কুষ্টিয়ায় বিনামূল্যের চারা এনে বিক্রির অভিযোগ বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

আনিস মণ্ডল
আনিস মণ্ডল

কুষ্টিয়ায় একটি তামাক কোম্পানির দেওয়া প্রায় ৩৫ হাজার বিনামূল্যের গাছের চারা সামাজিক বন বিভাগে আসার পর উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা নির্ধারিত নার্সারি থেকে এসব চারা এনে বিক্রি করেছেন—এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়ারা।

অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিটি এ বছর সরকারি কোনো দপ্তরকে সরাসরি চারা না দিলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বরাদ্দ নিয়ে এসব চারা সংগ্রহ করেন। পরে বিনামূল্যে বিতরণের বদলে কিছু চারা বিক্রি করা হয়েছে।

ছবি: স্টার।

ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই তামাক কোম্পানি এ বছর শুধু বেসরকারি সংস্থা ও সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে গাছের চারা সরবরাহ করছে। অতীতে বন বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও এসব চারার ভাগ পেত। এবার সরকারি পর্যায়ে চারা না দেওয়ায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ৫০ হাজার চারা বরাদ্দ নেওয়া হয়।

এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার চারা কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার কবুরহাট গ্রামের কদমতলার ‘মামা-ভাগ্নে নার্সারি’ থেকে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন নার্সারি মালিক আমির হামজা। তবে বন বিভাগ বলছে, তারা এ পর্যন্ত ওই নার্সারি থেকে মাত্র ১৪ হাজার চারা নিয়েছে।

প্রায় চার বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মামা-ভাগ্নে নার্সারি ওই তামাক কোম্পানির দেশব্যাপী ১৮টি নির্ধারিত নার্সারির একটি। নার্সারি মালিক আমির হামজা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তিনি ১৮ বছর ধরে কোম্পানিটির জন্য গাছের চারা সরবরাহ করছেন।

এবার সরকারি পর্যায়ে কোম্পানিটি চারা দিচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, কোম্পানি এবার সরকারি কোনো লোককে চারা দিচ্ছে না, সরকারি ফাংশনে। অন্য লোকের নামে কাগজপত্র করে ডেলিভারি নিচ্ছে। এবার কুমারখালীর একজনের নামে কাগজ করেছে, আরও কার কার নামে করেছে, নিচ্ছে।

আমির হামজার দাবি, বন বিভাগের লোকজন তার নার্সারি থেকে কমপক্ষে ৩৫ হাজার চারা নিয়েছেন। তিনি বলেন, তারা কমপক্ষে ৩৫ হাজার চারা নিয়েছে। এরপর সেদিন তাদের (বন বিভাগের) এক ভ্যানওয়ালাকে এলাকাবাসী ও কিছু সাংবাদিক আটকায়। তারপর আর চারা নিতে আসেনি। এখনো কিছু চারা তারা পাবে।

নার্সারি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বিআইডিসি বাজারসংলগ্ন বন বিভাগের একটি নার্সারি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখান থেকেই বিনামূল্যে পাওয়া চারার কিছু অংশ বিক্রি করা হয়েছে।

বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিদিনই ভ্যানভরে চারা আসে, চারা বের হয়। এখন কার চারা বিক্রি করছে, তা নিশ্চিত হব কীভাবে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগ নিজস্ব উৎপাদিত চারার সঙ্গে তামাক কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া বিনামূল্যের চারাও বিক্রি করছে। পাশাপাশি রেললাইনের ধার ও খালের পাড়ে কিছু বিনামূল্যের চারা দিয়ে বাগান করা হচ্ছে। বন বিভাগের নিজস্ব নার্সারিতে উৎপাদিত চারার বড় অংশ বিক্রি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে নার্সারি মালিক আমির হামজাও বলেন, বন বিভাগের নিজস্ব উৎপাদিত চারা বিক্রি করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার আবু বকর সিদ্দিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের কাছে অনেকেই গাছের চারা চান। আমরা এত চারা কোথায় পাব? রাজনৈতিক নেতারা চান, এনজিও চায়, অনেক সময় সাংবাদিকরাও গাছের চারা চান। এজন্য আমরা সেখান থেকে ১৪ হাজার চারা এনেছি। কিছু বিতরণ করা হলেও এখনো ১৩ হাজারের মতো চারা আমাদের নার্সারিতে রয়েছে। আমরা নিজস্ব উৎপাদিত চারা বিক্রি করছি।

বন বিভাগ বিনামূল্যে পাওয়া চারা এনে বিক্রি করতে পারে কি না, জানতে চাইলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কত চারা এনেছে, বিক্রি করেছে কি না আমি জানি না। তবে এভাবে সেখান থেকে চারা আনা উচিত হয়নি। আমার যেটুকু আছে, সম্ভব হলে সেখান থেকেই কাউকে কিছু চারা দেওয়া যেত।

একদিকে নার্সারি মালিকের দাবি, বন বিভাগের লোকজন কমপক্ষে ৩৫ হাজার চারা নিয়েছেন। অন্যদিকে বন বিভাগের দাবি, তারা নিয়েছে ১৪ হাজার। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার চারার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমি এখনই তদন্তের জন্য এডিসি জেনারেলকে বলছি। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।