চুল পড়া কি আসলেই থামানো যায়?
মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সেই দুশ্চিন্তা এতটাই প্রকট যে সেটিও চুল পড়া বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ। অথচ কিছু বিষয়ে সচেতন হলে খুব সহজেই অনেকাংশে চুল পড়া রোধ করা যায়।
এই বিষয়ে কথা বলেছেন এম এইচ শমরিতা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল স্কিন সেন্টারের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী।
চুল পড়ে কেন
অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী বলেন, চুলের বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার স্বাভাবিক চক্র জন্মের পর থেকেই থাকে। শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সেই কিছু চুল প্রতিদিন ঝরে পড়ে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ৩০ থেকে ১০০টি চুল পড়াকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। চুলের জীবনচক্রের তিনটি ধাপ—অ্যানাজেন, ক্যাটাজেন ও টেলোজেন অনুযায়ী একদিকে পুরোনো চুল ঝরে পড়ে ও অন্যদিকে সেই হারে নতুন চুল গজায়। অনেক বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চুল গজানোর হার কমে যায় ও পড়ার হার বেড়ে যায়, যে কারণে মাথায় চুলের সংখ্যা কমে যায়। চুল পড়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে—
- শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে চুল পড়ে যায়। বিশেষ করে প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের (বিশেষ করে বায়োটিন বা বি১২) অভাবে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।
- অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’, ফ্যাট গ্রহণ চুল পড়ার একটি বড় কারণ হতে পারে।
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ধূমপান, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে চুল পড়ে।
- টাইফয়েড, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ভাইরাল জ্বরের পরে চুল পড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে বলে পোস্ট ফেব্রাইল এফ্লুভিয়াম।
- থাইরয়েড, অন্তসত্ত্বাকালীন, সন্তান জন্মের পরপর, হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে অনেক নারীর চুল বেশি পড়তে পারে। এটিকে পোস্ট পারটাম এফ্লুভিয়াম বলে।
- অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা নামক রোগের কারণে মাথার চুল পড়ে যায়, ছেলে-মেয়ে উভয়ের এটা হতে পারে।
অ্যান্ডোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া রোগের কারণে চুল পড়ে যায়। মূলত জেনেটিক প্রবণতা ও অ্যান্ড্রোজেন হরমোন বিশেষ করে ডিহাইড্রো-টেস্টোস্ট্রেরনের (ডিএইচটি) কারণে চুল পড়ে। এটি পুরুষদের ক্ষেত্রে মেল প্যাটার্ন টাক এবং নারীদের ক্ষেত্রে ফিমেল প্যাটার্ন হেয়ার লস নামে পরিচিত।
- এছাড়া অটোইমিউন রোগ সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস (এসএলই), ডিসকয়েড লুপাস এরিথেমাটোসাস (ডিএলই) এবং লাইকেন প্ল্যানাস রোগের কারণে চুল পড়ে যায়।
- ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া হলো এমন এক ধরনের চুল পড়া, যা দীর্ঘদিন চুলে টান পড়ার কারণে হয়। চুলে অতিরিক্ত হাত বুলানো, চুল টানার অভ্যাস কিংবা মাথায় হেলমেট ব্যবহারে ঘর্ষণ, ঘাম ও মাথায় জমে থাকা ময়লার কারণে খুশকি ও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে চুল পড়া বেড়ে যায়।
- অতিরিক্ত খুশকি, অপরিচ্ছন্ন ত্বক, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস সংক্রমণের কারণে স্কাল্পে প্রদাহ হয় এবং হেলার ফলিকল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে চুল পড়ে যায়।
- চুলে অতিরিক্ত তাপ (স্ট্রেইটনার/ড্রায়ার), বারবার রাসায়নিক ও হেয়ার কালার ব্যবহার এবং চুল শক্ত করে বেঁধে রাখা, ভেজা চুল আঁচড়ানোর কারণেও চুল পড়ে।
চুল পড়া কি আসলেই রোধ করা যায়?
অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে চুল পড়া কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিছু চুল পড়া সাময়িক, আবার কিছু দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তাই চুল পড়া রোধে কারণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
১. অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা হলো এক ধরনের অটোইমিউন রোগ। তাই চুল পড়া রোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং ইমিউনো সাপ্রেসিভ লোশন বা ক্রিম, মিনোক্সিডিল ব্যবহার করলে মাথায় নতুন চুল গজায়।
২. অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়ার কারণে চুল পড়লে তার চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে স্কাল্পে মিনোক্সিডিল ব্যবহার, কিছু ক্ষেত্রে ফিনাস্টেরাইড, প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা (পিআরপি) থেরাপি, হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে চুল পড়া রোধ করা যায়।
৩. ফাঙ্গাস সংক্রমণের কারণে চুল পড়া রোধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ও শ্যাম্পু এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়।
৪. চুল পড়া রোধে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার (মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি), আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স বিশেষ করে বায়োটিন ও ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। অনেক বেশি পরিমাণে চর্বি, কার্বোহাইড্রেট ও ভিটামিন এ খাওয়া যাবে না, সুষম খাবার খেতে হবে।
৫. মানসিক চাপ কমাতে হবে। মেডিটেশন, নিয়মিত ব্যায়াম, ঘুম ও পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. জ্বর-পরবর্তী সময়ে চুল পড়া সাধারণত এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। এর জন্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, চুলের যত্ন ও বিশ্রাম নিতে হবে।
৭. নিয়মিত চুলের যত্ন নিতে হবে, চুলে হালকা শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে, মাথায় অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করা যাবে না। চুলে অতিরিক্ত তাপ, রাসায়নিক ও হেয়ার কালার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. ট্র্যাকশন অ্যালোপেসিয়া রোধে চুলে হাত বুলানো, চুল টানার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। মাথায় হেলমেট ব্যবহার করলে নিয়মিত মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে, হেলমেটের ভেতরে সুতির স্কার্ফ বা ব্যান্ডানা ব্যবহার করতে হবে। খুব শক্ত করে চুল বাঁধা ও ভেজা চুল আঁচড়ানো যাবে না।
৯. বিভিন্ন রোগের কারণে চুল পড়া রোধে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।


