আন্তর্জাতিক নারী দিবস

নারীকে নেতৃত্বে চাইলে রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে

ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচন: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে যাত্রা’ শীর্ষক গোলটেবিল
স্টার অনলাইন রিপোর্ট

বাংলাদেশের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারই ধারাবাহিকতায় সবশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তারা সম্মুখসারিতে ছিলেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই সময়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল, তা বরাবরের মতো এবারও উপেক্ষিতই থেকেছে। সবশেষ নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে অনীহা দেখিয়েছে। জুলাই সনদের আলোচনার সময় অনেক কথা হলেও, শেষ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা খুবই কম ছিল।

রাষ্ট্র-সমাজের এই বৈষম্যের মাঝেও নারীরা মাথা নোয়াবার নয়। তারা দেশ গঠন ও সমাজে পরিবর্তন আনার চেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছেন অক্লান্ত পরিশ্রম, মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই চিত্রই দেখা গেছে। এত বাধা-বিপত্তির মুখেও বেশ কয়েকজন নারী রাজনীতির মাঠে লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাদের সবাই হয়তো নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করে গেছেন দৃষ্টান্ত। তাদের সংগ্রামের পথ ধরেই হয়তো সামনে এগিয়ে যাবেন আরও অনেক নারী।

আজ ৮ মার্চ (রোববার) আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবস ঘিরে গত ৪ মার্চ দ্য ডেইলি স্টারের উদ্যোগে ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচন: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে যাত্রা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজিত হয়।

ডেইলি স্টারের যুগ্ম সম্পাদক আশা মেহরীন আমিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন নারী সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।

শুরুতেই যারা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছেন, তারা কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তাদের প্রাপ্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

রুমিন ফারহানা, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২

ক্যাম্পেইনে যে মূল সমস্যাটা আমি ফেস করেছি, সেটা ‘ডিসক্রিমিনেশন’। আমি হয়তো নিয়ম মেনেই ক্যাম্পেইন করছিলাম। কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ—বিশেষ করে একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি—প্রতিদিন প্রশাসনের চোখের সামনে নিয়ম ভেঙে ক্যাম্পেইন করেছেন। তিনি হেট স্পিচ দিয়েছেন, আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বাজে ভাষায় আক্রমণ করেছেন। অথচ প্রশাসন সব দেখেও দেখেনি, শুনেও শোনেনি। আমরা অভিযোগ করেছি, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি।

প্রশাসনের আচরণ ছিল যেন তারা সেখানে নেই—তারা কিছুই জানে না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, আমি যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী, তাই প্রতিটি আইন একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে আমাকে ক্যাম্পেইন করতে হবে। একেবারে শুরুতেই আমি একটা ডিসক্রিমিনেশনের মধ্যে পড়ে যাই।

এরপর একটা ঘটনায় আমি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করি। সেটা পুরো বাংলাদেশ দেখেছে। ওই প্রতিবাদটা না করলে আমার পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব হতো না। আমার কর্মীদের আমি একটা বার্তা দিতে চেয়েছি—প্রশাসন তোমাদের সঙ্গে যা-ই করুক না কেন, আমি তোমাদের পাশে আছি। প্রশাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি দাঁড়াব। আমি যদি সেটা না করতাম, তাহলে হয়তো আমি আরও কম ভোট পেতাম। ভবিষ্যতেও আমি এটা করব। এতে শহরের সুশীল নাগরিকরা আমাকে কী ভাবল বা না ভাবল—সে বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। কারণ মাঠের রাজনীতি না করলে এই বাস্তবতা বোঝা সম্ভব না। শহরে বসে অনেক কিছু ভাবা যায়, কিন্তু মাঠে না থাকলে বোঝা যায় না রাজনীতি আসলে কী।

দ্বিতীয় বড় বিষয় হচ্ছে ‘অস্বাভাবিক খরচ’। আমাদের নির্বাচনী খরচের একটা সীমা আছে—ধরা যাক ২৫ লাখ বা ৫০ লাখ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কয়েক কোটি টাকার নিচে নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব।

আইনের বাইরে গিয়ে যা হয়েছে, সেটা আমরা চোখের সামনেই দেখেছি। ভোটারদের সরাসরি টাকা দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের বাসায় গিফট পাঠানো হয়েছে—যেমন সাবান, তেল ইত্যাদি। এগুলো হয়তো সরাসরি নগদ টাকার মতো চোখে পড়ে না। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমেও ভোট কেনার চেষ্টা হয়েছে। দিনশেষে এই খরচ কত দাঁড়ায়, সেটা বোঝা কঠিন।

তৃতীয় বিষয় হচ্ছে ‘শেষ ১০ দিনের খরচ’। এই শেষ ১০ দিনে প্রায় এক কোটি টাকার ধাক্কা আসে। এটা কেউ মুখে বলে না, কিন্তু বাস্তবতা। কেউ কেউ প্রতিদিন ২৫–৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছে। কেউ শুরু থেকেই করেছে, কেউ শেষ ২০ দিন করেছে। এই টাকা কারা পাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে—এটা শেষ পর্যন্ত ভোটারের কাছে পৌঁছায় কি না—এই প্রশ্ন করা যায় না। কারণ যাদের হাতে টাকা দেওয়া হয়, তাদের প্রশ্ন করলে তারা মনে করবে আপনি তাদের বিশ্বাস করছেন না এবং তারা পরদিন আপনার জন্য কাজ নাও করতে পারে।

এই জায়গায় একজন নারী প্রার্থী স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ে। এত টাকা সে কোথা থেকে আনবে? তার ওপর কেউ বিনিয়োগ করতে চাইবে কেন? বিনিয়োগ তো তখনই করা হয়, যখন সেখান থেকে মুনাফা তোলা যাবে।

একজন নারী প্রার্থীর ক্ষেত্রে অনেক সময় সে নিজেও নিজের ওপর আস্থা রাখে না, তার পরিবার আস্থা রাখে না, সমাজ আস্থা রাখে না। তাহলে ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী আস্থা রাখবে কেন? ফলে ফান্ডিংয়ের জায়গায় একজন নারী শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে।

আরেকটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘মাঠ পর্যায়ে যাওয়া’। ক্যাম্পেইনে প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হয়। আমার নির্বাচনী এলাকায় এমন গ্রাম আছে যেখানে আমাকে নৌকায় করে যেতে হয়েছে—প্রায় দেড় ঘণ্টার যাত্রা। সেখানে গিয়ে কোনো রাস্তা নেই। একটা অটোরিকশায় উঠতে হয়, কিন্তু সেটা রাস্তা না—মাটি আর ধুলার স্তূপ।

এখন বাংলাদেশের কয়টা পরিবার তাদের মেয়েকে এই পরিস্থিতিতে যেতে দেবে? আমার কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। অতিরিক্ত প্রশ্ন মানেই এনার্জির অপচয়—ব্যাখ্যা দিতে হবে, চিন্তা করতে হবে। এই বাধাগুলো পদে পদে একজন নারীর জন্য সত্যিই পাহাড় জয়ের মতো।

এরপর আসে ‘ভোটারের মনোভাব’। ভোটার একদিনে আপনার ওপর ভরসা রাখবে না। ভোটার সবসময় ন্যায়–অন্যায় বিচার করে ভোট দেয় না। ভোটার ভাবে—কে তাকে রক্ষা করতে পারবে। আপনাকে সেই শক্ত কণ্ঠটা দেখাতে হবে—আমি তোমাকে ভবিষ্যতে সব পরিস্থিতিতে রক্ষা করার চেষ্টা করব।

এই জায়গায় অনেক নারী প্রার্থী নিজেদের তেমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না। অনেক সময় যখন প্রয়োজন হয়, তখন আপনাকে ‘মাস্তানের’ মতো আচরণ করতে হয়। রাজনীতিতে অনেক সময় শক্ত আচরণ দেখাতে হয়। অনেক ভদ্র, শিক্ষিত নারী সেটা করতে পারেন না। তাই আমি তাদের বলব—আপনারা যদি এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে রাজনীতি করবেন না। বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এমনই।

পরিবর্তন কীভাবে হবে? পরিবর্তন কখনো দল বেঁধে একসঙ্গে আসে না। পরিবর্তনের আওয়াজ শুরু হয় একজন বা দুজন মানুষের মাধ্যমে। একজন, দুজন মানুষই পরিবর্তনের সূচনা করেন।

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি—আপনি যদি পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন এবং ভোটারকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে আপনি তার পাশে থাকবেন, তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন—তাহলে ভোটার আপনার ওপর আস্থা রাখবে।

আমার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছে যে আমি তিন থেকে সাড়ে তিন বছর এমপি ছিলাম। এই সময়ে আমি নিয়মিত আমার এলাকায় কাজ করেছি। আমি এক পয়সাও লুট করিনি। মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাসটা ছিল—এই নারী অন্তত এখানে দুর্নীতি করবে না। এই বিশ্বাসটাই আমার জন্য বড় শক্তি ছিল।

তাসলিমা আখতার, এমপি প্রার্থী, ঢাকা–১২, গণসংহতি আন্দোলন

এই নির্বাচনটি ছিল গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে, তাই বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসেও এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিশন বলা যায়। জুলাই সনদ যখন হয়, তখন থেকেই আমরা সরাসরি নারীর অংশগ্রহণটা চাই—এই আলাপটা চলতে থাকে। সেই আলাপ চলতে চলতে দেখা গেল যে ১০০ আসন, তারপর সেটা ৩৩ শতাংশ, এরপর এসে ৭৮ জন বোধহয় শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পেরেছেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্য থেকেই বোঝা যায় রাষ্ট্রের নীতি বা যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা আসলে সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট নয়। ফলে ইনক্লুসিভ যে জায়গাটা তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে একটা ঘাটতি আছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন পর্যন্ত জোটভিত্তিক রাজনীতি—যাদেরকে বড় দল বা মূল স্রোতের দল বলা হয়—সেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করাটাই এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে একটা মাপকাঠি। অর্থাৎ কেউ বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হচ্ছে কি না—এটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটা আমি মনে করি এটা এক ধরনের সংকটও।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে অর্থের প্রশ্ন। যে পরিমাণ অর্থ খরচ করার সুযোগ থাকে—সেটা নারী হোক বা পুরুষ, উভয়ের ক্ষেত্রেই—আমাদের দলের পক্ষে সেই পরিমাণ অর্থ খরচ করা সম্ভব নয়, যেটা খরচ করে ১৮ দিনের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভোটারের কাছে পৌঁছানো যায়।

আরও যদি বলি, সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি—এখনো সেই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নেতৃত্ব বা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে যাদেরকে দেখা হয়, সেখানে এখনো আমরা একজন পুরুষকেই বেশি কল্পনা করি। অর্থাৎ পুরুষই নেতা হবে, বীর হবে—এই ধারণাটার প্রতিফলন আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও দেখেছি। একটি রাজনৈতিক দল তো বলেছেই যে রাষ্ট্রের প্রধান বা নেতৃত্বের শীর্ষস্থানে নারীরা যেতে পারবে না। এই ধরনের ধারণাগুলো সমাজে নারীকে নাগরিক হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেটাকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে এর প্রভাব আমাদের ওপরও পড়েছে।

আমি যখন নির্বাচন করছি, বিভিন্ন ওয়ার্ডে যাচ্ছি, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি—প্রথম দিকে আমার কাছে মনে হয়েছে যে এই দৃষ্টিভঙ্গিটা সেখানে প্রভাব ফেলছে। আমি কী ধরনের পোশাক পরছি, আমি নারী না পুরুষ—সবকিছুই যেন তাদের বিচারের মধ্যে আসছিল।

ঢাকা–১২ আসনের মতো একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা—যেটা অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় এলাকা—সেখানে যদি আমরা গত ১৫ বছরের ইতিহাস দেখি, তাহলে দেখা যাবে কারা দখলদারিত্ব করতে পেরেছে, কারা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, কার পেশিশক্তি বেশি। নারী তো আসলে পেশিশক্তির রাজনীতির অংশ নয়—এই ধরনের হিসাব-নিকাশও এখানে কাজ করেছে।

এখানে রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দিনশেষে রাজনৈতিক দলই আইন প্রণয়ন করে। রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, রাষ্ট্রের নীতি কী হবে—এসবই সংসদে রাজনৈতিক দলগুলো প্রণয়ন করে। ফলে রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গিটাই নারীদের অংশগ্রহণের জন্য এখনো যথেষ্ট উপযোগী হয়ে ওঠেনি।

তবে আমি শুধু বলব না যে দল মানেই পুরুষ, আর পুরুষরাই সবকিছু করছে। আমার কাছে মনে হয়েছে নারীদেরও এই লড়াইটার মধ্যে আরও অনেক বেশি করে আসা দরকার ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমার এই অংশগ্রহণটা ছিল এক ধরনের আন্দোলনের অংশ। আমার কাছে মনে হয়—শেষ পর্যন্ত লড়াইটা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৫ বছরে আমরা এই সুযোগ পাইনি। কোনো এলাকায় গিয়ে, কোনো ওয়ার্ডে গিয়ে, কোনো পাড়ায় গিয়ে—আমার রাজনৈতিক ভাবনা বা আমাদের দলীয় ভাবনা, আমরা সমাজকে নিয়ে কী ভাবি, আমরা কীভাবে বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে চাই, নারীর জন্য, শ্রমিকের জন্য আমাদের কী এজেন্ডা—এসব মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করার সুযোগ আগে তেমনভাবে হয়নি।

কিন্তু এবার যেটা আমার কাছে মনে হয়েছে, ছয়টা ওয়ার্ডের সবগুলো জায়গায়—আমার পক্ষে যতটুকু যাওয়া সম্ভব হয়েছে—আমাদের দলের সহযোগিতায় আমরা যেতে পেরেছি। সেই যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের বক্তব্য বা আমাদের ইশতেহার মানুষের সঙ্গে কিছুটা হলেও বিনিময় করা গেছে। খুব বেশি হয়তো করা যায়নি। কিন্তু যতটুকুই করা গেছে—মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে, শ্রমজীবীদের মধ্যে—একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।

এটা আমার জন্য খুব অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল। অনেকেই নিজে থেকে কাজ করেছেন, যাদের আমি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, এমনকি আমাদের দলের বাইরের শ্রমিক, নারী, তরুণ, শিক্ষার্থী—তারা নিজেরাই নানা জায়গায় সংগঠিত হয়ে কাজ করেছেন। এগুলো আমার কাছে আশার দিক।

এবার যত কম সংখ্যক নারীই অংশগ্রহণ করুক না কেন, আমার মনে হয় এই অংশগ্রহণের ধরনটা আগের ১৫ বছর বা তারও আগে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের থেকে আলাদা। এবার যারা অংশগ্রহণ করেছেন, তারা এক ধরনের রাজনৈতিক কমিটমেন্টের জায়গা থেকে এসেছেন। তাদের মধ্যে একটা আগ্রহ ছিল—এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হয়তো সেই আগ্রহটা তৈরি হয়েছে। তাই অল্পসংখ্যক অংশগ্রহণ হলেও, আমার কাছে মনে হয় ভবিষ্যতে এটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

হাবিবা আখতার চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

আমাদের সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে নারী প্রতিনিধিত্ব প্রায় ৪৩ শতাংশ। আমি এটা বারবার বলি কারণ আমাদের সংগঠন সম্পর্কে দেশে–বিদেশে একটি সাধারণ ভুল ধারণা আছে—যে জামায়াতে ইসলামী হয়তো নারীদের দমন করে রাখে। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এই নির্বাচনের সময় আমরা গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় অনেক কাজ করেছি। আমি মনে করি, এই কাজের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে আমরা নারীদের দমন করি না।

এখন প্রশ্ন আসে—যদি নারী প্রতিনিধিত্ব এত বেশি হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী কেন দেওয়া হয়নি? বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয় সামনে এনেছিল। প্রথমত, ‘সংস্কার’। আমরা বারবার বলেছি—রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অনিয়ম রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করেছি নির্বাচনে সেই পরিবেশ পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি।

আমরা বারবার নির্বাচন কমিশনে গিয়েছি। আমাদের নারী প্রতিনিধিরাও সেখানে গিয়েছেন। নির্বাচনের এক সপ্তাহ বা ১০ দিন আগে আমরা একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করি। কারণ তখন বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছিল।

আমাদের কাছে ১৩–১৫টি ঘটনার ভিডিও ও ডকুমেন্ট আছে, যেখানে দেখা গেছে—নারীরা কেন রাস্তায় নেমে কাজ করছে, কেন নির্বাচনী প্রচারণা করছে—এই কারণ দেখিয়ে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অনেককে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম—আমাদের নারী কর্মীরা যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে আমরা কি ঘরে বসে থাকব? নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমাদের আলোচনায় তারা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা পাইনি।

সবকিছুর পরও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—‘নির্বাচন বয়কট করব না’। কারণ ২০২৪ সালের আন্দোলনের পরে আমরা চেয়েছিলাম দেশকে একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে যেতে। সেই লক্ষ্য থেকেই আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি।

এখন প্রশ্ন আসে—নারী প্রার্থী দেওয়া হলো না কেন? আমাদের সংগঠনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো আছে—‘মজলিসে শুরা (কেন্দ্রীয় পরামর্শ পরিষদ)’ এবং ‘এক্সিকিউটিভ কমিটি’। এই দুই কমিটিতেই নারী প্রতিনিধিত্ব আছে। আমিও সেন্ট্রাল অ্যাডভাইজারি কমিটি এবং এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য।

নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে একটি যৌথ সভা হয়েছিল, যেখানে নারী ও পুরুষ সদস্যরা একসঙ্গে আলোচনা করেন। সেখানে প্রতিটি আসনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল—কোথায় কাকে প্রার্থী দেওয়া হবে। আমার নিজের এলাকা ফরিদপুর–৪ (ভাঙ্গা)। সেখানে আমাকে প্রার্থী করার একটি প্রস্তাবও ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমাদের সংগঠনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ‘মজলিসে শুরার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে’। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকেন, সেটাই চূড়ান্ত হয়। তবে আমাদের সংগঠনের ভেতরে মত প্রকাশের সুযোগ আছে। আমরা আমাদের মতামত বলতে পারি এবং নেতৃত্ব সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনে।

আরেকটি বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই—আমাদের সংগঠনে নারীদের সম্মান দেওয়া হয়। এটা শুধু সংগঠনের ভেতরেই নয়, পারিবারিক পর্যায়েও প্রতিফলিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলি—আমার স্বামী আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা (নায়েবে আমির)। তিনি সংগঠনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমার সঙ্গে আলোচনা করেন। পারিবারিকভাবেও আমরা বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময় করি।

এখন ভবিষ্যতের কথা বলি। জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা নারী প্রার্থী দিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও দেবো। অতীতেও আমাদের অনেক নারী কাউন্সিলর, মেম্বার বা স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন।

আমি মনে করি, মাসল পাওয়ার, অর্থের প্রভাব—এই বিষয়গুলো তখনই কমবে, যখন সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করবে এবং একটি শক্তিশালী নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

তাসনিম জারা, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী, ঢাকা-৯

এবারের নির্বাচনে আমার ক্ষেত্রে খুব পজিটিভ যে জিনিসটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে মানুষের সমর্থন। ক্যাম্পেইনটা অনেকটাই মানুষের অংশগ্রহণে ভরপুর ছিল। আমরা চেষ্টা করেছি যেন যতটা সম্ভব কম ডিসরাপশন করে ইলেকশন ক্যাম্পেইনটা করা যায়।

কিন্তু মানুষের রেসপন্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানুষ তাদের কথাগুলো মন খুলে বলেছে। যেমন: একদিন একটা পার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকজন নারী বলছিলেন, ‘আমাদের জন্য এখানে কোনো টয়লেট নেই।’ অর্থাৎ খুব বেসিক বিষয়গুলো নিয়েই তাদের কথা।

আমরা যখন নির্বাচন করি, তখন শেষ পর্যন্ত কতজন ক্যান্ডিডেট কনটেস্ট করবেন, কতজন নির্বাচিত হবেন—এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আলটিমেটলি সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের এডুকেশন আর রাজনৈতিক কাঠামো। ওই জায়গায় খুব বড় কোনো পরিবর্তন এখনো আসেনি।

আমার মনে হয় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—আমরা সংসদে কতজন নারী আছেন, এই সংখ্যাটা দিয়ে অনেক সময় প্রতিনিধিত্ব মাপি। কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে—নারী সাংসদরা কি সত্যিই ডিসিশন মেকিংয়ে আছেন?

যে জায়গাগুলোতে আসল পাওয়ার থাকে—যেমন পার্টির ডিসিশন মেকিং বডি, পার্টির পাওয়ার লাইন, কোথায় ফাইন্যান্স যাবে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—সেসব জায়গায় নারীরা কতটা আছে? অনেক সময় সংসদে নারী সদস্য থাকলেও সেই সংখ্যাটা কনস্টিটিউয়েন্সি বা ক্ষমতার জায়গায় প্রতিফলিত হয় না। কারণ অনেক সময়ই নমিনেশন পাওয়ার জন্য পার্টি মেশিনারির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে স্ট্রাকচারের ভেতরে নারীদের উপস্থিতির জায়গায় খুব একটা পরিবর্তন এখনো আসেনি।

ঢাকায় অবশ্য মানুষ খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। মানুষ চায় তাদের অংশগ্রহণ যেন শুধু প্রতীকী না হয়ে যায়, বরং সত্যিকারের ক্ষমতার জায়গায়ও তারা প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে নিয়ম লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনের অনেক নিয়ম আছে—যেমন লাউডস্পিকার কতটা ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু অনেক সময় সেটা মানা হয় না, আর তাতেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আরেকটা রুল ছিল—কোনো পেপার পোস্টার করা যাবে না—সেটা অনেক জায়গায় মানা হয়নি। এমনকি আমার বাসার দেয়ালেও অনেক নেতা এসে পোস্টার লাগিয়ে গেছেন।

একজন প্রার্থী যদি বড় দল থেকে আসে, তাহলে তার প্রতীক মানুষ আগেই চেনে। সে যদি নিয়ম ভেঙেও পোস্টার লাগায় বা প্রচার করে, তাতেও তার লাভই হয়—কারণ মানুষ অন্তত জানে সে প্রার্থী। এই জায়গায় সমস্যাটা হচ্ছে—নিয়ম না মানলেও বাস্তবে তেমন কোনো ক্ষতি হয় না।

আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ফাইন্যান্স। ক্যাম্পেইনে কত টাকা খরচ করা যাবে—তার একটা সীমা আছে। আমি যখন ভাবি যে আমার ফান্ডিংয়ের মধ্যে ট্রান্সপারেন্সি বজায় রাখব, তখন দেখি অন্য কারো হয়তো অনেক বেশি টাকা আছে। সে পোলিং সেন্টারের ভেতরে-বাইরে মানুষ বসাতে পারছে, বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছে।

যদি সব প্রার্থীর জন্য একই নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা না যায়, তাহলে এটা শুধু কিছু মানুষের জন্য সুবিধা তৈরি করে। সংখ্যালঘু বা ছোট শক্তির প্রার্থীদের জন্য তখন পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে যায়। সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে—নিয়ম আছে, কিন্তু সেগুলো কতটা মানা হবে? আর সেই জায়গায় যদি সত্যিকারের কমিটমেন্ট না থাকে যে আমরা রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমাব, তাহলে এটা পরিবর্তন করা খুব কঠিন।

একজন ব্যক্তি একা এটা বদলাতে পারবে না। কয়েকজন মিলে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শক্ত অবস্থান নিয়ে—এই পরিবর্তন আনতে হবে। এই জায়গায় যতদিন না পর্যন্ত সত্যিকারের শক্ত অবস্থান, অর্থবহ আলোচনা এবং কমিটমেন্ট আসবে, ততদিন এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে।

নাবিলা তাসনিদ, সংসদ সদস্য প্রার্থী, ঢাকা-২০, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)

ধামরাই (ঢাকা-২০) আসনটি ঢাকার খুব কাছেই হলেও এর পরিবেশ অনেকটাই গ্রামীণ। এখানে আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন ছিলেন একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী, যিনি প্রায় ৪৫ বছরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। অর্থ ও ক্ষমতার যে নেটওয়ার্ক—এক্ষেত্রে সেটি খুব শক্তিশালী ছিল। আমরা জানি নির্বাচনী ব্যয়ের একটি সীমা থাকে। আমরা সেই সীমা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। সাধারণত নারীরা নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি কমপ্লায়েন্ট থাকার চেষ্টা করেন—আমরাও করেছি। কিন্তু বাস্তবে দেখেছি, নিয়ম মানার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান পরিবেশ ছিল না।

উদাহরণ হিসেবে বলি—নিয়ম ছিল একটি আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড থাকবে। আমরা হিসাব করে পুরো ধামরাইয়ে ২০টি বিলবোর্ড লাগিয়েছি। কিন্তু আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে দেখেছি, একটি ইউনিয়নেই ২০টির বেশি বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। আমরা যখন প্রশাসনকে বিষয়টি জানালাম, তারা বলল—‘আপনারা গুনে ছবি তুলে আমাদের দিন।’ বাস্তবে এটা খুবই অযৌক্তিক একটি প্রত্যাশা।

এখানেই প্রশ্ন আসে—এই সিস্টেমের বায়াস কোথা থেকে আসে? এর পেছনে অর্থ এবং পেশিশক্তির প্রভাবই কাজ করে।

আরেকটি বিষয় হলো গ্রামীণ ক্যাম্পেইন ও শহুরে ক্যাম্পেইনের পার্থক্য। গ্রামের এলাকায় একটি সমষ্টিগত মানসিকতা কাজ করে। সেখানে অনেক সময় শুরু থেকেই ধরে নেওয়া হয়—একজন নারীকে তার যোগ্যতা আবার নতুন করে প্রমাণ করতে হবে। অথচ তিনি যখন সব যাচাই–বাছাই পেরিয়ে একজন প্রার্থী হিসেবে মানুষের কাছে যাচ্ছেন, তখন নতুন করে তাকে প্রমাণ করার কথা নয়।

এই মানসিকতা শুধু ভোটারদের মধ্যে নয়, রাজনীতির ভেতরেও আছে। আমি যেহেতু ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলাম, তাই আমাকে ১১টি দলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়েছে। সেখানেও দেখেছি—এই ১১ দলের মধ্যেই দুটি দল তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি, শুধু এই কারণে যে তারা নারী নেতৃত্বের অধীনে নির্বাচন করতে চায় না। তারা প্রকাশ্যেই বলেছিল—‘আমরা কখনোই নারী নেতৃত্বের অধীনে নির্বাচন করব না।’ যদিও তাদের মোট ভোট খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এই ভোটগুলো আমাদের জোটের ভোটব্যাংকে আসার কথা ছিল।

এর থেকেও বড় বিষয় হলো, এই দলগুলো নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। যেহেতু সেখানে জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু ইসলামিক দলও ছিল, তাই অনেক সময় ধর্মীয় যুক্তি ব্যবহার করে নারী নেতৃত্বকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা শুধু ভোটের হিসাব নয়—বরং নারী নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে একটি নেতিবাচক প্রচারণা। কিছু কর্মী সরাসরি বলেছেন যে তারা একজন নারী প্রার্থীর জন্য ভোট চাইতে পারবেন না। আবার কেউ কেউ বলেছেন—নারী প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। যদিও অনেক মানুষ খুব আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছেন।

আরেকটি বড় বিষয় হলো অর্থায়ন। অনেকেই নির্বাচনে অর্থকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। বিনিয়োগ তখনই করা হয়, যখন মুনাফার সম্ভাবনা থাকে। একজন নারী প্রার্থীর ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই আস্থা তৈরি হয় না। ফলে বিনিয়োগও আসে না। অন্যদিকে, বড় দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়—তাদের আগের দুর্নীতির রেকর্ড জানা থাকা সত্ত্বেও তাদের ওপর বিনিয়োগ হয়। কারণ বিনিয়োগকারীরা জানে, ভবিষ্যতেও সেখান থেকে লাভ করা সম্ভব।

অভ্যুত্থানের পর আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম—নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হবে। মানুষ নতুন রাজনৈতিক ধারণাকে গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখেছি—সমাজ এবং সিস্টেম এখনো সেই পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

আরেকটি ভয়ংকর বিষয় আমি ধামরাইয়ে দেখেছি—‘ভোট ট্রেডিং’। এটি সাধারণত নির্বাচনের আগের রাত বা শেষ দুই দিনে ঘটে। এখানে যেটা হয়—পরিবারের নারীদের ভোটকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেউ একজন এসে বলে—‘আমার কাছে ১০টা এনআইডি আছে, ১০টা ভোট দিতে পারব। এর বিনিময়ে কত টাকা দেবেন?’ অনেক সময় ২০–৩০টি এনআইডিও থাকে। এগুলো বেশিরভাগই নারীদের এনআইডি। অথচ যে নারীদের এনআইডি ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা অনেক সময় জানেই না যে তাদের ভোট নিয়ে লেনদেন হচ্ছে।

ধামরাইয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার নারী। কিন্তু অনেক নারী রাজনৈতিকভাবে সচেতন নন। তারা অনেকেই জানেন না তাদের নেতা কে, তাদের দাবিগুলো কী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্বামী, ছেলে বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। ফলে তারা অজান্তেই এই ভোট ট্রেডিংয়ের অংশ হয়ে যান।

তবে ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও আছে। অনেক মানুষ পরিবর্তন চান—বিশেষ করে শিক্ষিত ও তরুণ সমাজ। কিন্তু একইসঙ্গে একটি বড় অংশ এখনো পুরোনো সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চায় এবং পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে পরিবর্তন অবশ্যই হবে। কারণ পরিবর্তন সবসময় ধীরে ধীরে শুরু হয়। আমরা ইতোমধ্যে সেই পরিবর্তনের শুরু করেছি।

মেঘনা আলম, সংসদ সদস্য প্রার্থী, ঢাকা–৮, গণঅধিকার পরিষদ

নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বলার আগে আমি কিছু পর্যবেক্ষণের কথা বলব। কারণ আমি কিছু প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচনে এসেছিলাম। তাত্ত্বিকভাবে আমরা বলি একটি নির্বাচনের দুটি প্রধান উপাদান আছে—‘পাওয়ার এবং পিপলস সাপোর্ট’। পাওয়ার বলতে আমরা যেটাকে বলি—পেশিশক্তি, অর্থ, সাংগঠনিক শক্তি, নিরাপত্তা, অনলাইন ও অফলাইন নেটওয়ার্ক—এসবের সমন্বয়। আর অন্যটি হচ্ছে মানুষের সমর্থন।

আমরা নারী প্রার্থীদের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো—এই সমস্যাগুলোর অনেকটাই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণ হিসেবে বলি, রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, তিনি যদি কোনো শক্তিশালী দল থেকে নির্বাচন করতেন, তাহলে তার সংগ্রামের অন্তত ৫০ শতাংশ কমে যেত।

আমরা অনেক সময় ভাবি—নির্বাচনে মানুষ প্রচারণা করবে, মানুষের কাছে যাবে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেবে। কিন্তু বাস্তবে ভোটব্যাংক অনেক সময় একটি পরিবারতান্ত্রিক বা প্রভাবভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অনেক ভোটারের জীবিকা নির্ভর করে তারা কাকে ভোট দিচ্ছে তার ওপর। আবার দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রার্থী বিভিন্ন উপলক্ষে উপহার দিয়ে আসছেন—যেমন শীতের সময় কম্বল, ঈদের সময় কাপড় বা অন্যান্য জিনিস। মানুষ তখন তাদেরকে ‘দয়ালু’ বা ‘সহায়ক’ ব্যক্তি হিসেবে দেখে। কিন্তু এগুলো যে নৈতিকভাবে ভুল বা অনেক ক্ষেত্রে বেআইনি—তা সাধারণ মানুষের ধারণায় স্পষ্টভাবে আসে না।

আমার এলাকার একটি উদাহরণ দিই। ঢাকা–৮ বাংলাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত এলাকাগুলোর একটি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এখানে কখনো কোনো নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। আমি যখন নির্বাচন করি, তখন গবেষণা করে দেখি—আমার আগে কোনো নারী প্রার্থী এই এলাকায় ১০০ ভোটের বেশি পাননি। অর্থাৎ এখানে একজন নারীকে রাজনৈতিক অভিভাবক বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ কখনো কল্পনাই করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও কখনো একজন নারীকে সামনে এনে বলেনি—‘এই আমাদের দলের নেতা, তিনি আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন।’

এখন যদি বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথা বলি, তাহলে প্রথমেই আসে ‘রিপ্রেশন বা দমননীতি’। আমাদের দেশে অনেক সময় ভুয়া মামলাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ২০০টির বেশি মামলা আছে। সেগুলো সত্য না মিথ্যা আমি জানি না। আমার বিরুদ্ধে আছে একটি মামলা। কিন্তু মিডিয়ায় এমনভাবে আলোচনা হয়েছে যেন আমার অপরাধই বেশি গুরুতর!

এখানে একটি সামাজিক মনস্তত্ত্বও কাজ করে। অনেক সময় মানুষ বলে—‘এই লোকটা একটু বেয়াদব, একটু গুণ্ডা—তাই সে এলাকাকে ঠিক করতে পারবে।’ অর্থাৎ ‘মাস্তানি’ অনেক সময় নেতৃত্বের গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু একজন নারী যদি একইভাবে আচরণ করেন, তাহলে তাকে ভিন্নভাবে বিচার করা হয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অনেক সময় মানসিকভাবে খুব কঠিন। কারণ একজন নারী হিসেবে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাইলে সবসময় এই ধরনের কঠোর আচরণ গ্রহণ করা সহজ নয়।

আমার আরেকটি বড় সমস্যা ছিল নিরাপত্তা। আমি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের একজন ভুক্তভোগী। আমাকে প্রাপ্য নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। থানা-পুলিশের অনেক কর্মকর্তা আন্তরিক ছিলেন। তারা বিভিন্ন সময় সহায়তা করেছেন। কিন্তু একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিটি জায়গায় যাওয়ার জন্য যদি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে একজন নারী হিসেবে সব জায়গায় যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমার কর্মীদেরও অনেক সময় হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছে—তাদের শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে। তখন আমার পক্ষে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আত্মবিশ্বাসও কমে যায়।

এই পরিস্থিতির কারণে নির্বাচনের শেষ দুই দিনে আমি অনেকটা পিছিয়ে যাই। এমনকি আমি কোনো পোলিং এজেন্টও দিইনি। কয়েকজন স্বেচ্ছায় গিয়েছিল, কিন্তু তারা ফিরে এসে বলেছে—দুই প্রধান দলের প্রার্থীরাই বিভিন্ন অনৈতিক উপায়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।

আরেকটি বিষয় হলো ‘লিঙ্গভিত্তিক অপমান’। একজন পুরুষ রাজনীতিবিদকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হলে অনেক সময় তাকে ‘হিরো’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী প্রার্থী যদি নির্বাচনী প্রচারণায় ভিড়ের মধ্যে হয়রানির শিকার হন, তখন অনেকেই উল্টো তাকে দোষারোপ করে। আমি অনেক মন্তব্য দেখেছি—‘এত ভিড়ের মধ্যে কেন যায়?’, ‘লজ্জা লাগে না?’—এ ধরনের মন্তব্যের মধ্যে প্রায়ই যৌন ইঙ্গিতও থাকে। এটি নারী প্রার্থীদের জন্য একটি বিশেষ ধরনের সহিংসতা।

উত্তরণের উপায়

নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো থেকে উত্তরণে করণীয় কী হতে পারে, তা নিয়েও বক্তারা কথা বলেছেন।

রুমিন ফারহানা

জাতীয় পর্যায়ে যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী না হবে, ততদিন পর্যন্ত তারা দলীয় প্রভাবের মধ্যেই কাজ করবে। রাজনীতিতে এসে আমি একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে দেখেছি—প্রশাসন সবসময় নজর রাখে কোন দল ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। যখন তারা বুঝে যায় যে, কোন দল ক্ষমতায় আসতে পারে, তখন ওই দলের প্রার্থীর প্রতি তারা এক ধরনের অন্ধ সমর্থন দেখায়। সুতরাং প্রশাসনকে যদি আমরা সত্যিকারের স্বাধীন করতে না পারি, তাহলে এর সুফল কেউই পাবে না।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। নিরাপত্তার হুমকি একটি বড় সমস্যা। শুধু প্রার্থী নয়, প্রার্থীর কর্মীরাও হুমকির মুখে থাকে। সুতরাং নির্বাচন কমিশন হোক বা প্রশাসন—যতদিন পর্যন্ত এগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা না যাবে, ততদিন পাঁচ বছর জনগণ ভুগবে, আর নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা ভুগবে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো ‘অনলাইন হয়রানি’। নারী হিসেবে অনলাইন হ্যারাসমেন্ট খুবই ভয়াবহ। এখানে রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব আছে। আমাদের দেশে ‘এনটিএমসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। অনলাইন হয়রানি বা সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজ করা দরকার।

আরেকটি কথা না বললেই নয়। আমাদের দেশে যারা ফেমিনিজম বা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন, তাদের অনেকের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন আছে। অনেক সময় মনে হয়—শাহবাগে গিয়ে দুটো স্লোগান দিলেই বা কিছু প্রতীকী কাজ করলেই যেন ফেমিনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কিন্তু আমার কাছে প্রকৃত ফেমিনিস্টের উদাহরণ সেই নারী গার্মেন্টস শ্রমিক, যিনি সকাল সাতটায় কাজে যান, সন্ধ্যায় ফিরে বাজার করেন, রান্না করেন এবং পরিবার চালান।

এই কথাটা বলছি কারণ—আমাদের ওপর নানা ধরনের আক্রমণ এসেছে। কিন্তু আমি খুব কমই দেখেছি কোনো নারী সংগঠন আমাদের পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলেছে। কখনো কোনো ছোটখাটো ঘটনার সময় কিছু প্রতীকী প্রতিবাদ হয়, কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামে আমরা তাদের খুব একটা পাশে পাই না।

তাসলিমা আখতার

আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহিতার অভাব আছে। রাষ্ট্রের যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেই দৃষ্টিভঙ্গিই অনেক সময় নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে তার ভূমিকা পালন করতে দেয় না। আমার কাছে মনে হয়, আমরা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে বাস করি। কিন্তু দায়টা শুধু পুরুষের নয়, পুরুষ এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। তাই এই লড়াইয়ে পুরুষদেরও শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গী হওয়া প্রয়োজন। তবে একইসঙ্গে আমাদের নিজের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, এখানে উদাহরণ হিসেবে দুজন আছেন—রুমিন ফারহানা ও তাসনিম জারা। দল থেকে হয়তো তাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, কিন্তু তারা দাঁড়িয়েছেন।

আবার আমাদের নারী আন্দোলনের অনেক সংগঠক বা কর্মী আছেন, যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন—কিন্তু তারা কেন নির্বাচনে অংশ নেন না? দিনশেষে প্রশ্নটা হচ্ছে—আমাদের সচেতনতা কীভাবে তৈরি হবে—এসবও তো রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে। আমার দেশে কতগুলো চাইল্ড কেয়ার সেন্টার হবে, মাতৃত্বকালীন ছুটি কেমন হবে, প্রশাসনের জবাবদিহিতা কী হবে—যারা সংসদে যান তারা এগুলো ঠিক করেন। আর সেই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনেই এসে পড়ে।

সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি—ঘর থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, নারীদের তা করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নারীদেরই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। এটা হয়তো অনেক সময় ডাবল বার্ডেন মনে হতে পারে—তবুও এই কাজটা আমাদের করতেই হবে।

আমরা প্রায়ই বলি—আমাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে, আমাদের নেওয়া হচ্ছে না, আমাদের এক্সক্লুড করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা সেটা মেনে নিচ্ছি কেন?

আরেকটি বিষয় হলো পরিচয়ের রাজনীতি। আমরা মা হিসেবে নারীর পরিচয়কে খুব বেশি গুরুত্ব দিই। কিন্তু বাবা হওয়াটাও তো সমানভাবে স্বাভাবিক। সেই জায়গায় আমাদের পরিচয়ের রাজনীতিটাও বদলাতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমরা কী করছি—এই প্রশ্নটা সামনে আনতে হবে।

আর এখানে যারা উপস্থিত আছি, আমরা বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। আমাদের একটি দায়িত্বও আছে—সমাজের সেই বৃহৎ অংশের নারীদের কাছে যাওয়া, যারা শ্রমজীবী, কৃষিশ্রমিক, গার্মেন্টস কর্মী বা পেশাজীবী নারী। তাদের সংগঠিত করা জরুরি, যেন তারা ‘প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও জরুরি। সেই পরিবর্তন আনার জন্য সংগঠিতভাবে কাজ করতে হবে।

যখন আমরা এই কাজগুলো করব, তখন সেটার প্রভাব আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও পড়বে। আমরা যদি দলের ভেতরে উপস্থিত না থাকি, তাহলে দল কীভাবে এমন নীতি নির্ধারণ করবে যার ফলে নারী আরও বেশি অংশগ্রহণ করতে পারে? এই লড়াইটা আমাদের সংগঠনের ভেতরেও করতে হবে—কখনো নিজের সঙ্গেও, কখনো সহকর্মীদের সঙ্গেও। যেমন আগে বলা হয়েছে—ঘরের ভেতরে যদি আমরা লড়াই না করি, যদি সেখানে সবসময় আপস করি, তাহলে বাইরে গিয়ে লড়াই করার শক্তিও থাকবে না।

পাশাপাশি প্রশাসনের জবাবদিহিতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জবাবদিহিতাহীন প্রশাসনের পরিবর্তনের জন্য নারীদের সংগঠিত হতে হবে, ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলতে হবে। এই কণ্ঠ শুধু নারীদের নয়—পুরুষদেরও সঙ্গে নিয়ে সমাজের নীতি পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে।

হাবিবা আখতার চৌধুরী

এখানে আসলে ইসলাম সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা আছে যে—ইসলাম নাকি নারীদের ঘরে আটকে রাখে, তাদের কাজ করতে দেয় না। এই ধারণা এখনো অনেকের মধ্যে আছে। আমার মনে হয় এর একটা কারণ হলো—কিছু আলেম যারা পুরোপুরি শিক্ষিত না বা আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত নন। তারা গ্রামাঞ্চলে কিছু বক্তব্য দেন, যার প্রভাব সমাজে পড়ে।

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখাতে চাই যে ইসলাম এভাবে নারীদের বাধা দেয় না। অর্থাৎ আমরা বলতে চাই যে, ইসলাম নারীদের কাজের করার বিরুদ্ধে নয়।

তাসনিম জারা

সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে অনেকেরই হয়তো নিজস্ব সাপোর্ট সিস্টেম আছে। কিন্তু যাদের নেই, তাদেরকে সহজেই টার্গেট করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। যখন কোনো নারী রাজনীতিতে আসতে চান বা পাবলিক লাইফে আসতে চান, তখন তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য একটা শক্তিশালী মেকানিজম দরকার। ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন করা নারী কর্মীদের সুরক্ষা দরকার।

আরেকটা সমস্যা হলো—অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের নমিনেশন দেয় না, কিন্তু প্রচারণার সময় তাদের সামনে রাখে শুধু উপস্থিতি দেখানোর জন্য। এটা অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।

আরেকটা বড় বিষয়—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষা বা রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টা যথেষ্ট নেই। যদি আমরা স্কুল থেকেই শেখাতে পারি—নির্বাচন কীভাবে কাজ করে, ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে কাজ করে—তাহলে ভবিষ্যতে পরিবর্তন সম্ভব।

এখন অনেকেই বলে—টাকা আর পেশিশক্তি ছাড়া নির্বাচন সম্ভব না। অনেকেই আমাকে বলেছে—তুমি কেন এটা করছ? এটা সম্ভব না। কিন্তু আমি মনে করি—যত বেশি মানুষ বিকল্প রাজনীতিতে বিশ্বাস করবে, তত বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

নাবিলা তাসনিদ

আমি নির্বাচনী এলাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ নারী হলেও কর্মজীবী মাত্র ১৯ শতাংশ। আর তাদের বেশিরভাগই দিনমজুর বা নিম্ন আয়ের কাজ করেন। এর মূল কারণ শিক্ষার অভাব। শিক্ষার অভাব থাকলে ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগও কম থাকে। ফলে এই পুরো বিষয়টা একটা চেইন রিঅ্যাকশন বা দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে। যখন একজন নারীকে প্রতিদিন চিন্তা করতে হয়—তার পরিবারে খাবার জুটবে কি না, তার সন্তানরা খেতে পারবে কি না—তখন তার জন্য রাজনৈতিক সচেতন হওয়া খুব কঠিন।

এমনকি যেসব নারী শিক্ষিত, চাকরি করেন, তাদেরও অনেক ক্ষেত্রে সময়ের অভাব থাকে। কাজের চাপের কারণে তারা রাজনীতি বা নাগরিক বিষয় নিয়ে ভাবার মতো মানসিক সুযোগ পান না। ফলে এই সমস্যাগুলো সমাধান না করলে খুব বেশি পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি—যখন ভোটাররা সত্যিকারের মূল্যায়ন করেছে, তখন তারা প্রার্থীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা গুনছেন না। তারা দেখেছেন প্রার্থীর সততা, সামর্থ্য, ও অতীত কর্মকাণ্ড। অন্যদিকে যারা প্রার্থীর পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করছেন, তারা ভাবছেন স্বল্পমেয়াদি লাভের কথা।

অর্থাৎ এখানে দুই ধরনের গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একটা সুবিধাবাদী গ্রুপ—যারা দেখে কার পেছনে বিনিয়োগ করে তারা লাভ তুলতে পারবে। আরেকটা যারা সত্যিকারের পরিবর্তন চান।

সাইবার বুলিং ও অনলাইন আক্রমণ সমস্যা নিয়ে বলতে গেলে যখন একজন নারীকে অনলাইনে টার্গেট করা হয়, তখন শুধু তাকে চুপ করানো হয় না, ভবিষ্যতে যারা রাজনীতিতে আসতে চায় তাদেরও নিরুৎসাহিত করা হয়। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে আমাদের সাপোর্ট সিস্টেম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

আমি মনে করি পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু তার জন্য আমাদের আরও বেশি মানুষকে সামনে আসতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা সম্ভব।

মেঘনা আলম

সব মিলিয়ে আমি কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলতে চাই।

প্রথমত, নির্বাচনী অর্থায়নের একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা দরকার। অনেক উন্নত দেশে রাষ্ট্র নির্বাচনী প্রচারের জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করে। এতে সবাই সমান সুযোগ পায়। আমাদের দেশেও যদি রাষ্ট্র বা নির্বাচন কমিশন একটি ফান্ডিং মেকানিজম তৈরি করে এবং সবাইকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সমান সুযোগ দেয়, তাহলে অনেক নারী প্রার্থী সামনে আসতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমি নির্বাচনের আগের রাতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একটি জিডি করেছি। কারণ নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের অনেকেই মিছিল বা স্লোগানে প্রতিবাদ করি, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ করা যায়—এটা অনেকেই জানেন না।

সবশেষে বলব—যদি নির্বাচনী কাঠামো শক্তিশালী হয়, অর্থায়ন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে নারীদের জন্য রাজনীতি করা সহজ হবে। তখন মানুষও প্রার্থীকে ব্যক্তি হিসেবে দেখবে, শুধু দলের প্রতীক হিসেবে নয়। ভবিষ্যতে যদি আমরা কাঠামোগত সংস্কার করতে পারি, তাহলে নারী নেতৃত্বের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি হবে।

তানিয়া হক, অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সত্যি বলতে মাঠে যারা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কাজ করছেন—বিশেষ করে নারী প্রার্থীরা—তারাই বাংলাদেশের প্রকৃত নায়ক। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে তাত্ত্বিক আলোচনা করি, গবেষণা করি, কিন্তু তারা বাস্তবে মাঠে কাজ করছেন। আমরা শ্রমবাজারে এবং রাজনৈতিক দলে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব চাই—এক ধরনের পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন হিসেবে। তবে আমার মনে হয়, শুধু এই জায়গাতেই নয়—ঘরের ভেতরেও পরিবর্তন দরকার। বিশেষ করে রান্নাঘরে, পুরুষদেরও রান্না করতে দেওয়া উচিত। তাহলে তারা বুঝতে পারবে যে গৃহস্থালির কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে।

কারণ বাস্তবে পরিবর্তন আনা খুব কঠিন, বিশেষ করে শুধু রাজনীতির ভেতর থেকে। তাই আমাদের পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে। কারণ বৈষম্যের শুরুটাও অনেক সময় সেখান থেকেই।

রাজনীতি, পরিবেশনীতি, অর্থনীতি—যেকোনো নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় মূলত পুরুষরাই থাকে। তারাই নীতি প্রণয়ন করে এবং সেই নীতির বাস্তব প্রভাব পড়ে নারীর ওপর। যদি আমরা বিষয়টিকে জেন্ডার লেন্স দিয়ে দেখি, তাহলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—বাংলাদেশ একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। আমার প্রশ্ন, এই সমাজে আমরা কি সত্যিই একজন নারীকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি? বাস্তবে অনেক সময় আমরা নারীকে একজন নেতা হিসেবে নয়, বরং একটি ‘দায়’ বা ‘লায়াবিলিটি’ হিসেবে দেখি।

গবেষণায় প্রায়ই দেখা যায়, নারীদের সম্পর্কে বলা হয়—‘তারা কেন রাজনীতি করবে?’, ‘তাদের তো ঘর-সংসার সামলানোর কথা।’ অর্থাৎ, সমাজ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় একজন নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় গ্রহণ করার জন্য। এখানে একটি বড় প্রশ্ন আসে—আমরা কেন আলাদা করে ‘নারী নেতা’ বা ‘পুরুষ নেতা’ বলব? পুরুষও মানুষ, নারীও মানুষ। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই বিভাজন কেন থাকবে?

রাজনীতির কাঠামোতে আমরা একটি ‘টক্সিক পুরুষতান্ত্রিক কালচার’ দেখতে পাই। এই সংস্কৃতি বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা তৈরি করে। অনেক সময় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ব্যবহার করে নারী নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, যদিও ধর্মে নারী-পুরুষের মর্যাদা সম্পর্কে খুব স্পষ্ট নির্দেশনা আছে।

এখন প্রশ্ন সমাধান কোথায়? আমার মতে চারটি জায়গায় কাজ করা জরুরি।

প্রথমত, পরিবার ও প্যারেন্টিং। এখানে আমাদের একটি ‘কমপ্রিহেনসিভ ফ্যামিলি পলিসি’ দরকার। আমরা পরিবার নীতি বলতে সাধারণত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা দুই সন্তান নেওয়া বুঝি। কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বড়। পরিবারই হলো সেই জায়গা যেখানে একটি শিশুকে শেখানো হয়—সে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হবে কি না, নেতৃত্ব দেবে কি না। আমরা যদি ছেলে সন্তানকে নেতৃত্ব শেখাই আর মেয়েকে শুধু রান্নাঘরের কাজ শেখাই, তাহলে বৈষম্য সেখান থেকেই শুরু। তাই প্যারেন্টিংয়ের জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তানকে ছেলে বা মেয়ে হিসেবে নয়—মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো ‘পারিবারিক অর্থনীতি’। আমরা জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু পরিবারেও তো একটি বাজেট থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সেই বাজেটের ব্যবহারে নারী-পুরুষের মধ্যে অসমতা থাকে। এই বিষয়গুলোও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। আমরা অনেক পুঁথিগত জ্ঞান অর্জন করেছি, কিন্তু এই জ্ঞান কতটা মানবিকতা ও সহনশীলতা তৈরি করছে—সেটা প্রশ্নের বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দেখি নারী ও পুরুষকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা হয়। এতে মানুষের মানসিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়—শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লিডারশিপ ট্রেনিং, ভলান্টিয়ারিজম, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ এবং বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম থাকা দরকার, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও উন্মুক্ত করবে।

গৃহস্থালির কাজের স্বীকৃতি। তৃতীয় বিষয় হলো ‘আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক’। গৃহস্থালির কাজ—যেমন রান্না, সন্তান লালনপালন, পরিবারের যত্ন নেওয়া—এসব কাজকে আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি—‘নারীরা কেন রাজনীতিতে যাবে?’ আমি বলতে পারি—‘পুরুষরা কেন শুধু বাইরে কাজ করবে?’ এই বিভাজনটি ভাঙা দরকার। ঘরের কাজ ও বাইরের কাজ—দুটিই সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত।

এম্পাওয়ারমেন্ট। আমরা প্রায়ই বলি—পুরুষরা অনেক ক্ষমতাবান, নারীরা এখনো ক্ষমতায়ন পায়নি। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা এখনো প্রকৃত ‘এম্পাওয়ারমেন্টের সংজ্ঞা’ বুঝতে পারিনি। একজন সত্যিকারের ক্ষমতাবান মানুষ সেই ব্যক্তি, যে অন্য একজন যোগ্য মানুষকে গ্রহণ করতে পারে এবং তাকে সম্মান দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক সময় দেখি—একজন ক্ষমতাবান পুরুষ একজন যোগ্য নারীকে ভয় পায়। এই মানসিকতা বদলাতে হবে।

আমরা বহু নীতিমালা তৈরি করেছি। কিন্তু ‘নৈতিকতা ছাড়া কোনো নীতিমালা কার্যকর হয় না’। পেশিশক্তি, অর্থের প্রভাব, সময়ের অভাব—এসব বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা ক্ষমতার কাছে যেতে চাই, ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চাই। কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন বা মানবিক মূল্যবোধকে আমরা এখনো পুরোপুরি গুরুত্ব দিই না।

আমার মনে হয় পরিবর্তন আসতে হবে ‘নিজের ভেতর থেকে’। শুধু রাষ্ট্র বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করলে হবে না। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও আমাদের একটি প্রত্যাশা আছে—যে ব্যক্তি ক্ষমতায় যাবে, তিনি যেন শুধু কোনো দলের নেতা না হয়ে ‘সমগ্র দেশের রাষ্ট্রনেতা’ হন। তিনি যেন শুধু নারী বা পুরুষের নেতা না হয়ে—সব মানুষের নেতা হন।