সালে তিনি ইসরায়েলি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অরক্যাম-এর শুভেচ্ছাদূত হয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর একাংশ ফুটবলের বিশ্বসংস্থা ফিফায় ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে ক্রমেই আর্জেন্টিনাকেও জড়ানো হচ্ছে।

বিশেষ করে, আর্জেন্টিনার খেলায় ফিফার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ‘ফিফা-আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল-ইহুদি লবি’ ইত্যাদি মিলেমিশে একাকার বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়াম বা মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত খেলায় বিজয়ের ট্রফি কোন দলের হাতে উঠবে তা এই লেখায় বিবেচ্য নয়।

তবে এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক সচেতনদের কোন দলকে সমর্থন করা উচিত তা তারা নিজেরাই ভেবে নেবেন।