জামায়াতসহ ১১ দল: আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, অনাস্থা, অবিশ্বাস প্রকট

মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
রাশিদুল হাসান
রাশিদুল হাসান

জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি), জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সমঝোতার আলোচনায় থাকা ১১ দলে আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপোড়েন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মধ্যে অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়ের আগেই চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

গতকাল বুধবার এই অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়, যখন হঠাৎ করেই সমঝোতায় থাকা দলগুলো পূর্বনির্ধারিত একটি সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করে। ওই সংবাদ সম্মেলনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলোর চূড়ান্ত আসন ভাগাভাগির ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা জানান, সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণার বিষয়টি তারা গণমাধ্যমের মাধ্যমেই জানতে পারেন। পরে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে কর্মসূচিটি স্থগিত করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ টানা দুটি বৈঠক করে। একটি মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত রামপুরার একটি মাদ্রাসায় এবং অপরটি গতকাল বুধবার পুরান পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। উভয় বৈঠকেই সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।

বৈঠকগুলোতে দলটির শীর্ষ নেতারা জামায়াতের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, জোটের শরিকদের না জানিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে জামায়াত পারস্পরিক আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুস আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আসন ভাগাভাগি নিয়ে আদৌ কতটা অগ্রগতি সম্ভব—সে প্রশ্নই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত কার্যত 'একলা চলার' নীতি অনুসরণ করছে।

সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়ে ইউনুস আহমেদ বলেন, আমাদের জন্য এটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। গণমাধ্যমে খবর দেখে বিষয়টি জানতে হয়েছে।

কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বৈঠক শেষে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জোটে যে সংকট রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করি। অন্য কোনো দল যা চাপিয়ে দেবে, তা কেন আমাদের মেনে নিতে হবে?

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতি অবিচার, অবহেলা বা অসম্মান করা হলে তা হালকাভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। সবারই আত্মসম্মান আছে। পারস্পরিক সম্মানের পরিবেশ থাকলে আসন বেশি-কম হওয়ার বিষয়টি বড় সমস্যা হতো না।

গাজী আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, কিছু আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা এমনভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যেন তারাই জোটের একমাত্র প্রার্থী। এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হলে একসঙ্গে এগোনো কঠিন হযে পড়ে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিদ্যমান জোট থেকে বেরিয়ে চারটি সমমনা ইসলামি দলের সঙ্গে নতুন কোনো নির্বাচনী সমঝোতায় যেতে পারে। তার ভাষ্য, ২০ জানুয়ারির আগে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।

তবে তিনি জানান, এককভাবে নির্বাচন করার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনার অগ্রগতির ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, জোট ছাড়ার বিষয়ে দলটির আমির এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

এ প্রসঙ্গে ইউনুস আহমেদ বলেন, জামায়াত আমাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করেনি। এ অবস্থায় এক-দুদিনের মধ্যে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জোটে থাকা না-থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা জানান, জামায়াত নাকি আগেই জানানো ছাড়াই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছে। এ নিয়ে জোটে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

এ ছাড়া জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে বক্তব্য দেন বলেও অভিযোগ ওঠে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের দাবি, এ বিষয়েও তাদের আগে জানানো হয়নি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামি দলগুলোকে একত্রিত করে প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার উদ্যোগ নেয় তারাই।

পরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এতে যুক্ত হয়। এরপর ধাপে ধাপে জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কয়েকটি দল আলোচনায় আসে।

শুরুর দিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটের আওতায় শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দাবি জানালেও পরে তা কমিয়ে পঞ্চাশের বেশি আসনে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে জামায়াত ৪০টি আসনের প্রস্তাব দেয়, যা আইএবির অনেক নেতা মেনে নিতে রাজি নন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসন দিতে চায়। সমঝোতা না হলে কিছু আসন 'উন্মুক্ত' রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।

খেলাফত মজলিসের নেতারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দলটির মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বলেন, আমি বিশ্বাস করি, ঐক্য থাকবে। তবে কিছু আসন উন্মুক্ত রাখতে হতে পারে—এ কথা আগেও বলেছি।

একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াত নিজে প্রায় ১৯০ থেকে ২০০টি আসন রাখতে চায় এবং বাকি আসনগুলো নিয়ে শরিকদের সঙ্গে দরকষাকষি করছে।

এদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোট সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটে বিভক্তি বা অবিশ্বাস নিয়ে যারা কথা বলছেন—এটি তাদের নিজস্ব মতামত।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, কারও প্রত্যাশা বেশি হলে সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয় না। সব দিক বিবেচনায় নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।

স্থগিত সংবাদ সম্মেলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি 'শিগগিরই' আয়োজন করা হবে এবং আসন ভাগাভাগির বিষয়টিও 'খুব দ্রুত' চূড়ান্ত হবে।