গরমে কেন এত ক্লান্ত লাগে?
পাড়ার মোড়ের দোকান থেকে টাটকা সবজি কিনে ঘরে ফিরেছেন হালিমা বেগম। কিন্তু ঘরে ফিরতেই তার শরীর বেশ দুর্বল লাগতে শুরু করল। এই তো এটুকু পথ! তবু বাইরে তীব্র গরমে ঘেমে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।
গরমের দিনগুলোতে আমাদের জনজীবনে যেন এটি খুব সাধারণ চিত্র। একটু সচেতনতা গ্রীষ্মের প্রখর তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে, আর অবহেলা কখনো কখনো মৃত্যুঝুঁকির কারণও হতে পারে। তাই চলুন জেনে নেওয়া যাক, গরমে ক্লান্ত লাগার কারণ এবং এই সময়ে সুস্থ থাকতে কোন বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি—সেই বিষয়ে।
বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সীফাত জাহান শশী।
গরমে কেন এত ক্লান্ত লাগে?
শরীর ঠান্ডা রাখতে বেশি শক্তি ব্যয় হয়
যখন আবহাওয়া খুব গরম থাকে, তখন শরীর ঘাম সৃষ্টি করে এবং রক্তনালীগুলো প্রসারিত করে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। শরীরকে ঠান্ডা রাখার এই প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় হয়। ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত ঘাম
অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও লবণের পরিমাণ কমে যায়। ঘামের সঙ্গে শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইটও বের হয়ে যায়। এর ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান ধরা, অবসাদ এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পানিশূন্যতা
পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং শরীরের কোষগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। ফলে শরীরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
ঘুমের সমস্যা
গরমের কারণে অনেকেরই ভালো ঘুম হয় না। রাতে অতিরিক্ত গরম, অস্বস্তি বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার ফলে ঘুমের মান কমে যায়। রাতে সঠিকভাবে ঘুম না হলে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। এর ফলে দিনের শুরু থেকেই শরীর ভারী লাগে এবং সারাদিন ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
রোদ ও তাপের প্রভাব
দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে হিট এগজস্টশন (অতিরিক্ত গরমের কারণে শরীরের ক্লান্তির অনুভূতি) হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘাম, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, বমিভাব ও ক্লান্তি।
অনেক ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। হিট স্ট্রোক হলে শরীরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যায় (সাধারণত ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি)। এ সময় ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে বা কখনো অতিরিক্ত ঘামও হতে পারে।
এছাড়া, মস্তিষ্ক ও আচরণে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যেমন: মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন বা অস্বাভাবিক কথা বলা, অস্থিরতা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে তীব্র দুর্বলতা, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং খিঁচুনি।
হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে করণীয়
হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে যা করতে হবে:
রোগীকে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যেতে হবে।
আঁটসাঁট কাপড় খুলে দিতে হবে।
শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিতে হবে।
রোগীকে ফ্যানের নিচে রাখতে হবে বা বাতাস করতে হবে।
বরফ থাকলে বগল, ঘাড় ও কুঁচকিতে দিতে হবে।
রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে গিয়ে না থাকে, তাহলে অল্প অল্প করে পানি বা ওরস্যালাইন পান করাতে হবে।
যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ হিট স্ট্রোক প্রাণঘাতী হতে পারে এবং এর ফলে মস্তিষ্ক, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কী করলে গরমে কম ক্লান্ত লাগবে?
গরমের সময় বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং বাইরে কাজ করেন যারা তাদের বেশি সতর্ক থাকতে হয়। এক্ষেত্রে করণীয়:
বেশি বেশি পানি পান করা
পিপাসা লাগার আগেই পানি পান করতে হবে। এর পাশাপাশি ডাবের পানি, লেবুর শরবত ও ওরস্যালাইন খাওয়া যেতে পারে।
হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া
ফলমূল, শাকসবজি এবং কম তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেতে হবে। এছাড়াও, গরমের দিনে হজমে সাহায্য করতে ও শরীরকে ঠান্ডা রাখতে তরমুজ, শসা ও টকদই বেশ উপকারী।
দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা
বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে তীব্র রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।
ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের পোশাক পরিধান
গরমের দিনগুলোতে আরামদায়ক, ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের পোশাক পরা উচিত। এতে শরীর কম গরম হয়।
পর্যাপ্ত ঘুমানো
দিন ও রাতের বেলায় ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হবে। যাদের ঠান্ডাজনিত কোনো সমস্যা নেই, তারা ঘুমানোর আগে একটা শর্ট গোসল সেরে নিতে পারেন।
কখন ডাক্তার দেখানো জরুরি
যদি কারো ক্ষেত্রে নিচের এই বিষয়গুলো চোখে পড়ে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খুব বেশি দুর্বলতা
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
শ্বাসকষ্ট
বুক ধড়ফড় করা
জ্বরের মতো গরম লাগা
বিভ্রান্তি বা কথা জড়িয়ে যাওয়া



