৯২ দিন বাকি

নির্বাসন থেকে অমরত্ব: পাওলো রসির অলৌকিক পুনর্জন্ম

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

মহাকালের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে মানুষের জীবন মাঝে মাঝে এমন সব অদ্ভুত রঙে আঁকা হয়, যার কাছে হার মানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপকথার কল্পনাও। ধুলোয় লুটিয়ে পড়া এক নায়কের পতন, গ্লানির নিকষ অন্ধকার আর নির্বাসনের দমবন্ধ করা প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসে পরেন বিশ্বজয়ের মুকুট। ইতালির ফুটবল ইতিহাসে পাওলো রসি এমনই একজন। তিনি কেবল এক রক্তমাংসের স্ট্রাইকারের নাম নয়; তিনি সেই ফিনিক্স পাখি, যিনি নিজের কলঙ্কের ছাইভস্ম থেকে ডানা মেলে নীল জার্সিধারী আজ্জুরিদের এনে দিয়েছিলেন অনন্য গৌরব।

ইতালির ফুটবল ইতিহাসে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের গল্প লিখতে গেলে এক সময় এসে কলম যেন থমকে যায়। কারণ সেই গল্পে আছে এমন এক নাটকীয়তা, যা কখনও কখনও কল্পনাকেও হার মানায়। সেখানে আছে পতনের গহ্বর, দীর্ঘ নির্বাসন, উপহাসের ঝড়, আর আছে সেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, যা ফুটবলকে রূপ দিয়েছিল এক অপার্থিব নাট্যমঞ্চে।

সত্তরের দশকের শেষভাগে ইতালির ফুটবল আকাশে একটি নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়েছিল। ছোটখাটো গড়ন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর শিকারির মতো গোলের গন্ধ পাওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা, এই সব মিলিয়ে রসি দ্রুতই হয়ে উঠেছিলেন ইতালির আশার প্রতীক। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে তিনি ইতালির আক্রমণের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিলেন। তরুণ রসির দৌড়, তার চতুর পজিশনিং, আর হঠাৎ বজ্রপাতের মতো গোল, সব মিলিয়ে তাকে দেখে মনে হতো, ভবিষ্যতের ইতালি যেন তার কাঁধেই দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু মানুষের জীবনের মতোই ফুটবলের পথও কখনও সোজা থাকে না।

১৯৮০ সালে ইতালিয়ান ফুটবলকে কাঁপিয়ে দেয় এক ভয়ংকর কেলেঙ্কারি। 'টোটোনেরো' নামের সেই ম্যাচ-ফিক্সিং কাণ্ড। দেশের ফুটবল হঠাৎই নেমে যায় অবিশ্বাস ও লজ্জার অন্ধকারে। সেই কেলেঙ্কারির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাওলো রসির জীবনেও। অভিযোগ ওঠে, তিনিও নাকি সেই অন্ধকার চক্রের অংশ ছিলেন।

ফুটবল আদালত রায় দিল, তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা।

যদিও শাস্তি পরবর্তীতে কমিয়ে দুই বছর করা হয়। তবে একজন ফুটবলারের জন্য এই শাস্তি কেবল মাঠ থেকে দূরে থাকা নয়; এটি যেন তার স্বপ্ন, তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব সবকিছুকে একসাথে নির্বাসনে পাঠানো।

এই দুই বছর রসির জন্য ছিল এক আক্ষরিক ও মানসিক কারাগার। সবুজ গালিচার উন্মাদনা, গ্যালারির গর্জন আর ফুটবলের কোলাহল থেকে নির্বাসিত হয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা আর অপমানের গ্লানি নিয়ে তাকে প্রতিটি প্রহর গুনতে হয়েছিল। ইতালির গণমাধ্যম, যারা একসময় তাকে মাথায় তুলে নেচেছিল, তারাই তাকে 'বিশ্বাসঘাতক' আখ্যা দিয়ে তার আত্মায় পেরেক ঠুকতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। যে পাওলো রসি ছিলেন দেশের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, তিনি পরিণত হলেন এক ঘৃণিত খলনায়কে।

দুই বছরের দীর্ঘ অন্ধকার।

গোটা বিশ্ব যখন তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যখন অন্ধকারের জমাট চাদরে ঢাকা পড়েছিল তার সমস্ত অর্জন, তখন কেবল একজন মানুষ তার ওপর থেকে বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস হারাননি। তিনি ইতালির তৎকালীন রূপকার কোচ এঞ্জো বেয়ারজোত। বেয়ারজোত তার জহুরির চোখে জানতেন, রসির ভেতরে যে খুনে আর ধূর্ত স্ট্রাইকার ঘুমিয়ে আছে, ইতালির বিশ্বকাপ জিততে সেই গুপ্তধনেরই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে রসির নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হয়। দীর্ঘ দুই বছর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বাইরে থাকা, শারীরিকভাবে আনফিট এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এক খেলোয়াড়কে সরাসরি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডেকে নিয়ে বেয়ারজোত যেন এক বিশাল জুয়া খেললেন। ইতালির গণমাধ্যম ক্ষোভে ফেটে পড়ল। তারা রসিকে 'মাঠের ভূত' বলে বিষোদগার করতে লাগল। কিন্তু বেয়ারজোত ছিলেন ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক অটল পাহাড়, তিনি যেন এক পিতার পরম স্নেহে সমস্ত সমালোচনার তীর বুক পেতে নিয়ে আগলে রাখলেন তার হারানো সন্তানকে।

স্পেনের খরতাপময় মাঠে ইতালির শুরুর পথচলা ছিল এক বিষণ্ণ বিকেলের মতো। প্রথম রাউন্ডের তিনটি ম্যাচেই তারা বিবর্ণ ড্র করে এবং বহু কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পরের রাউন্ডে ওঠে। রসির পারফরম্যান্স ছিল এককথায় হতশ্রী। মাঠে তাকে ধীর, ক্লান্ত এবং ছন্দহীন মনে হচ্ছিল। সমালোচকদের কলম যেন শাণিত তরবারির মতো একের পর এক আঘাত হানছিল রসির অস্তিত্বের ওপর। সবাই ধরে নিয়েছিল, বেয়ারজোতের এই জুয়া চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এবং রসির যুগ চিরতরে অস্তমিত হয়েছে।

অতঃপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালি পড়ল 'গ্রুপ অফ ডেথে'। প্রতিপক্ষ হিসেবে তারা পেল জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের নিয়ে গড়া ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও নান্দনিক ব্রাজিল দল এবং তরুণ ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে। আর্জেন্টিনাকে হারালেও, সেমিফাইনালে যেতে হলে ইতালির সামনে সমীকরণ ছিল একটিই, অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিলকে হারাতেই হবে।

৫ই জুলাই, ১৯৮২।

বার্সেলোনার সারিয়া স্টেডিয়াম। সেদিন যেন অলিম্পাসের দেবতারাও নেমে এসেছিলেন রসির পায়ে ভর করে। সমালোচনার সমস্ত বিষাক্ত কাঁটা উপড়ে ফেলে সেদিন পুনর্জন্ম হলো পাওলো রসির। ম্যাচের ৫ মিনিটে জাদুকরী প্রথম গোল, এরপর ২৫ মিনিটে নিখুঁত দ্বিতীয় এবং ৭৪ মিনিটে জয়সূচক তৃতীয় গোল! ব্রাজিলের মতো ঐশ্বরিক দলের বিপক্ষে রসির সেই অতিপ্রাকৃত হ্যাটট্রিক পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিল। ৩-২ গোলের সেই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় ছিল না, সেটি ছিল পাওলো রসির নিজের ভেতরের যন্ত্রণার ওপর বিজয়, অপমানের ভারী শৃঙ্খল ভেঙে এক মহিমান্বিত উত্থানের কাব্য।

সারিয়া স্টেডিয়ামের সেই অলৌকিক বিকালের পর রসি যেন পরিণত হলেন এক অপ্রতিরোধ্য সামুদ্রিক ঝড়ে। সেমিফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ইতালির ২-০ ব্যবধানের জয়ে দুটি গোলই এলো তার জাদুকরী পা থেকে।

এরপর ১১ই জুলাই, মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে স্বপ্নের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগের শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের ৫৭ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর এক ক্ষিপ্র ফিনিশিংয়ে রসি ভেঙে দিলেন ডেডলক, যার পথ ধরে ইতালি ম্যাচটি জিতল ৩-১ গোলে। দীর্ঘ ৪৪ বছর পর ইতালি ফিরে পেল তাদের হারানো মুকুট, পেল তৃতীয় বিশ্বকাপের স্বাদ।

যে রসি টুর্নামেন্টের শুরুতে ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক 'ভূত', সেই রসি ৬ গোল করে জিতে নিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার 'গোল্ডেন বুট' এবং সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল'। বছর শেষে ইউরোপের বর্ষসেরা ফুটবলার হিসেবে 'ব্যালন ডি'অর'ও উঠল তার হাতে। এখনও পর্যন্ত এই কীর্তিতে তিনিই একমাত্র।

ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম গল্পই এত নাটকীয়, এত মানবিক, এত কাব্যিক।

এটি কেবল একজন ফুটবলারের জয়ের গল্প নয়, এটি অপমানের বিরুদ্ধে মানুষের জয়ের গল্প। অন্ধকার যত গভীরই হোক, কোনো এক প্রভাতে আলো ফিরে আসে। আর সেই আলোয় আবার জন্ম নেয় এক নতুন মানুষ।