সাক্ষাৎকার

পদ্মা ব্যারাজ কেন বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে?

খায়রুল হাসান জাহিন

প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের পলি, পানি ও পরিবেশগত সংকট সমাধানের পরিবর্তে আরও গভীর করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান। দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক খায়রুল হাসান জাহিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি পদ্মা ব্যারাজের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।

দ্য ডেইলি স্টার: প্রস্তাবিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মো. খালেকুজ্জামান: মূল প্রশ্নে আসার আগে, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটির নাম প্রসঙ্গে আমার কিছু বলা প্রয়োজন। প্রকল্পটির মূল নাম ছিল ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ এবং সেটিই বেশি উপযুক্ত। কারণ, বাংলাদেশে প্রবেশের পর দৌলতদিয়া পর্যন্ত নদীটি ‘গঙ্গা’ নামেই পরিচিত। এটিকে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ বলা হলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি আমরা উপেক্ষা করছি।

বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বা বেঙ্গল ডেল্টা হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম একটি ব-দ্বীপ। নদীবাহিত পলি জমার মাধ্যমে ব-দ্বীপ গঠিত হয়। একটি ব-দ্বীপের টিকে থাকা, এর ভূখণ্ড ধরে রাখা এবং সমুদ্রের দিকে বিস্তৃত হতে থাকায় উপকূলীয় এলাকায় পলি জমা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। পলি জমা কমে গেলে বদ্বীপ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, বিশেষত যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে। সেই বিবেচনায় পলি সঞ্চয়ের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো দিয়ে বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২০০ কোটি টন পলি আসত। বর্তমানে এই পরিমাণ ১০০ কোটিরও নিচে নেমে এসেছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি ৬০ থেকে ৭০ কোটি টনের মধ্যে। এর প্রধান কারণ উজানের হস্তক্ষেপ। গঙ্গা-যমুনা নদী অববাহিকার মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ বাংলাদেশের ভেতরে, বাকি ৯২ শতাংশ রয়েছে ভারত, নেপাল, চীন ও ভুটানে। ফারাক্কার উজানে গঙ্গা অববাহিকায় অন্তত ৩৪টি বড় স্থাপনা রয়েছে। ছোট-বড় সব ধরনের হস্তক্ষেপ মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে ধারণা করা হয়।

১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে, গঙ্গা নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকারী পলির একটি বিশাল অংশ উজানেই আটকে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পলির এক-তৃতীয়াংশ থেকে প্রায় অর্ধেক এখন ফারাক্কার পেছনে জমা হয়ে থাকছে। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মার ওপর আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে, বর্ষাকালে এখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পলিও সেখানে আটকে যেতে পারে।

বর্তমানে গঙ্গা প্রতিবছর আনুমানিক ৪০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এর বড় অংশ মেঘনা নদীপ্রণালির মধ্য দিয়ে মোহনার দিকে প্রবাহিত হয়। কিছু অংশ উপকূলীয় প্লাবনভূমিতে জমা হয়, আর বাকিটা সাগরে চলে যায়। আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে ভাটির দিকে পলির সরবরাহ আরও কমে যাবে এবং অধিকাংশ পলি উজান ও ব্যারাজের আশপাশেই জমা হতে থাকবে।

ফারাক্কার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। স্যান্ডর্প ও কল্যাণ রুদ্রের গবেষণায় দেখা গেছে, ফারাক্কা বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি আটকে রাখে। এর ফলে উজানে ব্যাপক পলি জমা হয়েছে, নদীর পানি বহনক্ষমতা কমেছে এবং জলাবদ্ধতা, বন্যা ও ভাঙন বেড়েছে। ভারতের মালদায় প্রায় ৪০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে ভাটির দিকে মুর্শিদাবাদে পানির সংকট প্রায়ই দেখা দেয়। আবার হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ছাড়লে ভাঙন তীব্র হয়। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার জমি বিলীন হয়েছে এবং প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এগুলো হয়তো ভারতের সমস্যা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্যও তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভারতের বহু বিজ্ঞানী, পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা মনে করেন, ফারাক্কা ছিল মৌলিকভাবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে এর কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবাদে ব্যারাজটি অপসারণের দাবিতেও আন্দোলন হয়েছে। একই নদী ব্যবস্থায় বাংলাদেশ আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণের কথা ভাবার আগে সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

ডেইলি স্টার: উজান থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ২০২৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত?

মো. খালেকুজ্জামান: ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এটি একটি অত্যন্ত অপরিণত এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা করার আগে আমাদের আরও মৌলিক একটি বিষয় মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পায় না। চুক্তি সইয়েরর পরও আমরা ধারাবাহিকভাবে আমাদের ন্যায্য হিস্যা পাইনি। ১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের তথ্য নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছিল, যেখানে আমিও যুক্ত ছিলাম। আমরা দেখেছি, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ৫২ শতাংশ সময় বাংলাদেশ তার ন্যায্য পরিমাণ পানি পায়নি। সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় ১১ মার্চ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত। এ সময়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় তার প্রাপ্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

মূল সমস্যাটি হলো, বর্তমান চুক্তিতে কোনো 'নিশ্চয়তা বিধান' বা গ্যারান্টি ক্লজ নেই। ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে যে পরিমাণ পানি থাকে, তা মোটামুটি ৫০-৫০ ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। ধরুন, প্রবাহ কমে ৫০ হাজার কিউসেকে নেমে এলো। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাবে ২৫ হাজার কিউসেক, যদিও তার পাওয়ার কথা ছিল ৩৫ হাজার কিউসেক। কারণ, প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ফারাক্কা পর্যন্তই পৌঁছায় না।

তাই জরুরি প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কী হবে? আমার মতে, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত গঙ্গা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী আকারে নবায়ন করা, যেখানে একটি গ্যারান্টি ক্লজ থাকবে। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এমন গ্যারান্টি ছিল, কিন্তু বর্তমান চুক্তিতে তা নেই। পরবর্তী চুক্তি আরও দৃঢ় হওয়া উচিত এবং সম্ভব হলে শুধু শুষ্ক মৌসুমের পাঁচ মাস নয়, পুরো ১২ মাসকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন, নদীর প্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতা বদলে যাচ্ছে। তাই আমাদের এমন একটি অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি প্রয়োজন, যা ফারাক্কায় শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করবে।

বর্তমানে এই চুক্তি শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু নেপালও গঙ্গা অববাহিকার অংশ। যদি আমরা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসম্পন্ন কোনো চুক্তি চাই, তাহলে সেটি হতে হবে অববাহিকাভিত্তিক, বছরজুড়ে কার্যকর, নেপালকে অন্তর্ভুক্তকারী এবং শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকারী। চুক্তিতে শুধু পানি নয়, পলির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে এবং কীভাবে সেই পলি ভাটিতে বাংলাদেশে প্রবাহিত হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। একইসঙ্গে, ফারাক্কার উজানে নতুন কোনো পানি প্রত্যাহারমূলক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলে ভারতকে তা বাংলাদেশকে জানাতে হবে। বৃহত্তর গঙ্গা অববাহিকায় ইতোমধ্যে অন্তত ৩৪টি বড় স্থাপনা রয়েছে। নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই অবহিত করতে হবে। কৌশলগত কারণেও বাংলাদেশের আগে দেখা উচিত, চুক্তি নবায়নের আলোচনা কোন দিকে যাচ্ছে। এরপরই কেবল আমরা অনুমান করতে পারব বাস্তবে কতটুকু পানি পাওয়া যাবে এবং তা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করতে পারব।

যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

ডেইলি স্টার: তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের জন্য কী শিক্ষা দেয়? সেচ, নৌ-চলাচল ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকল্পটির দাবিগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?

মো. খালেকুজ্জামান: তিস্তার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা নদীতে বাংলাদেশের একটি ব্যারাজ ও সেচ প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে পর্যাপ্ত পানি না আসায় তিস্তা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অংশ শুকনো বালুচরে পরিণত হয়েছে। কোনো ব্যারাজ বা বাঁধ নিজে পানি সৃষ্টি করতে পারে না। পানি আসতে হবে উজান থেকে।

তিস্তা ব্যারাজ থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে চাই, তাহলে প্রতিটি মৌসুমে ভারত থেকে ঠিক কতটুকু পানি আসবে এবং সেই প্রবাহের নিশ্চয়তা থাকবে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে না।

বাংলাদেশের যেসব এলাকা গঙ্গা নদীর পানির ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল, সেগুলোর অবস্থান মূলত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমানে এই অঞ্চলটি তীব্র পরিবেশগত ও পানিসম্পদ-সংক্রান্ত সংকটের সম্মুখীন। সুন্দরবন এলাকা, ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প’ এলাকা এবং ভবদহের মতো জলাবদ্ধতাকবলিত অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে লবণাক্ততার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের উদ্বেগ বা শঙ্কাটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও যথার্থ। তবে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণ করাটা সঠিক বা উপযুক্ত পদক্ষেপ নয়।

দেশের মোট ভূমির প্রায় ৩৭ শতাংশ গঙ্গানির্ভর অঞ্চলগুলো মূলত  বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। ওই এলাকা ইতোমধ্যে মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। সুন্দরবন, গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্প এলাকা এবং ভবদহের মতো জলাবদ্ধ অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। বাংলাদেশের উদ্বেগ একেবারেই যৌক্তিক। কিন্তু এর সমাধান হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ সঠিক পথ নয়।

প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, ব্যারাজে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনমিটার বা প্রায় ৩ বিসিএম পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এখন এটিকে পদ্মা দিয়ে বছরে বাংলাদেশে প্রবেশ করা মোট পানিপ্রবাহের সঙ্গে তুলনা করুন, যা বছরে প্রায় ৩৫০ থেকে ৫২৫ বিসিএম। সেই তুলনায় ৩ বিসিএম পানি সংরক্ষণ অত্যন্ত সামান্য।

বড় বন্যার সময় পদ্মা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭৫ হাজার ঘনমিটার পানি বাংলাদেশে ঢুকতে পারে। বড় ধরনের বন্যায় মাত্র একদিনেই পদ্মা দিয়ে প্রায় ৬ বিসিএম পানি প্রবাহিত হতে পারে। অর্থাৎ, তিন মাসে ব্যারাজে যত পানি সংরক্ষণের কথা বলা হচ্ছে, তার দ্বিগুণ পানি একদিনের বন্যাতেই প্রবাহিত হতে পারে।

কল্পটির অন্যতম প্রধান দাবি হলো, এর মাধ্যমে ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। কিন্তু আমার হিসাব অনুযায়ী, ওই পরিমাণ জমিতে সেচ দিতে ৩ বিসিএম নয়, বরং ৯ থেকে ২৬ বিসিএম পানি প্রয়োজন হবে। নিম্নতম হিসাব ধরলেও ১৯ লাখ হেক্টরে সেচ দিতে প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিসিএম পানি লাগবে। অথচ প্রকল্পে দাবি করা হচ্ছে, ব্যারাজ থেকেই পুরো এলাকার সেচের পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এটি বিভ্রান্তিকর দাবি। আংশিক সেচ দিলেও প্রস্তাবিত সংরক্ষণ সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি পানি প্রয়োজন হবে। আর যদি সংরক্ষিত পানির শতভাগই সেচে ব্যবহার করা হয়, তাহলে পরিবেশগত প্রবাহ, মৎস্যসম্পদ বা নৌ-চলাচলের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ব্যারাজ নৌ-চলাচল বাড়াবে, সেচ সম্প্রসারণ করবে এবং লবণাক্ততা কমাবে। কিন্তু সংরক্ষিত সব পানি সেচে ব্যবহার করলেও ঘোষিত সেচ চাহিদা পূরণ হবে না। ফলে নৌ-চলাচল উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত পানি অবশিষ্ট থাকবে—এমন দাবির কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই।

আরও গভীর সমস্যা হলো, বিদ্যমান চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ফারাক্কার ভাটিতে পদ্মা শুষ্ক মৌসুমে ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত পানি পায় না। আর তিস্তায় কোনো চুক্তিই নেই, সেখানে পানি প্রায় পৌঁছায়ই না। পাংশায় প্রস্তাবিত ব্যারাজের ভাটিতে গোয়ালন্দ পর্যন্ত আরও ২০ থেকে ২৩ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। যদি সব পানি ব্যারাজের পেছনে আটকে রাখা হয়, তাহলে ওই অংশটি এক ধরনের ‘ডাবল ফারাক্কা’ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারে।

ডেইলি স্টার: প্রকল্পে লবণাক্ততা কমানো, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, ভাঙন হ্রাস ও উন্নত নদী ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব দাবি কতটা বাস্তবসম্মত এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশের ওপর কী ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে?

মো. খালেকুজ্জামান: এটি সত্য যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ততা বাড়ছে। কিন্তু প্রকল্পে মাত্র প্রায় ৩ বিসিএম পরিমাণ পানি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে লবণাক্ততা কমানোর জন্য এই পরিমাণ যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের নথিতেই উল্লেখ আছে, সম্ভাব্য লবণাক্ততা হ্রাসের পরিমাণ হবে সীমিত।

ধরা যাক, গড়াই, মধুমতি, হিসনা, মাথাভাঙ্গা ও চন্দনার মতো নদীগুলো দিয়ে মিঠাপানির সরবরাহ বাড়ার ফলে সুন্দরবন বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় লবণাক্ততা সামান্য কমল। তবুও মেঘনার মোহনা ও বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে (পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি এবং সম্ভবত মাদারীপুরও রয়েছে) লবণাক্ততা বেড়ে যেতে পারে। কারণ, গঙ্গা-পদ্মা ব্যবস্থা থেকে মেঘনা ও বৃহত্তর বরিশালের নদীগুলো দিয়ে যে মিঠাপানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হওয়ার কথা, তা কমে যাবে। অর্থাৎ, এক অঞ্চলে সামান্য লবণাক্ততা কমলেও অন্যত্র তা বেড়ে যেতে পারে। এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর।

প্রকল্পের নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, মাছের উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে ইলিশ মাছ এলাহাবাদ পর্যন্ত উজানে যেতে পারত। ফারাক্কা সেই চলাচল ব্যাহত করেছে। পাংশায় আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে পদ্মা ও গঙ্গা হয়ে ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছের চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে মাছের উৎপাদন বাড়ার চেয়ে কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দুটি ফিশ ল্যাডার বা মাছ চলাচলের সিঁড়ি রাখা হবে। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ফিশ ল্যাডার কার্যকর হতে পারে। তবে এর সাফল্য অনেকটাই মাছের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে এমন কোনো গবেষণা বা নজির নেই, যা প্রমাণ করে যে ইলিশ, রুই, কাতলা কিংবা অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছ এই সিঁড়িগুলো ব্যবহার করবে। আমাদের নদীগুলোতে দুটি ছোট ফিশ ল্যাডার কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে আমার গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।

আরেকটি প্রতিশ্রুতি হলো, ব্যারাজ নদীভাঙন কমাবে। কিন্তু ফারাক্কার অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ব্যারাজের উজানে পানি জমা হয়। বর্ষাকালে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ভাটিতে ছেড়ে দিলে প্রবাহের তীব্রতা বেড়ে গিয়ে ভাঙন আরও বাড়তে পারে। মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—নদীভাঙন কমবে, নাকি বাড়বে? আমাদের অভিজ্ঞতা ব্যারাজ ভাঙন কমায়, এমন দাবিকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশের কোনো বৃহৎ নদীতে এত বড় পরিসরে এ ধরনের পরীক্ষা আগে কখনো করা হয়নি। পদ্মার মতো বিশাল একটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যারাজের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হলে সেটিকে বিপর্যয়ের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত ব্যারাজের উজানেও জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। কারণ পানি আগের মতো স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারবে না। ফারাক্কার উজানেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রতি বছর ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ থেকে ৬০ কোটি টন পলি জমা হয়। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে এখনো বাংলাদেশে পৌঁছানো বিপুল পরিমাণ পলির বড় অংশ নতুন ব্যারাজের উজানেই জমা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা বাড়বে এবং বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

প্রকল্পে সেচ সম্প্রসারণ, নৌ-চলাচলের উন্নয়ন, লবণাক্ততা হ্রাস, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, জলাবদ্ধতা কমানো, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে, এসব প্রতিশ্রুতি অন্তঃসারশূন্য ও বিভ্রান্তিকর। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পানির প্রাপ্যতা। শক্তিশালী চুক্তি ও গ্যারান্টি ধারা ছাড়া পদ্মা ব্যারাজ তিস্তা প্রকল্পের মতো আরেকটি শুকনো, উন্মুক্ত নদীখাত তৈরি করতে পারে। কোনো ব্যারাজ নিজে পানি সৃষ্টি করতে পারে না।

ডেইলি স্টার: পদ্মা ব্যারাজের মতো বিশাল প্রকল্পের পেছনে না ছুটে দীর্ঘমেয়াদে পানি ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কী ধরনের পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করা উচিত?

মো. খালেকুজ্জামান: বাংলাদেশের উচিত জাতিসংঘের ‘ওয়াটারকোর্স কনভেনশনে’ যোগ দেওয়া এবং সংসদের মাধ্যমে তা অনুমোদন করা। এতে আন্তর্জাতিক নদীগুলো নিয়ে আমাদের আইনগত ও কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ভারত, নেপাল এবং ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে চীনের মতো অববাহিকাভুক্ত দেশগুলোকেও এতে যুক্ত হয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো হিসেবে এটি গ্রহণ করতে হবে। ভারত হয়তো এতে সই নাও করতে পারে। তবু বাংলাদেশের করা উচিত। এর মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলতে পারব, আমরা আন্তর্জাতিক পানি আইনের প্রচলিত নীতিমালা মেনে চলি এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রত্যাশা করি।

এর ফলে আন্তর্জাতিক সব নদীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দাবি আরও শক্তিশালী হবে। অন্যরা তাৎক্ষণিকভাবে এতে সই না করলেও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হবে। এই কনভেনশনকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

আর পদ্মা ব্যারাজের বিকল্প ভাবতে হলে বিষয়টিকে পুরো অববাহিকাজুড়ে বিবেচনা করতে হবে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সব দেশকে সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার দিকে এগোতে হবে। উজানে যা ঘটে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভাটির অঞ্চলে। এ কারণেই অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।

‘পানি-কূটনীতিকে’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত করতে হবে। নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সংযোগ ও ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য পানি ও পলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে আমাদের অধিকার কোনো দয়া বা অনুরোধ নয়, এগুলো আমাদের ন্যায্য অধিকার।

অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও বাংলাদেশ নদ-নদী বিষয়ে অনেক কিছু করতে পারে। পদ্মা ব্যারাজ প্রস্তাবে মোট প্রায় ৩৮১ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার এবং হিসনা-মাথাভাঙ্গা ব্যবস্থায় ২৪৬ কিলোমিটার। এসব উদ্যোগ গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা উচিত। পাশাপাশি উপকূলীয় নদীগুলোতেও ড্রেজিং করে পানি বহন ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে।

পরিত্যক্ত খাল, পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া চ্যানেল এবং দখল হয়ে যাওয়া জলপথ পুনরুদ্ধার করাও জরুরি। ড্রেজিং থেকে পাওয়া পলিকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি নিচু উপকূলীয় ভূমি উঁচু করতে, ক্ষয়প্রাপ্ত এলাকা পুনরুদ্ধার করতে বা নির্মাণসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পদ্মা ব্যারাজের পেছনে সব পানি আটকে রাখার পরিবর্তে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট শাখা ও উপনদীগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এসব নদীর অনেকগুলো পলিতে ভরাট হয়ে গেছে, আর বহু পোল্ডারের কারণে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিছু পোল্ডারকে আট মাস মেয়াদি বাঁধে রূপান্তর করা যেতে পারে, যাতে বছরের একটি অংশে পানি ও পলি প্রবেশ করতে পারে, আবার মৌসুমি সুরক্ষাও বজায় থাকে।

একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে, যেন সেগুলোর প্রবাহ, পানি বহনক্ষমতা ও সংরক্ষণক্ষমতা সবই উন্নত হয়। যদি আমরা খাল, নদী ও প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার করি, সঠিকভাবে ড্রেজিং করি, পলিকে উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করি এবং পুরো ভূদৃশ্যজুড়ে প্রাকৃতিক পানির ধারণক্ষমতা বাড়াই তাহলে অন্তর্নিহিত অনেক সমস্যারই অনেক বেশি টেকসই সমাধান সম্ভব হবে।

নেপালে অববাহিকাভিত্তিক পানি সংরক্ষণের সম্ভাবনাও নতুন করে বিবেচনা করা উচিত। কোশি অববাহিকায় যৌথ জলাধার প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ছাড়ার জন্য পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে, যা ভারত ও নেপালে সেচে সহায়তা করবে এবং গঙ্গায় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহও বাড়াবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রস্তাবে প্রায় ৭৬ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাও বলা হয়েছে। আমি এটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না। ফারাক্কা অনেক উজানে, যেখানে নদীর ঢাল অনেক বেশি, তবুও সেখানে উল্লেখযোগ্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তাহলে কি আমরা মাত্র ৭৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য পুরো গঙ্গা-পদ্মা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলব? আমার কাছে তা যৌক্তিক মনে হয় না।

বিদ্যুতেরএই  ঘাটতি আরও নিরাপদভাবে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে এবং বায়ুশক্তি ব্যবহার করে পূরণ করা সম্ভব, বিশেষ করে চরাঞ্চলে। নদীগুলোকে বিচ্ছিন্ন বা প্রকল্পভিত্তিকভাবে দেখা উচিত নয়। এগুলোকে সমন্বিত উন্নয়ন ও অববাহিকাভিত্তিক পানি শাসনের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের উচিত অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, দখল ও দূষণ রোধ করা, নৌ-চলাচল পুনরুদ্ধার করা এবং প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ানো। যদি আমরা বিচ্ছিন্ন মেগা-প্রকল্পের বদলে এসব বিষয় সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করি, তাহলে অনেক সমস্যারই আরও কার্যকর সমাধান সম্ভব হবে।