বিয়ের নামে পাচার

প্রতারণা ও মাদকের ফাঁদে ফেলে তরুণীদের পাঠানো হচ্ছে চীনে

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

তিন বছরের সন্তানের খরচ চালাতে প্রায় ছয় মাস আগে গৃহকর্মীর কাজের খোঁজে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯ বছর বয়সী তরুণী রিমা (ছদ্মনাম)।

কিন্তু ঢাকায় আসার পর তাকে জোর করে মাদক সেবনে বাধ্য করা হয়। এরপর আপত্তিকর ভিডিওর ভয় দেখিয়ে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে চীনে পাচার করে দেওয়া হয়। সেখানে ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি।

মানবপাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর সহায়তায় গত ৪ আগস্ট রিমা বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা রিমা আগে একটি জুট মিলে কাজ করতেন। তিনি জানান, দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় তাকে বারিধারায় গৃহকর্মীর কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঢাকায় আনেন। কিন্তু তাকে বারিধারায় না নিয়ে ওই নারী তার উত্তর বাড্ডার ফ্ল্যাটে রাখেন।

রিমার অভিযোগ, কয়েক দিন পর ওই নারী তাকে জোর করে ইয়াবা সেবন করান। একপর্যায়ে তিনি মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ওই নারী তাকে ইয়াবা দেওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন।

রিমা বলেন, ‘তারা আমাকে বলেছিল যে এটা খেলে আমি আমার ছেলের কথা ভুলে যাব এবং কান্নাকাটিও করব না।’ তিনি আরও জানান, পরে তার মাদক সেবনের ভিডিও ব্যবহার করে তাকে এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়।

‘আদর’ নামের এক বাংলাদেশি দালাল তাকে যমুনা ফিউচার পার্কে নিয়ে ওয়াং জেন জেন নামের ওই চীনা নাগরিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর তার পাসপোর্টের ব্যবস্থা করা হয়, তাকে চীনা দূতাবাসে নেওয়া হয় এবং পরে ঢাকার একটি কফি শপে কিছু কাগজপত্রে সই করানো হয়।

এর প্রায় এক মাস পর রিমাকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তি তাকে এবং আরেক বাংলাদেশি নারীকে উড়োজাহাজের বাসে তুলে দেন। তবে তিনি ওই ব্যক্তি বা তার সংস্থার পরিচয় জানাতে পারেননি।

চীনে পৌঁছানোর পর ওই ব্যক্তি তাকে একটি হোটেলে তিন দিন রাখেন এবং পরে তার পরিবারের বাড়িতে নিয়ে যান। শুরুতে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হলেও, রিমার ভিসার মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর পর শুরু হয় নির্যাতন।

রিমা বলেন, ‘এক রাতে তারা আমার হাত-পা বেঁধে অন্ধকারের মধ্যে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।’ তিনি অভিযোগ করেন, অন্য একটি বাড়িতে তাকে প্রায় ২০ দিন আটকে রেখে মারধর এবং যৌন নির্যাতন করা হয়। এক সপ্তাহ পর আবার তাকে আগের জায়গায় ফেরত আনা হয়, এবং পরে আরও ১০ থেকে ১২ দিনের জন্য তাকে সেখানে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার ভান করে তিনি একটি ফোন জোগাড় করতে সক্ষম হন।

রিমার দাবি, তার চীনা স্বামীর ফোনের মেসেজ দেখে তিনি জানতে পারেন যে এই বিয়ের ব্যবস্থা করার জন্য দালাল আদরকে আড়াই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পাচারকারীরা তার পরিবারের কাছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দাবি করেছিল।

এক দিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তি রিসেপশনে গেলে রিমা সুযোগ বুঝে পালিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় ঢোকেন। সেখানে তিনি রেস্টুরেন্টের কর্মীদের তার ক্ষতের ছবি এবং তাকে দেওয়া হুমকির চীনা অনুবাদের স্ক্রিনশট দেখান। রেস্তোরাঁর কর্মীরা জরুরি সেবায় কল করেন।

এরপর চীনা পুলিশ রিমার পাসপোর্ট উদ্ধার করে তাকে বেইজিংয়ের টিকিট কিনে দেয়। সেখানে তিনি একটি স্থানীয় ফোন জোগাড় করলেও চীনা ভাষা না জানায় আশপাশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। পরে তিনি ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যারা তাকে বাংলাদেশে ফিরতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশি নারীদের বিয়ের নামে চীনে পাচার করার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিনি বর্তমানে চীনকেন্দ্রিক চারটি মানব পাচারের মামলা তদন্ত করছেন। এ ছাড়া বিমানবন্দর, গাবতলী, উত্তরা, দক্ষিণখান ও উত্তরখান থানায় এমন আরও কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘চীনা দূতাবাস আমাদের জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চীনের জন্য ১ হাজার ১০০-এর বেশি ফ্যামিলি ভিসা দেওয়া হয়েছে। আমাদের ধারণা, এর মধ্যে অন্তত ৬০০ জন ইতিমধ্যে সেখানে চলে গেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ে এবং ভিসার বৈধ কাগজপত্র থাকলে তাদেরকে চীনে যাওয়া থেকে ঠেকানো কঠিন। অনেক সময় বিদেশ যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভিকটিমরা ঝুঁকিগুলো বুঝতে পারেন না।’

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, এ বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও গত দেড় বছরে এমন ঘটনা অনেক বেশি শোনা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশি নারীদের বিয়ে করতে ইচ্ছুক চীনা নাগরিকদের পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থা যাচাই করতে হবে। এ ছাড়া কতজন নারী চীনে গেছেন, কতজন ফিরেছেন বা সেখানে রয়ে গেছেন, ইমিগ্রেশন ও পুলিশকে এ ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। যারা ফেরেননি, তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

রিমার মা গত ২ আগস্ট খুলনা মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেছেন। এতে বাংলাদেশি দালাল ও চীনা নাগরিক ওয়াং জেনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় প্রতারণা, জোরপূর্বক মাদক সেবন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

খুলনা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে জানান, রিমার ফিরে আসার রেকর্ডসহ অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে তার মোবাইল ফোনটি চীনে থাকায় সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

তিনি জানান, বিমানবন্দরে রিমাকে সহায়তাকারী ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিকে রিমা শনাক্ত করতে পারেননি। গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

গণমাধ্যমের পুরোনো খবর অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ সালের মধ্যে বিদেশে বিয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগে অন্তত ছয়জন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত জুলাইয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় চীনা দূতাবাস বাংলাদেশে অবৈধ ঘটকদের বিষয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করে জানায়, ‘কনে কেনা’র এ ধরনের আয়োজন পাচার, চাঁদাবাজি, হুমকি, শারীরিক ক্ষতি এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, রিমার ফিরে আসার ঘটনা প্রমাণ করে যে এ ধরনের অপরাধ দমনে দ্রুত আন্তসীমান্ত সহযোগিতা, গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সচেতন করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর চু গুয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ফ্যামিলি ভিসার আবেদনকারীদের বিয়ে সত্যি কি না এবং তারা স্বেচ্ছায় ভ্রমণ করছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে বিয়ের সনদের সত্যতা যাচাই এবং সরাসরি সাক্ষাৎকারসহ একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই করা হয়।

তিনি বলেন, দূতাবাস বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তর, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করে। তবে মানব পাচারের বেশির ভাগ অভিযোগ সরকারি সংস্থার বদলে গণমাধ্যম থেকেই পাওয়া যায়।

পাচারের ঘটনায় চীনা কর্তৃপক্ষের সহায়তার বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে চু গুয়াং বলেন, চীন ও বাংলাদেশের ম্যারেজ ব্রোকাররাই সন্দেহজনক এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে বলে তারা মনে করেন। এটিকে তারা লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ পুলিশকে এই দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই, কারণ তারাই এসব অপরাধের পেছনের মূল হোতা।’

তিনি জানান, বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের কোনো আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নেই, তাই সন্দেহভাজনদের তদন্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়।

চু গুয়াং আরও বলেন, ‘মানব পাচার এবং এ-সংক্রান্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর...বাংলাদেশে চীনা নাগরিকদের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি আমাদের শূন্য সহনশীলতা নীতি রয়েছে।’