শীতে কি খুশকি বাড়ে
শীত ঋতুতে প্রকৃতি হয়ে ওঠে শুষ্ক, রুক্ষ। প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ত্বকেও আসে পরিবর্তন, ব্যতিক্রম নয় মাথার ত্বকও। শীতকালে খুশকি নামক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন অনেকেই।
শীতকালে কি আসলেই খুশকি বাড়ে? কেন বাড়ে? এই সম্পর্কে জেনে নিন এম এইচ শমরিতা হাসপাতাল অ্যান্ড মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল স্কিন সেন্টারের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরীর কাছ থেকে।
শীতকালে কি খুশকি বাড়ে
অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী বলেন, খুশকি হলো মূলত মাথার স্ক্যাল্পের মৃত ত্বকের কোষ। মাথার ত্বকে নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং পুরোনো কোষ ধীরে ঝরে যায়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এই কোষ তৈরির গতি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় এবং মৃত কোষ জমা হয়ে দ্রুত ঝরে পড়ে, তখন এটি খুশকি হিসেবে দেখা দেয়। শীতকালের ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া, ত্বকের রোগ, ফাঙ্গাল সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে মাথার ত্বকে খুশকি হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।
- অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীত ঋতুতে ঠান্ডা আবহাওয়া ও কম আর্দ্রতার কারণে মাথার ত্বক অনেক বেশি শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে যায়। যার ফলে মাথার ত্বকে খুশকি অনেক বেশি বেড়ে যায়।
- শীতকালে নিয়মিত চুল পরিষ্কার না করা, শ্যাম্পু না করা কিংবা কয়েকদিন চুল না ধোয়ার কারণে তেল ও মৃত কোষ জমে খুশকি হতে পারে। গোসলের সময় গরম পানি ব্যবহারের কারণে মাথার ত্বক আরও শুষ্ক ও রুক্ষ হয়, যার ফলে খুশকি বেড়ে যায়।
- শীতকালে দীর্ঘসময় কানটুপি ও মাফলার ব্যবহারের কারণে ঘাম ও আর্দ্রতায় ফাঙ্গাল সংক্রমণ বাড়ার কারণেও খুশকি হতে পারে।
- শীতকালে পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা মাথার ত্বককেও শুষ্ক করে তোলে এবং খুশকি বাড়ায়।
- যাদের মাথার ত্বকে এক্সফোলিয়েশন, মানে মাথার ত্বকের কোষ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত ঝরে পড়ে, তাদের খুশকি বেশি হয়। মাথার ত্বকে প্রাকৃতিক তেল (সেবাম) বেশি থাকলে এক্সফোলিয়েশনও বেশি হয়।
- ত্বকের রোগ সেবোরিক ডার্মাটাইটিসের কারণে খুশকি হতে পারে। শীতে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে। সেবাম উৎপাদন বেড়ে যাওয়া ও ম্যালাসেজিয়া নামক ছত্রাকের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে মাথার ত্বকে, মুখে, নাক, কানে, শরীরের অন্যান্য ভাঁজেও এটি হতে পারে।
- শীতকালে চর্মরোগ সোরিয়াসিস ও একজিমার কারণে খুশকি বেড়ে যায়।
- পিটিরিয়াসিস অ্যামিয়ানটেসিয়ার কারণেও শীতকালে মাথার ত্বকে খুশকি বাড়তে পারে।
- টিনিয়া ক্যাপিটিসের কারণে খুশকি বেড়ে যায়। মাথার ত্বকে টিনিয়া ফাঙ্গাস সংক্রমণের কারণে এটি হয়।
- চুলের রোগ ফলিকুলাইটিস হলো চুলের গোড়ায় প্রদাহ বা সংক্রমণ, যা ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের কারণে হয়। এর কারণেও খুশকি হতে পারে।
- মাথার ত্বকে অতিরিক্ত ঘষার কারণে স্ক্যাল্পে ক্ষতি হয়, প্রদাহ বাড়ার ফলে খুশকি হতে পারে।
করণীয়
অধ্যাপক ডা. এম ইউ কবীর চৌধুরী বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই হচ্ছে মাথার ত্বক ভালো রাখার মূলমন্ত্র। বাজারে বিভিন্ন ধরনের শ্যাম্পু পাওয়া যায়, চুলের যত্নে সবসময় ভালো হেয়ার ওয়াশ ব্যবহার করতে হবে।
যদি মাথার ত্বকে কোনো রোগ দেখা দেয়, খুশকি না কমে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মাথার ত্বক পরীক্ষা করে দেখতে হবে খুশকি কী কারণে হচ্ছে—ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকের সংক্রমণ, নাকি সোরিয়াসিস, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস কিংবা অন্যকোনো চর্মরোগ।
যদি রোগ শনাক্ত হয় সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খুশকি দূর করার জন্য মেডিকেটেড অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে। যেমন: জিঙ্গ পাইরিথিওন, কেটোকোনাজল, সেলেনিয়াম সালফাইডযুক্ত শ্যাম্পু ইত্যাদি। এ ছাড়া স্টেরয়েড, মাইল্ড স্টেরয়েডযুক্ত কিছু স্প্রে পাওয়া যায়, যেগুলো মাথার ত্বকে দেওয়া হলে খুশকি কমে। তেলের পরিবর্তে হেয়ার সিরাম ব্যবহার করতে হবে খুশকি দূর করার জন্য। এর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে।
মাথার ত্বক বা চুল অতিরিক্ত ঘষা যাবে না, হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেটনারের ব্যবহার কমাতে হবে, হালকাভাবে চুল আঁচড়াতে হবে। এ ছাড়া শীতকালে মাথার ত্বক ভালো রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। গোসলের সময় গরম পানির পরিবর্তে হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে মাথার ত্বক আর্দ্র রাখতে। মাথায় যাতে ধুলাবালি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

