হান্তাভাইরাস: বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কতটা?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

নতুন করে সামনে আসা হান্তাভাইরাস জনমনে বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। হান্তাভাইরাস কীভাবে ছড়ায় এবং আমাদের জন্য কতটা ঝুঁকির এই ভাইরাস—এই প্রশ্ন ঘুরছে অনেকের মনে।

এই সম্পর্কে কথা বলেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন।

হান্তাভাইরাস কী

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হান্তাভাইরাস হচ্ছে ইঁদুরবাহিত ভাইরাস, যা মানবদেহে মারাত্মক অসুস্থতা সৃষ্টি করে। তবে সচরাচর এটি মানবদেহকে সংক্রমিত করে না। হান্তাভাইরিডি পরিবার ও বুনিয়াভাইরালিস ক্রমের অন্তর্গত হচ্ছে হান্তাভাইরাস।

কীভাবে ছড়ায়

ইঁদুরের মাধ্যমেই মূলত হান্তাভাইরাস ছড়ায়। হান্তাভাইরাস সংক্রমিত ইঁদুরের প্রস্রাব, লালা, মলের সংস্পর্শে এলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া হান্তাভাইরাস শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়।

বিরল ক্ষেত্রে হান্তাভাইরাস সংক্রমিত ইঁদুরের কামড়েও মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

আমেরিকা মহাদেশে হান্তাভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত অ্যান্ডিস ভাইরাস দ্বারা মানুষ সংক্রমিত হলে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হতে পারে। তবে এটি সাধারণত কম ঘটে। যখন মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটে, সেটা হয় একই স্থানে বসবাসরত পরিবারের সদস্যদের মাঝে বা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে। অসুস্থতার প্রথম দিকে এটা ঘটে, যখন ভাইরাসের রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা বেশি থাকে।

লক্ষণ

হান্তাভাইরাস সংক্রমিত ঈঁদুরের দূষিত মল-মূত্র, লালার সংস্পর্শে আসার এক থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে রোগের লক্ষণগুলো দেখা দেয়। তবে এটা নির্ভর করে হান্তাভাইরাসের অন্তর্গত কোনো ভাইরাস দ্বারা মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে তার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • জ্বর হয়, ক্লান্তি লাগে।

  • মাথাব্যথা হয়।

  • মাংসপেশিতে ব্যথা হয়।

  • পেটে ব্যথা।

  • বমি বা বমিভাব হয়।

  • পরবর্তী পর্যায়ে রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসে পানি জমা, রক্তপাত, কিডনিজনিত জটিলতাসহ গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়।

মৃত্যুঝুঁকি কতখানি?

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হান্তাভাইরাস দুইটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকা মহাদেশে হান্তাভাইরাসের অন্তর্গত অ্যান্ডিস ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস আক্রান্ত (হান্তাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম—এইচসিপিএস) হয়। এতে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। রোগী অনুপাতে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

ইউরোপ ও এশিয়াতে হান্তাভাইরাসে আক্রান্ত হলে কিডনি আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে রক্তপাত (হান্তাভাইরাস হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম—এইচএফআরএস) ঘটে। ইউরোপ ও এশিয়াতে রোগী অনুপাতে মৃত্যুহার শতকরা একের কম থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

চিকিৎসা কী

হান্তাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ওষুধ বা টিকা এখনো নেই। তবে লক্ষণগুলোর চিকিৎসা যত তাড়াতাড়ি করা যায়, রোগীর তত দ্রুত সেরে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। রোগীর হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, কিডনির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কতটা ও করণীয়

সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে একটি প্রমোদতরীতে হান্তাভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যু ও আক্রান্তের খবরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ভাইরাসটি। হান্তাভাইরাস বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগ বা ঝুঁকির কারণ হতে পারে—এই প্রসঙ্গে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমাদের জন্য ঝুঁকি একেবারেই কম। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সংক্রমণ এড়াতে প্রস্তুত থাকার পাশাপাশি অবশ্যই কিছু সর্তকতা মেনে চলা উচিত। হান্তাভাইরাস প্রতিরোধে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। হাতের পরিচ্ছন্নতাসহ যথাযথ সাবধানতা (স্ট্যান্ডার্ড প্রিকশন) মেনে চলতে হবে।

যেহেতু হান্তাভাইরাস সংক্রমিত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়, সেহেতু ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। বাসস্থান ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি পরিষ্কার করার সময় যথাযথ সর্তকতা মেনে কাজ করতে হবে।