যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বিষাদমাখা ঈদ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

নতুন জামা, কোরবানির পশু কিংবা ঈদের পিঠা-পুলি—মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার এসব চিরচেনা অনুষঙ্গই যেন হারিয়ে গেছে গাজায়। যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চরম সংকটের কারণে এবারের ঈদ সেখানে আনন্দের বদলে নিয়ে এসেছে একরাশ হতাশা ও বেদনা।

গাজার বাসিন্দা নাদিয়া আবু শামালা এএফপিকে বলেন, ‘আমি শুধু বাজারে ঘুরে দেখি, কিছু কেনার সামর্থ্য নেই। দাম জিজ্ঞেস করলেই মন ভেঙে যায়।’

উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গত দুই বছর ধরে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে আশ্রয় নেওয়া ৪০ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাব, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্তানদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করতে না পারার কারণে এবার গাজায় ঈদের কোনো আনন্দ নেই।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় এখনো ইসরায়েলি বিমান হামলা চলছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, যুদ্ধে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অধিকাংশ মানুষ এখন মৌলিক চাহিদা পূরণে ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের পাশে স্থাপিত কাপড়ের দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ছবি: এএফপি

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার দাবি, গাজার সব প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল। সীমিত সংখ্যক ত্রাণ ও পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় বাজারে পণ্যের সংকট ও উচ্চমূল্য কমছে না।

৫৯ বছর বয়সী আবু আবদুল্লাহ আল-মোসাদার বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি আসলে বড় এক মিথ্যার নামান্তর। তবু আমরা শিশুদের কিছু আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

তিনি জানান, ভাইয়ের সঙ্গে মিলে প্রায় ১৩ হাজার শেকেল (প্রায় ৪ হাজার ৫৭০ ডলার) খরচ করে একটি কোরবানির পশু কিনেছেন। তবে এত অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য খুব কম মানুষেরই আছে।

মধ্য গাজার এক সময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মোসাদার বলেন, ‘দাম অনেক বেশি জানি, তবুও এ বছর কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করার আশা করছি।’

খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের সামনে মাটিতে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ছবি: এএফপি

কোরবানির পশুর তীব্র সংকট

ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো পশু কোরবানি। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে তার আনুগত্যের পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ একটি পশু কোরবানির ব্যবস্থা করে দেন।

তবে ছোট্ট উপত্যকা গাজায় এখন বাইরে থেকে কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করতে পারছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যে সংখ্যক ভেড়া ছিল, বর্তমানে তার মাত্র এক-চতুর্থাংশ অবশিষ্ট রয়েছে। প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য বর্তমানে ভেড়ার সংখ্যা মাত্র ১৫ হাজার।

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বলেন, ‘সরবরাহ সংকট, পশুপালনের ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বহু খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এবার কোরবানির পশুর দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।’

তিনি জানান, যুদ্ধের আগে যে ভেড়া বা ছাগলের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার শেকেল, এখন সেটির দাম দাঁড়িয়েছে ১১ থেকে ১৫ হাজার শেকেল।

গাজা সিটির বাসিন্দা আহমেদ আবু সালেম বলেন, ‘জীবনে এমন দাম কখনও শুনিনি। আগে আমরা প্রতি বছর কোরবানি দিতাম, এখন সন্তানদের জন্য এক কেজি মাংস কেনাও সম্ভব নয়।’

খান ইউনিসে ধ্বংসস্তূপের পাশে গড়ে তোলা নিজের দোকান সাজাচ্ছেন এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তি। ছবি: এএফপি

তাঁবুতেই তৈরি হচ্ছে ঈদের মিষ্টি

গাজায় রান্নার গ্যাসের সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা আবু আহমেদ ওয়াফি বলেন, ‘বাজারে কাক, মামুল ও নানা ধরনের মিষ্টি পাওয়া যাচ্ছে। আগে বাসায় এগুলো বানানোর স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু এখন সবকিছুর দাম বেড়েছে, গ্যাসও নেই।’

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে একটি পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের নিচে বসে মামুল তৈরি করেছে। ইউনিসেফের লোগোযুক্ত পুনর্ব্যবহৃত ত্রিপলের নিচে নারী ও শিশুরা হাতে ময়দা প্রস্তুত করেন, পরে একজন ব্যক্তি মাটির তৈরি চুলায় সেগুলো বেক করেন।

দেইর আল-বালাহর তাঁবু থেকে ক্লান্ত কণ্ঠে নাদিয়া আবু শামালা বলেন, ‘আমরা এখনও তাঁবুতে বাস করছি। আনন্দের কোনো পরিবেশ নেই, আছে শুধু উদ্বেগ, ভয় আর ক্লান্তি। আগের মতো সুখের কোনো অনুভূতি আর নেই।’