বিশ্বকাপের ২২ দিন বাকি

মৃত্যুকূপের আঁধারে চমক ছড়ানো কোস্টারিকার আলোকশিখা

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের 'ডি' গ্রুপকে আগেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুকূপ বা 'গ্রুপ অব ডেথ' হিসেবে। উরুগুয়ে, ইতালি ও ইংল্যান্ড— বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র গ্রুপ হিসেবে সেখানে ছিল তিন সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এই পরাশক্তিদের ভিড়ে কোস্টারিকাকে প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল স্রেফ পয়েন্ট বাড়ানোর এক সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে। তাদের ধারণা ছিল, পয়েন্ট তালিকার তলানিতে থেকে প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেবে তারা।

কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এর অনিশ্চয়তায়, যেখানে 'আন্ডারডগ'দের অভাবনীয় উত্থান ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। ১২ বছর আগে ঠিক তেমনই এক অবিস্মরণীয় রূপকথার জন্ম দিয়েছিল মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা। সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে তারা প্রমাণ করেছিল, মাঠের খেলায় আত্মবিশ্বাস আর সঠিক রণকৌশলের সামনে কোনো পরাশক্তিই অজেয় নয়।

কলম্বিয়ান কোচ হোর্হে লুইস পিন্তো এই মন্ত্রেই উজ্জীবিত ছিলেন। ২০০৫ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মাঝপথে কোস্টারিকার কোচের পদ থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন তিনি। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে এসে তার আস্থা ছিল প্রবল। তিনি জানতেন, তার দলটি কেবল কয়েকজন খেলোয়াড়ের সমষ্টির চেয়েও অনেক বড় কিছু। তখনকার স্কোয়াডকে বলা হচ্ছিল কোস্টারিকার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান। স্কোয়াডের ১৪ জন খেলোয়াড় খেলতেন দেশের বাইরের ক্লাবে, যার মধ্যে ১১ জনই বিভিন্ন ইউরোপিয়ান লিগে।

নিজেদের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামে কোস্টারিকা। প্রথমার্ধেই দিয়েগো লুগানোকে ডি-বক্সে ফাউল করে বসেন জুনিয়র দিয়াজ। পেনাল্টি থেকে গোল করে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন এদিনসন কাভানি। এরপর দিয়েগো ফোরলানের শট গোলরক্ষক কেইলর নাভাস রুখে  দেওয়ায় ব্যবধান দ্বিগুণ হয়নি। তখন মনে হচ্ছিল, প্রত্যাশিত চিত্রনাট্যই বুঝি মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দেখা মেলে এক ভিন্ন কোস্টারিকার। ক্রিস্তিয়ান গামবোয়ার দারুণ ক্রস থেকে বল পেয়ে ডান পায়ের নিচু শটে সমতা ফেরান জোয়েল ক্যাম্পবেল। তিন মিনিট পর ক্রিস্তিয়ান বোলানোসের ফ্রি-কিক থেকে ডাইভিং হেডে দলকে লিড পাইয়ে দেন অস্কার দুয়ার্তে। আর ম্যাচের শেষদিকে ক্যাম্পবেলের পাস থেকে বদলি খেলোয়াড় মার্কো উরেনা স্কোরলাইন করেন ৩-১। চমক জাগিয়ে দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দেয় পিন্তোর শিষ্যরা।

এই জয়টি ছিল বেশ কয়েকটি কারণে ঐতিহাসিক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ওই প্রথমবার কোনো ম্যাচে ৩ গোল করে কোস্টারিকা। একইসঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার বাইরের কোনো দেশের কাছে উরুগুয়ের প্রথম হারের তেতো অভিজ্ঞতা ছিল এটি।

পরের প্রতিপক্ষ ছিল চারবারের শিরোপাজয়ী ইতালি। উড়তে থাকা কোস্টারিকা তাদের বিপক্ষে মেলে ধরে আরেকটি বিস্ময়কর পারফরম্যান্স। ম্যাচের প্রথমার্ধে ইতালির মারিও বালোতেল্লি একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করার পর কোস্টারিকার ক্যাম্পবেলের একটি স্পষ্ট পেনাল্টির আবেদনও নাকচ করে দেন রেফারি। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দিয়াজের বাঁ প্রান্ত থেকে বাড়ানো ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে লক্ষ্যভেদ করেন ব্রায়ান রুইজ। বল ক্রসবারে লেগে গোললাইন পার হয়।

সেই গোলের স্মৃতিচারণ করে তৎকালীন অধিনায়ক রুইজ পরে বলেছিলেন, 'ওই গোলটি চিরদিন কোস্টারিকার ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার পাশাপাশি আমার অংশও হয়ে থাকবে। কৌশলগত দিক থেকে আমাদের কোচ পিন্তো যা চেয়েছিলেন, আমরা ঠিক সেটাই করেছিলাম। গোলের বিল্ড-আপটা ছিল দারুণ— আমার হেডের আগে সাত-আটটি পাস দেওয়া হয়েছিল। বলটি বারে লেগে গোললাইন পার হয়ে মাত্র তিন সেন্টিমিটারের মতো গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরের রাউন্ডে নেওয়ার জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল। এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত!'

বাকি সময় লিড ধরে রেখে ইতালির বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়টি ১৯৯০ সালের আসরের পর প্রথমবারের মতো কোস্টারিকার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলা নিশ্চিত করে। কাকতালীয় ব্যাপার হলো, ২০ বছর আগের ইতিহাসগড়া জয়টিও এসেছিল ২০ জুনেই! এই জয়ের ফলে ডেনমার্কের (দুবার, ১৯৮৬ ও ২০০২ সালের আসরে) পর বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুই সাবেক চ্যাম্পিয়নকে হারানো দ্বিতীয় দলে পরিণত হয় কোস্টারিকা।

এই অবিশ্বাস্য যাত্রা নিয়ে রুইজ যোগ করেছিলেন, 'আমরা "গ্রুপ অব ডেথ"-এ ছিলাম এবং সবাই ভেবেছিল, আমরা শুধু হারতেই এসেছি। আমরা উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিলাম, যা আমাদের বিশাল আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। এরপর আমরা ইতালিকে হারালাম। তাই ওয়েইন রুনি, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, আমরা যে কাউকে হারাতে পারি। সেই ম্যাচে আমরা দারুণ খেলেছিলাম এবং জিততেও পারতাম। তবে ড্র থেকে পাওয়া পয়েন্টটি আমাদের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন করে— আরেকটি ঐতিহাসিক অর্জন।'

১৯৬৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিদায় ঘণ্টা ততক্ষণে বেজে গেছে। নিয়মরক্ষার শেষ ম্যাচে নয়টি পরিবর্তন নিয়ে নামা ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের নেতৃত্বাধীন ইংলিশদের সাথে গোলশূন্য ড্র করে কোস্টারিকা। অপরাজিত থেকে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই নক-আউটে পা রাখে পিন্তোর দল। ৬ পয়েন্ট পাওয়া উরুগুয়ে হয় গ্রুপ রানার্স-আপ। আর ইংল্যান্ডের সাথে সাথে গ্রুপ পর্বেই যাত্রা শেষ হয় ইতালির।

এরপর নাভাসের বীরত্বে শেষ ১৬-তে গ্রিসকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে পরাস্ত করে কোস্টারিকা। মাইকেল উমানার স্পট-কিক জালে জড়াতেই নতুন চূড়ায় পা রাখার উল্লাসে মাতোয়ারা হয় তারা। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দে ভাসে দলটি। মাত্র দুটি ধাপ পার হলেই ফাইনাল— যে লক্ষ্য তখন অকল্পনীয় লাগলেও অসম্ভব মনে হচ্ছিল না তাদের জন্য।

শেষ আটে অবশ্য রুইজ-নাভাসদের স্বপ্নযাত্রা থামিয়ে দেয় নেদারল্যান্ডস। যদিও শক্তিশালী ডাচদের বিপক্ষে বুক চিতিয়েই লড়াই করেছিল কোস্টারিকা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচটি ছিল গোলশূন্য। কিন্তু টাইব্রেকারের ঠিক আগে দেখা মেলে আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনার। নেদারল্যান্ডসের কোচ লুই ফন হালের বদলি গোলরক্ষক হিসেবে টিম ক্রুলকে মাঠে নামানোর 'মাস্টারস্ট্রোক' গড়ে দেয় পার্থক্য। রুইজ ও উমানার শট রুখে দিয়ে ডাচদের সেমিফাইনালে নিয়ে যান ক্রুল।

সেই পেনাল্টি শুট-আউটের ভাগ্য হয়তো কোস্টারিকার রূপকথার দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপের মৃত্যুকূপে তাদের জ্বালানো সেই আলোকশিখা ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।