প্রথা ভেঙে অপ্রতিরোধ্য স্বপ্নার ছুটে চলা

আনিসুর রহমান
আনিসুর রহমান
খালিদ হোসেন অভি

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর আগেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পাওয়ার নজির বাংলাদেশে খুব একটা নেই। তবে স্বপ্না আক্তার ঝিলির গল্পটা একটু ভিন্ন। চলতি বছরের শুরুতে থাইল্যান্ডে সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী আসরে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল এই কিশোরী গোলরক্ষকের। কিন্তু ময়মনসিংহের এই ফুটবলার গ্রামীণ ফুটবল মাঠগুলোতে আগে থেকেই এক পরিচিত নাম। বিশেষ করে ‘খ্যাপ’ ফুটবলে তার উপস্থিতিতে উপচে পড়া ভিড় জমে। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গোল আটকে দেওয়া আর মাঠের প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের ভিডিও নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তার নামই হয়ে যায় ‘ভাইরাল স্বপ্না’।

স্বপ্নার বেড়ে ওঠা সাত ভাই-বোনের বড় সংসারে, যেখানে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া তার ফুটবল যাত্রায় বড় মোড় আসে ২০২২ সালে, যখন পর্তুগালে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত তিন নারী ফুটবলারের একজন হন তিনি। গ্রামীণ বাংলাদেশের রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন এই কলেজপড়ুয়া অ্যাথলেট।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে খ্যাতি আর দায়িত্বের মিশেলে এই ভিন্ন পথচলা নিয়ে স্বপ্না দ্য ডেইলি স্টারের আনিসুর রহমান ও খালিদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছেন। একান্ত সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো:

দ্য ডেইলি স্টার: সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে গোলরক্ষক হিসেবে আপনাকে কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল?

স্বপ্না আক্তার ঝিলি: (মাতসুশিমা) সুমাইয়া আপু আমার নম্বর বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে শেষমেশ আমাকে বের করেন। আমি তখন উত্তরবঙ্গে একটি টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিলাম। আপু আমাকে জানান যে, বাংলাদেশে নতুন একটি দল (ফুটসাল) হচ্ছে এবং আমি সেখানে থাকলে ভালো হয়।

স্টার: আপনি শুরুতে এই দলে যোগ দিতে চাননি কেন?

স্বপ্না: আমি আসলে ফুটসাল খেলাটা বুঝতাম না। তাই ভেবেছিলাম, আমার দ্বারা এটি হবে না। এমনকি ইউটিউবে এই খেলা দেখে আমার মনে হয়েছিল, মাঠ অনেক ছোট এবং আমি হয়তো মানিয়ে নিতে পারব না। তবে সুমাইয়া আপুর অনেক জোরাজুরি ও আশ্বাসের পর আমি ক্যাম্পে যোগ দিতে রাজি হই।

স্টার: ক্যাম্পে গোলরক্ষকদের বাছাই প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল?

স্বপ্না: ক্যাম্পে শুরুতে আমরা সাত থেকে আটজন গোলরক্ষক ছিলাম । সেখান থেকে ধাপে ধাপে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সংখ্যা কমানো হয়। প্রথমে দুজন, এরপর আরও কয়েকজনকে বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত থাইল্যান্ড যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত গোলরক্ষকদের নির্বাচন করা হয়। আমি নিজের জায়গা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম।

স্টার: ট্রেনিংয়ের সময় আপনাদের ওপর কেমন মানসিক ও শারীরিক চাপ ছিল?

স্বপ্না: পুরো এক মাস আমাদের গোলরক্ষকদের ওপর দিয়ে অনেক চাপ গেছে। আমাদের ঠিকমতো খাওয়া বা ঘুম ছিল না। শুরুতে আমাকে কেউ চিনত না, কিন্তু এক মাস পর যখন মিডিয়ায় আমাদের কথা আসে, তখন সবাই আমাকে চিনতে শুরু করে।

স্টার: সাবিনা খাতুন বা কৃষ্ণা রানী সরকারের মতো বড় তারকাদের সাথে ক্যাম্পে মানিয়ে নেওয়া আপনার জন্য কতটা সহজ ছিল?

স্বপ্না: তারা অনেক আন্তরিক এবং সবার সাথে খুব দ্রুত মিশে যান। বড় খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো অহংকার নেই এবং তারা ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাইকে অনেক আদর করেন। এই সহজ ব্যবহারের কারণে আমি খুব দ্রুত তাদের সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম।

স্টার: সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর সাবিনা বা কৃষ্ণার মতো বড় তারকাদের পাশাপাশি গোলরক্ষক হিসেবে আপনাকেও অনেক কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অনুভূতিটা কেমন?

স্বপ্না: আমি যেহেতু অনেক জুনিয়র খেলোয়াড়, তাই সিনিয়র আপুদের সাথে মানিয়ে নিতে পারা এবং তাদের সাথে খেলতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে আপুদের অনেক অবদান আছে এবং তারা আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছেন। আমি কোনো ভুল করলে তারা সেটি ধরতেন না, বরং শিখিয়ে দিতেন এবং পুনরায় চেষ্টা করতে উৎসাহিত করতেন।

স্টার: আপনি গোলরক্ষক হলেন কীভাবে এবং ফুটবলে আপনার হাতেখড়ি কীভাবে হলো?

স্বপ্না: আমি যখন নান্দাইল পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন আমাদের একটি সিনিয়র দল ছিল। সেই দলের নিয়মিত গোলরক্ষক হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিলে দলটি দুর্বল হয়ে পড়ে। আমি তখন বল নিয়ে ছোটাছুটি করতাম। তা দেখে আমার শিক্ষক আমাকে খেলার সুযোগ দেন এবং আমি আনন্দের সাথে রাজি হই। বর্তমানে আমাদের সেই দলের অনেকেই জাতীয় দলে বা বিভিন্ন জায়গায় খেলছে।

স্টার: আপনার পরিবার থেকে ফুটবল খেলায় কোনো বাধা ছিল কি?

স্বপ্না: এলাকার কিছু লোক আমার ভাইকে ফোন করে আজেবাজে কথা বলত, যার ফলে ভাইয়া শুরুতে কিছুটা বাধা দিতেন । তবে আমার বাবা, মা ও অন্য বড় ভাই-বোনরা আমাকে সবসময় অনেক সাপোর্ট করতেন। তাই শেষ পর্যন্ত আমি খেলা চালিয়ে যেতে পেরেছি।

স্টার: আপনার ফুটবল যাত্রায় পুরুষ কোচ বা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

স্বপ্না: অনেকে অনেকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তবে সবাই সমান নয়। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বাধা না দিলেও আড়ালে আমার সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা বলে বা গুজব ছড়িয়ে আমার অগ্রযাত্রায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি আমি যখন জাতীয় ফুটবল দলে ছিলাম, তখন আমার নামে মিথ্যা কথা বলে আমাকে দল থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রও করা হয়েছিল। তখন আমি দমে না গিয়ে উল্টো জেদ ধরেছিলাম যে, পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই এর জবাব দেব। আমি তখন আরও কঠোর অনুশীলন শুরু করি এবং শেষ পর্যন্ত সফলভাবে সিঙ্গাপুর সফরের স্কোয়াডে নিজের জায়গা করে নিতে সক্ষম হই।

স্টার: জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলুন।

স্বপ্না: আমি ২০২৩ সালে কোচ সাইফুল বারী টিটুর অধীনে সিনিয়র দলে ছিলাম এবং ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ দলেও খেলেছি। আমি সিঙ্গাপুরে মূল দলের সঙ্গে ছিলাম এবং নেপালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সেই ২৩ জনের স্কোয়াডেও আমি ছিলাম।

স্টার: ফুটবলার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার বিপুল জনপ্রিয়তার রহস্য কী?

স্বপ্না: মানুষের ভালোবাসা পাওয়া আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। আমার ফেসবুক আইডিতে ৬ লাখ ১২ হাজার এবং পেজে ৬ লাখ ২৫ হাজার ফলোয়ার আছে। এছাড়া, আমার একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে, যেখানে প্রায় এক লাখ সাবস্ক্রাইবার হতে চলেছে। কোথাও খেলতে গেলে দর্শকরা যখন ছবি তুলতে আসে, তখন ভালো লাগে। যদিও ক্লান্ত থাকলে মাঝে মাঝে সেলফি তোলা কষ্টকর হয়, তবুও দর্শকদের মন রাখার জন্য আমি তা করি।

স্টার: ‘খ্যাপ’ খেলে প্রতি ম্যাচে আপনার পারিশ্রমিক কত এবং পরিবারকে কীভাবে সাহায্য করেন?

স্বপ্না: আমি প্রতি ম্যাচে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো পারিশ্রমিক নিই। আমার বড় ভাইয়েরাই মূলত সংসার চালায়। তবে আমার যখন সামর্থ্য হয় বা পরিবারের দরকার পড়ে, তখন আমি আর্থিক সহযোগিতা করি। আগে আমার কাছে প্রতিদিন ৫-৬টি করে ফোনকল আসত, কিন্তু প্রতিদিন খেলা সম্ভব হয় না। আমি সাধারণত কয়েকদিন বিরতি দিয়ে খেলি। যাতায়াতের সুবিধার জন্য আমি চেষ্টা করি কাছাকাছি এলাকার ম্যাচগুলো একসঙ্গে খেলার। তবে এখন আর আগের মতো স্থানীয় ম্যাচ বা ‘খ্যাপ’ খেলার দিকে আমার তেমন ঝোঁক নেই।

স্টার: আপনি এখন পর্যন্ত কতগুলো জেলায় খেলতে গিয়েছেন এবং কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন?

স্বপ্না: আমি অনেকগুলো জেলায় খেলতে গিয়েছি, যার সঠিক হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি। তবে কুষ্টিয়ায় খেলতে গিয়ে একবার বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেখানে পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সবাই মিলে আমাকে দ্রুত একটি নিরাপদ রুমের ভেতর নিয়ে গিয়েছিল। সমস্যাটি এমন ছিল না যে, তারা মেয়েদের ফুটবল খেলতে দিতে চায়নি, বরং সেখানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত দর্শক হয়েছিল। মাঠ ছোট হয়ে আসছিল এবং দর্শকরা একদম কাছে চলে আসছিল। সেখানে কিছু বিশৃঙ্খলাকারী ছেলেও ছিল। সেই ম্যাচে তাই মাত্র ৫ মিনিট খেলা হয়েছিল এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে আমি আর মাঠে নামিনি।

স্টার: বিভিন্ন জায়গায় খেলতে গেলে আপনি নিজের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করেন?

স্বপ্না: সাধারণত অন্য নারী খেলোয়াড়রা আমাকে মাঝখানে ঘিরে রাখে এবং আয়োজক কমিটির লোকজন পাশে থাকে। এছাড়া, পুলিশ ও গ্রাম পুলিশও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। কোথাও খেলতে যাওয়ার আগে আমি আয়োজকদের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেওয়ার শর্ত দেই।

স্টার: অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলে আপনি কী করেন?

স্বপ্না: যখন কোনো অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে, আমি আগে ভালোভাবে তদন্ত করি যে, তারা কারা এবং কার কাছ থেকে আমার নম্বর পেয়েছে। আমি আগে নিশ্চিত হই যে, আসলেই সেখানে খেলা হবে কিনা।

স্টার: আপনাকে প্রায়ই সাজগোজ করে খেলতে দেখা যায়।

স্বপ্না: সাজগোজ করার অভ্যাসটি আমার ছোটবেলা থেকেই এবং আমি সাজতে পছন্দ করি। তবে ফুটসাল খেলার পর থেকে আমার মনে হয়েছে, এখন সাধারণভাবে থাকাই বেশি ভালো। তাই আগের মতো অত সাজগোজ আর করা হয় না।

স্টার: সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে ও পরের জীবনের মধ্যে পার্থক্য আপনি কীভাবে দেখেন?

স্বপ্না: চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগের জীবন আর পরের জীবনের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। আগে নিজেকে কিছুটা বেকার বা লক্ষ্যহীন মনে হতো। তখন অনেক স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতাম। কিন্তু এখন জাতীয় ফুটসাল দলের খেলোয়াড় হিসেবে কোনো কাজ করার আগে আমাকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এখন আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা অনুভব করি।

স্টার: আপনার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী? আপনি কি ফুটসালেই থাকতে চান নাকি নিয়মিত ফুটবল দলেও খেলতে চান?

স্বপ্না: জাতীয় ফুটবল দলে খেলার স্বপ্ন সব খেলোয়াড়েরই থাকে, আমারও আছে। আমি যে জায়গাতেই খেলি না কেন, সবসময় চেষ্টা করি নিজের সেরাটা দিয়ে ভালো ফলাফল আনার। ফুটসাল হোক বা ফুটবল— যেখানে সুযোগ পাব, সেখানেই দেশের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।

স্টার: যারা নতুন করে ফুটবলে আসতে চায় বা যারা এখন খেলছে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

স্বপ্না: একজন ভালো ফুটবলার হতে গেলে, সবার আগে পরিবারের সমর্থন প্রয়োজন। সেটা ছাড়া এই পথে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং এটি খেলোয়াড়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আর যাদের পরিবার সহযোগিতা করে, তাদের উচিত হবে কঠোর পরিশ্রম করা। কারণ কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।