মারাকানার কান্না
রিও ডি জেনিরোর আকাশে সেদিন রৌদ্রের ঝলকানি ছিল না, ছিল আস্ত একটি জাতির অহংকার আর সোনালি স্বপ্নের তীব্র প্রতিফলন। গুয়ানাবারা উপসাগরের তীর ঘেঁষে সদ্য মাথা তুলে দাঁড়ানো কংক্রিটের দানব, মারাকানা স্টেডিয়াম। এটি তখন কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং দুই কোটি ব্রাজিলিয়ানের আশা, আকাঙ্ক্ষা আর শ্রেষ্ঠত্বের এক বিশাল উপাসনালয়। বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি ছিল যেন কেবলই এক রাজ্যাভিষেকের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। রাজপথ থেকে শুরু করে রিওর প্রতিটি অলিগলি তখন সাম্বার তালে মাতোয়ারা। কার্নিভালের আগেই নেমে এসেছে আরেক কার্নিভাল। ম্যাচের আগের দিনেই ব্রাজিলের দৈনিকগুলো প্রথম পাতায় বড় বড় হরফে, দলের ছবি ছেপে ঘোষণা করে দিয়েছিল, 'এরাই আমাদের বিশ্বজয়ী।' ড্র করলেই শিরোপা উঠবে ব্রাজিলের হাতে, আর সেই আনন্দে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের এক বাঁধভাঙা জনসমুদ্র আছড়ে পড়েছিল মারাকানার বিশাল গ্যালারিতে। তাদের গায়ে মোড়ানো ছিল তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি; কে জানত, ওই শুভ্র বসনটিই সেদিন বিজয়ের আবিরের বদলে পরিণত হতে যাচ্ছে এক অদৃশ্য কাফনে!
মারাকানার সেই বিশাল গ্যালারি থেকে যখন অবিরাম গর্জনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, ঠিক তার নিচে, উরুগুয়ের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ছিল শ্মশানের মতো শান্ত, অথচ বারুদে ঠাসা। ব্রাজিলের ওই অতি আত্মবিশ্বাস আর অগ্রিম উদযাপনের দাম্ভিকতা যেন ভেতরে ভেতরে তাতিয়ে দিচ্ছিল উরুগুয়ে দলকে। বিশেষ করে তাদের অধিনায়ক, 'এল নেগ্রো হেফে' বা 'কালো সেনাপতি' খ্যাত অবদুলিও ভারেলাকে। ড্রেসিংরুমের মেঝেতে ব্রাজিলের সেই অহংকারী খবরের কাগজগুলো ছুড়ে ফেলে, সতীর্থদের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন এক অমোঘ মন্ত্র। কোচের রক্ষণাত্মক কৌশলের তোয়াক্কা না করে তিনি বলেছিলেন, 'গ্যালারির ওই লাখ লাখ মানুষ আমাদের সঙ্গে খেলবে না, খেলবে মাঠে থাকা ওই এগারোজন। বাইরের মানুষগুলো কাঠের পুতুল মাত্র। আজ বুক চিতিয়ে লড়াই করো, এদের হারানোই আমাদের একমাত্র কাজ।' সেদিন ভারেলার সেই ইস্পাতকঠিন জেদ আর বিদ্রোহী সত্তাই উরুগুয়েকে পরিয়ে দিয়েছিল এক অজেয় বর্ম।
রেফারির বাঁশি বাজার পর থেকেই শুরু হলো স্নায়ুর চূড়ান্ত পরীক্ষা। প্রথমার্ধ কাটল গোলশূন্যভাবে, তবে গ্যালারির অপেক্ষা তখনো ফুরোয়নি। দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় যখন ফ্রায়াকা উরুগুয়ের জালে বল জড়ালেন, মারাকানা তখন যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে বিস্ফোরিত হলো। আনন্দ আর উল্লাসের উত্তপ্ত লাভা যেন ভাসিয়ে দিচ্ছিল পুরো রিও শহরকে। কিন্তু এই মহোৎসব দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ৬৬ মিনিটে হুয়ান আলবার্তো শিয়াফিনোর গোলে সমতা ফেরাল উরুগুয়ে। গ্যালারির সেই কানফাটানো গর্জনে হঠাৎ যেন নামল এক অশুভ প্রশান্তি, মনের কোণে উঁকি দিতে শুরু করল এক অজানা শঙ্কা। এরপর এল সেই ৭৯তম মিনিট, ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাসের মুহূর্ত। ডান প্রান্ত ধরে তীব্র বেগে বল নিয়ে ছুটে এলেন আলসাইডস ঘিঘিয়া। ব্রাজিলের গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসা ভেবেছিলেন, ঘিঘিয়া হয়তো আগেরবারের মতোই মাঝখানে থাকা সতীর্থকে বল বাড়াবেন। বারবোসা সামান্য সামনে এগিয়ে আসতেই, সেই এক চিলতে ভুলের সুযোগ নিয়ে ঘিঘিয়ার পা থেকে বেরিয়ে এল একটি নিচু শট। বলটি বারবোসার হাত আর পোস্টের মাঝখানের সামান্য ফাঁক গলে আশ্রয় নিল জালের ঠিকানায়।
মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়াল। চোখের পলকে মারাকানার সেই দুই লক্ষ মানুষের গগনবিদারী কোলাহল পরিণত হলো এক অসীম নিস্তব্ধতায়। সেই নীরবতা ছিল কান্নার চেয়েও ভারী, মৃত্যুর চেয়েও শীতল। যেন আস্ত একটি দেশের হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। ঘিঘিয়া পরবর্তীকালে সেই অতিপ্রাকৃত মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, 'পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র তিনজন মানুষ হাতের ইশারায় মারাকানাকে নীরব করতে পেরেছে; পোপ, ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা আর আমি।" রেফারির শেষ বাঁশি যখন বাজল, তখন মাঠের ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা সবুজ ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ে ডুকরে কাঁদছেন। গ্যালারিতে তখন স্তব্ধতা, অবিশ্বাস আর আতঙ্কের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। জুলেরিমে ট্রফিটা যে কখন নীরবে উরুগুয়ের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা কেউ টেরই পেল না।
সেদিন কেবল মাঠেই নয়, রেডিওর সামনে বসে থাকা অগণিত মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, শোক সইতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ। পুরো ব্রাজিল যেন এক অসীম শোকের চাদরে ঢেকে গেল, মারাকানা পরিণত হলো বেদনার এক বিশাল বেদিতে। যে রাজপথ একটু আগেও সাম্বার উদ্দাম ছন্দে মুখরিত হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, মুহূর্তেই সেখানে নেমে এল গোরস্থানের হিমশীতল নিস্তব্ধতা। বাড়িগুলোর উনুন সেদিন আর জ্বলেনি; মাতৃহীন এক অনাথ শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে পড়ে রইল আস্ত এক মহানগরী। ব্রাজিলের বিখ্যাত লেখক নেলসন রদ্রিগেজ পরবর্তীতে আক্ষেপের কালিতে লিখেছিলেন, '১৯৫০ সালের এই পরাজয়ই হলো আমাদের নিজস্ব হিরোশিমা।' নিছক কোনো ফুটবল ম্যাচের হার ছিল না সেটি, বরং তা ছিল ব্রাজিলের জাতীয় সত্তা আর আত্মপরিচয়ের মর্মমূলে এক প্রচণ্ড কুঠারাঘাত। পরদিন সকালে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় কোনো শব্দের আস্ফালন ছিল না, ছিল কেবল শোকের গাঢ় কালো বর্ডারে মোড়ানো এক বোবা কান্না।
ব্রাজিলের আপামর জনতা কখনোই তাদের সেই হতভাগ্য নায়কদের ক্ষমা করতে পারেনি। বিশেষ করে গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসা পরিণত হলেন সেই জাতীয় শোকের এক জ্যান্ত বলির পাঁঠায়। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে যিনি দুর্ভেদ্য চীনের প্রাচীর হয়ে গোলবার আগলে রেখেছিলেন, আলসিদেস ঘিঘিয়ার সেই একটিমাত্র গোল তাঁকে আজীবনের জন্য করে দিল 'অভিশপ্ত'। একবার এক দোকানে এক মা তার ছোট্ট সন্তানকে বারবোসার দিকে আঙুল তাক করে বলেছিলেন, 'দেখো বাছা, ওই সেই লোক, যে পুরো ব্রাজিলকে কাঁদিয়েছিল।' মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক বুক অনন্ত হাহাকার আর না করা অপরাধবোধের ক্রুশ কাঁধে নিয়ে একাই পথ হেঁটেছেন বারবোসা। পথেঘাটে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলত, এমনকি জাতীয় দলের অনুশীলনেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ২০০০ সালে মৃত্যুর ঠিক আগে এক সাক্ষাৎকারে ভগ্নহৃদয়, নিঃস্ব বারবোসা বলেছিলেন, 'ব্রাজিলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছরের জেল। কিন্তু আমি সেই ১৯৫০ সাল থেকে ৫০ বছর ধরে এমন এক অপরাধের সাজা টানছি, যা আমি একা করিনি।'
সেই অভাবনীয় ট্র্যাজেডি ব্রাজিলের ফুটবলের মানচিত্রটাই চিরতরে বদলে দিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা জন্মালো, ওই শুভ্র-সাদা জার্সিটিই আসলে যাবতীয় অপয়া আর দুর্ভাগ্যের প্রতীক। এক লহমায় বিসর্জন দেওয়া হলো একটি জাতির দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্যকে। সিদ্ধান্ত হলো, ব্রাজিলের দামাল ছেলেরা আর কোনোদিন ওই শ্বেতশুভ্র পোশাকে মাঠে নামবে না। অতঃপর জন্ম নিল আজকের সেই বিশ্ববিখ্যাত 'ক্যানারিনহো' বা উজ্জ্বল হলুদ জার্সি। কিন্তু সেই হলুদ জার্সির সোনালি চাকচিক্যও কি মারাকানার সেই দগদগে ক্ষতের পুরোপুরি উপশম করতে পেরেছিল? ১৯৫৮ সালে তরুণ পেলের জাদুকরী পায়ে ভর করে যখন প্রথম বিশ্বজয়ের আনন্দে গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখনও হয়তো পাড়ার বৃদ্ধরা রেডিওর সামনে বসে ১৯৫০-এর সেই বিষাদমাখা শেষ বাঁশির শব্দই খুঁজে ফিরতেন।
মারাকানার সেই চাপা কান্না আসলে কোনোদিনই থামেনি। আজও রিও’র সোঁদা বাতাসে কান পাতলে দুই লক্ষ মানুষের সেই বুকফাটা স্তব্ধতার প্রতিধ্বনি যেন ফিসফিস করে ওঠে। এটি এমন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি, যেখানে একটি সবুজ ফুটবল মাঠ রূপান্তরিত হয়েছিল আস্ত এক জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার গণকবরে; আর জালের ভেতর জড়ানো একটিমাত্র বল হয়ে উঠেছিল এক চিরস্থায়ী অভিশাপের নাম। এক আজন্ম বেদনার উত্তরাধিকার।