আবারও পাকিস্তানের বিপক্ষে একা লিটনের লড়াই
রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের কথা মনে আছে?
২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশ যখন ২৬ রানে হারিয়েছিল ৬ উইকেট, তখনও একটি মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন। একা। ব্যাট হাতে। করেছিলেন ১৩৮। সেদিনের সেই মানুষটিই শনিবার সিলেটে আবার দাঁড়ালেন। একই ভঙ্গিতে, একই জেদে, একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।
লিটন দাস যেন পাকিস্তানের বিপদে জ্বলে ওঠেন।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছে ২৭৮ রানে। কিন্তু এই ২৭৮-এর ভেতরে একটা ছোট্ট হিসাব লুকিয়ে আছে যা না বললেই নয়, লিটন বাদ দিলে বাকি দশ ব্যাটারের মোট রান ১৫২। যেখানে কেউ ছুঁতে পারেননি ৩০। সেই দলের হয়ে লিটন একাই করেছেন ১২৬।
দিন শেষে লিটনের সেই লড়াইয়ের জবাব দিতে নেমে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ৬ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে তুলেছে ২১ রান। স্বাগতিকদের চেয়ে এখনও ২৫৭ রান পিছিয়ে তারা। দ্বিতীয় দিনের সকালটা তাই বাংলাদেশের বোলারদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দিনের শুরুটা ছিল পুরোই বিপরীত রঙের। মেঘলা আকাশ, উইকেটে ঘাসের আস্তরণ, টস হেরে ব্যাট। মোহাম্মদ আব্বাস আর খুররম শাহজাদ কন্ডিশন বুঝে বল করছিলেন যেন শিকারি বনে ঢুকেছেন। দ্বিতীয় বলেই স্লিপে ক্যাচ দিলেন মাহমুদুল হাসান জয়। তানজিদ হাসান তামিম অভিষেকে ঝোড়ো শুরু করলেও আব্বাসের বলে 'নাথিং শট' খেলে থামলেন। মুমিনুল খুররমের অ্যাঙ্গেলে পড়ে বোল্ড।
তিন উইকেট পড়ার পরও শান্ত ও মুশফিক মিলে একটু ভরসার জায়গা বানাচ্ছিলেন। লাঞ্চে ৩ উইকেটে ১০১। কিন্তু ক্রিকেট কখনো কখনো পাষণ্ড। বিরতির পর যেন বাংলাদেশকে একটু সুখ দিয়েই সেটা কেড়ে নিল। মাত্র ১৩ ওভারে ১৫ রান তুলতে গিয়ে আরও তিন উইকেট। শান্ত ব্যাট পাতলেন বেরিয়ে যাওয়া বলে, রিজওয়ানের গ্লাভসে।
মুশফিকুর রহিম একবার জীবন পেয়েছিলেন, সাজিদ খানের বলে কট বিহাইন্ড হলেও মাঠের আম্পায়ার আউট দেননি, পাকিস্তানও রিভিউ নেয়নি। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগলো না। মাত্র ৫ রান পরেই খুররমের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন তিনি। আর মেহেদী হাসান মিরাজ? লেগ স্টাম্পের বাইরের বাউন্সারে পুলের চেষ্টা করতে গিয়ে ফাইন লেগে লোপ্পা ক্যাচ, যেন নিজেই ছুড়ে দিলেন উইকেট।
দুইশোর কথা তখন কল্পনাতেও আনা কঠিন। তখন নামলেন লিটন। প্রথমে পরিস্থিতি পড়লেন। তারপর মানলেন। তারপর বদলালেন।
শুরুতে তাইজুলকে পাশে রেখে সিঙ্গেল খুঁজলেন, রান তুললেন, চাপ সামলালেন। তাইজুল গেলেন ১৬ করে। তাসকিন এলেন, গেলেন ৭ করে। শরিফুল এলেন, আর লিটন যেন ডানা মেলে দিলেন। দুরন্ত কাভার ড্রাইভ। স্পিনারকে স্টেপ আপ করে মাথার উপর দিয়ে। পুল করে গ্যালারিতে।
দুটো জীবনও পেয়েছেন অবশ্য। ৩৩ রানে সাজিদের বলে তীব্র শট বোলারের হাতেই লেগে গিয়েছিল, ধরার উপায় ছিল না। ৫২ রানে খুররমের বলে কট বিহাইন্ডের আবেদন, আম্পায়ার সাড়া দেননি, পাকিস্তান রিভিউও নেয়নি, পরে রিপ্লেতে দেখা গেল নিলে সফলই হতো। কিন্তু জীবন পেলে তা কাজে লাগাতে হয়। লিটন লাগালেন।
সেঞ্চুরি এলো খুররম শাহজাদকে কাভার দিয়ে পাঞ্চ করে, বল সীমানা ছাড়িয়ে যেতেই ব্যাট উঁচিয়ে ধরলেন। গ্যালারি মাতল করতালিতে। আর ঠিক পরের বলেই, উড়িয়ে দিলেন ফাইন লেগ দিয়ে। যেন সেঞ্চুরি করেই থামার মানুষ নন তিনি।
শেষ পর্যন্ত তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুলকে নিয়ে তিনটি জুটিতে যোগ করলেন ১৬২ রান। দুইশোর নিচে গুটিয়ে যাওয়ার দল পেরিয়ে গেল আড়াইশো। থামলেন ১৫৯ বলে ১২৬ রানে, যেখানে ১৬টি চার, ২টি ছক্কা। হাসান আলীর বলে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে বিদায়। সেই একই ওভারে নাহিদ রানাও ফিরলেন। ইনিংস শেষ।
লিটন মাঠ ছাড়লেন, বাংলাদেশের ব্যাটিংও।
এরপর বাংলাদেশের বোলাররা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৬ ওভার বল করার সুযোগ পেলেন, কিন্তু সাফল্য আসেনি। বিনা উইকেটে ২১ রান তুলে দিনটা নিজেদের মতো করেই শেষ করে পাকিস্তান।