সরকারি ধান সংগ্রহ

কৃষক জানে না তালিকায় নাম আছে, সুযোগ নিতে মরিয়া নেতারা

আনিস মণ্ডল
আনিস মণ্ডল

দেশে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানের আওতায় কৃষকদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কিনছে সরকার। একজন কৃষক সর্বোচ্চ দুই টন ধান বিক্রি করতে পারবেন। এতে বাজারদরের তুলনায় মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক কৃষক জানেনই না যে তারা সরকারি তালিকায় আছেন। সেই সুযোগে সরকারি গুদামে ধান দিতে তৎপর হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালীরা।

কুষ্টিয়া জেলায় ধান সরবরাহের তালিকায় থাকা এরকম অন্তত ২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার। তাদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, সরকারি ধান সংগ্রহ কর্মসূচি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। অনেকেই জানেনই না, তাদের নাম সরকারি তালিকায় রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাজারে যেখানে ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৯৫০ থেকে ১ হাজার ২২০ টাকায়, সেখানে সরকারি গুদামে বেশি দামে ধান বিক্রির সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ফলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সোনাডাঙা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করতে তার ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। চারা রোপণ, সার ও অন্যান্য উপকরণে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং ধান কাটা থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত আরও ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তার আশপাশের কৃষকেরাও একই ধরনের খরচের তথ্য দিয়েছেন।

ধান সংগ্রহের জন্য কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন যে তালিকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন, সেখান থেকে নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করা হয় বটতৈল গ্রামের কৃষক সেলিম উদ্দিনের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমি ফুড অফিসে কোনো ধান দিচ্ছি না। ১৫ কাঠা জমিতে চাষ করেছি, ধান পেয়েছি মাত্র ১৮ মণ। তালিকায় আমার নাম কে দিয়েছে, তা জানি না।’

একই এলাকার তালিকাভুক্ত কৃষক আল আমিন বলেন, ‘আমার আট বিঘা জমিতে ধান হয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রায় দেড়শ মণ ধান বাজারে বিক্রি করে ফেলেছি। মণপ্রতি ১ হাজার ৫০ টাকা দাম পেয়েছি। ৫০ মণ ধানও যদি সরকারি গুদামে দিতে পারতাম, তাহলে ১৭ থেকে ২১ হাজার টাকা বেশি আয় হতো।’

 ছবি: স্টার

তালিকায় নিজের নাম থাকার বিষয়টি না জানায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

আল আমিনের প্রতিবেশী কোরবান আলীর স্ত্রী জানান, তাদের পরিবার কয়েক বছর আগেই ধান চাষ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ তালিকায় তার স্বামীর নাম এসেছে।

এর আগে জেলার শতাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। অধিকাংশই জানিয়েছেন, সরকার ধান কেনে—এ কথা তারা শুনেছেন; কিন্তু কখন, কীভাবে এবং কোথায় ধান দিতে হয়, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। সরকারি মূল্য কত, একজন কৃষক কত ধান বিক্রি করতে পারবেন—এসব তথ্যও অনেকের অজানা।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যারা ধান দেবেন না কিংবা চাষই করেন না, তাদের নাম তালিকায় এল কীভাবে?

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তালিকায় কিছু ত্রুটি রয়েছে। সেগুলো সংশোধন করা হচ্ছে।’

তবে ধান সংগ্রহ অভিযানের দেড় মাস ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এরইমধ্যে অধিকাংশ কৃষক তাদের ধান বাজারে বিক্রি করে ফেলেছেন।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু হেনা মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এই চেয়ারে বসে থাকলে আপনিও অনেক কিছু করতে পারবেন না।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে রাজনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দেন তিনি।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের সুযোগ নিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।

তালিকা থেকে যোগাযোগ করা কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক তালেব বলেন, ‘এবার ধান দেওয়া নিয়ে বিরাট সমস্যা। প্রতিবছর এ সময়ের মধ্যে ধান কেনা হয়ে যায়, আমরাও দিতে পারি। কিন্তু এবার সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।’

কোন দলের কারা বাধা সৃষ্টি করছেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে রুমী গ্রুপের (কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী) লোকজন ঝামেলা করেছে। পরে বিএনপির আরও দুটি গ্রুপ এবং জামায়াতে ইসলামীর লোকজনও এতে জড়িয়ে যায়। পরে শুনেছি, ফুড অফিসার আর ইউএনওর সঙ্গে তাদের এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে।’

এই কৃষকের দাবি, অতীতে আবেদন বেশি হলে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হতো। কিন্তু এবার রাজনৈতিক নেতারা লটারি হতে দিতে চান না।

‘তারা জোর করেই ধান দিতে চান। অনেক সময় কর্মকর্তাদের বকাবকি করছেন, এমনকি মারতে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কর্মকর্তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন,’ বলেন তিনি।

 ছবি: স্টার

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কুমারখালীর আরেক কৃষক পরিবারের সদস্য ঝরনা বলেন, ‘আমি স্কুলশিক্ষক। ধানের চাষাবাদ ও বিক্রির বিষয়টি আমার স্বামী দেখেন।’ পরে তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ধান দেবো না ভাই। রাজনৈতিক অনেক ঝামেলা আছে।’

কুমারখালী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, ‘তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কৃষি বিভাগ একটি তালিকা দিয়েছে, আবার অনলাইনেও আবেদন নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও ধান দিতে আগ্রহী। সবার সমন্বয়ে একটি তালিকা করা হবে।’

নেতাদের দাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা খুব বেশি কিছু চাইছেন, এমন নয়। তারাও অংশ নিতে চান। একটা পার্সেন্টেজ চাচ্ছেন।’

বিএনপির তিনটি গ্রুপ এবং জামায়াতে ইসলামীর একটি গ্রুপ ধান সরবরাহে অংশ নিতে চাচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, কিছুটা সঠিক।’

তবে অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীতার আমি সম্পূর্ণ বিরোধী। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতেই তালিকা করা উচিত। কৃষকদের তালিকা করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কুষ্টিয়া জেলা শাখার সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দার বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। কেউ যদি এমন কিছু করে থাকেন, তার দায় ব্যক্তির। সংগঠন এর দায় নেবে না।’

সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ‘সরকার ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিক। প্রকৃত কৃষক যেন এই সুবিধা পান, সে বিষয়েও আমরা তৎপর। কোথাও কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ধান কিনছে। অর্থাৎ এখানে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের সহায়তা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা চ্যালেঞ্জের তথ্য পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’