এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগাযোগে সংসদ সদস্যের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে—এমন অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের। এই দূরত্ব কমাতে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু তার নির্বাচনী এলাকায় চালু করেছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘জনতার সংযোগ’।
এই উদ্যোগের আওতায় সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার তিনটি ওয়ার্ডে স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ ফোন বুথ। এসব বুথ কিংবা নির্ধারিত ফোন নম্বরে কল করে এলাকার বাসিন্দারা সরাসরি তাদের সমস্যা, অভিযোগ ও পরামর্শ এমপির কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বুথগুলোর মাধ্যমে আসা তথ্য কন্ট্রোল রুমে সংরক্ষণ ও শ্রেণিবিন্যাস করে দ্রুত এমপির কাছে পাঠানো হয়। জরুরি বিষয় হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে অবহিত করা হয়, আর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উদ্যোগটির সমন্বয়ক এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতা মির্জা ফয়সাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ঘারিন্দা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে প্রথম ফোন বুথ উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো এমন কর্মসূচি চালু হয়েছে।
তার দাবি, অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেছেন।
তিনি জানান, সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সদর উপজেলার মানুষ এসব বুথ বা নির্ধারিত নম্বরে ফোন করে তাদের সমস্যা জানাতে পারেন।
ফয়সালের ভাষ্য, ফোন বুথে থাকা লাল বোতাম চাপলে বা নির্ধারিত নম্বরে কল করলে এমপির নিযুক্ত প্রতিনিধিরা ফোন রিসিভ করেন। তারা অভিযোগ বা তথ্য লিপিবদ্ধ করে এমপির কাছে পাঠান। জরুরি বিষয় হলে তা সঙ্গে সঙ্গেই জানানো হয়।
তিনি আরও বলেন, এমপির পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার বাকি ১৫টি ওয়ার্ডেও একই ধরনের ফোন বুথ স্থাপন করা হবে।
অভিযোগের পর সহায়তা পাওয়ার দাবি
ঘারিন্দা ইউনিয়নের পয়লা গ্রামের বাসিন্দা ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত সালমা বেগম জানান, ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ফোন বুথের কথা জানতে পারেন তিনি। সেখান থেকেই ফোন করে সমাজসেবা অফিসে চিকিৎসা সহায়তার আবেদন ছয় মাসেও নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়টি এমপিকে জানানোর অনুরোধ করেন।
সালমার দাবি, দুই দিনের মধ্যে এমপি তার বাড়িতে লোক পাঠান এবং ফোনে কথা বলে একটি আবেদনপত্র দিতে বলেন। পরে টাঙ্গাইলে দেখা করারও পরামর্শ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
একইভাবে, তারটিয়া গ্রামের খন্দকার আখতারুজ্জামান বলেন, ঝিনাই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে তার এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। বিষয়টি ফোনে জানানোর পর এমপির নির্দেশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা এলাকা পরিদর্শন করেন এবং স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন।
বেড়াবুচনা এলাকার সজীব মিয়ার অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে এক বিএনপি কর্মী তার ওপর হামলা করার পর তিনি ফোন বুথের মাধ্যমে বিষয়টি এমপিকে জানান। পরে কন্ট্রোল রুম থেকে তাকে জানানো হয়, অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক সানুকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সিলিমপুর ইউনিয়নের মো. শামীম বলেন, তিনি গ্রামের একটি ভাঙাচোরা সড়কের দুরবস্থার কথা কন্ট্রোল রুমে জানিয়েছেন। তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে বিষয়টি এমপির নজরে আনা হবে।
অন্যদিকে, সুরজ এলাকার এক বাসিন্দা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি এলাকায় মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসার বিষয়ে ফোনে অভিযোগ করেছিলেন।
তার দাবি, দুই দিন পর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে এবং মাদকবিরোধী সতর্কতামূলক সভা করে।
যেভাবে কাজ করে কন্ট্রোল রুম
এই প্রতিবেদক ঢাকার মিরপুরে থাকা কন্ট্রোল রুমে ফোন করলে সানজিদা নামে এক অপারেটর জানান, সদর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এমপির পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, মানুষ ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ফোন করেন। কন্ট্রোল রুমের কর্মীরা প্রতিটি কলের বিষয়বস্তু বিশেষ সফটওয়্যারে শ্রেণিবিন্যাস করে এমপির কাছে পাঠান। এরপর এমপি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। জরুরি হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানানো হয় এবং প্রয়োজনে তিনি নিজেও ফোনকারীর সঙ্গে কথা বলেন।
সানজিদা আরও জানান, অনেকেই পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ জানাতে চান। সে ক্ষেত্রে তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়।
যা বললেন এমপি
প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, নির্বাচনী এলাকার মানুষ শুধু বুথ থেকেই নয়, নিজেদের মোবাইল ফোন থেকেও নির্ধারিত নম্বরে কল করে তার কাছে অভিযোগ বা সমস্যা জানাতে পারেন।
তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সরকারি ও দাপ্তরিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে হয়। ফলে সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় তার পক্ষে এলাকায় থাকা সম্ভব হয় না। তবে বিভিন্ন প্রয়োজনে এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
তার ভাষায়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর অপরাধমুক্ত একটি মডেল টাঙ্গাইল গড়ে তুলতে জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘এখন এই উদ্যোগকে জনগণের কল্যাণে আরও কীভাবে কার্যকর করা যায়, সেটি নিয়েই কাজ করছি’, বলেন তিনি।