বলছি ব্যস্ত আছি, সত্যিই কি এতটা ব্যস্ত?
অফিসের ডেস্কের ওপর রাখা ফোনটি হঠাৎ বেজে উঠল। রহমান সাহেব ফোনটি সাইলেন্ট করে রাখলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবারও কল এলো। এবার তিনি কলটি রিসিভ করলেন। তার ছোটবেলার এক বন্ধু ফোন করেছেন। রহমান সাহেব বললেন, ‘আমি এখন খুব ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলছি।’ এরপর কলটি কেটে দিলেন।
অফিসে প্রায় প্রত্যেক মানুষই কাজের চাপে ব্যস্ত সময় কাটান। তবুও কিছু প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তোলে—
• রহমান সাহেব কি ফোনটি রিসিভ করার পর সরাসরি ‘ব্যস্ত আছি’ বলার পরিবর্তে প্রথমে একটু কুশল বিনিময় করে পরে কলব্যাক করার কথা জানাতে পারতেন না?
• যিনি ফোন করেছেন, হয়তো কোনো প্রয়োজনেই করেছেন। ফোন করার কারণটি সংক্ষেপে একবার জেনে নেওয়া কি সম্ভব ছিল না?
• ব্যস্ততার মাঝেও কি হাসিমুখে কয়েকটি সৌজন্যমূলক কথা বলে কিছু সময় দেওয়া যেত না?
একবার ভেবে দেখুন তো, আজ সারাদিনে ‘আমি ব্যস্ত আছি’—এই কথাটি আপনি অন্যের কাছ থেকে কতবার শুনেছেন? আর নিজে কতবার অন্যকে বলেছেন? ব্যস্ততার উপমায় কি তাহলে আমরা নিজেদের আড়াল করছি!
‘খুব ব্যস্ত আছি’ অজুহাত নাকি বাস্তবতা?
কর্মব্যস্ত জীবনে ব্যস্ত থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেটা কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু যখন কেউ বলে আমি সারাদিনই ব্যস্ত থাকি—এর পেছনে কিছু কারণ থাকে।
অতিরিক্ত দায়িত্ব
আমরা হয়তো ঠিক যতটা কাজ স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারি, তারচেয়েও অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে ফেলি। বেশি দায়িত্ব মানেই বেশি কাজের চাপ। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, আমি কেন আমার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব নেব, যা আমার জীবনের অবসর সময়গুলোকে ব্যস্ততায় রূপান্তরিত করে ফেলতে পারে? পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছু ক্ষেত্রে ‘না’ বলাটা জরুরি।
টাইম ম্যানেজমেন্ট
সময়ের কাজ সময়ে করা বা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে অনেক সময় আমাদের মনে হয়, ‘ইশ, আরেকটু সময় যদি পেতাম, তাহলে কাজটা ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করতে পারতাম।’ বাস্তবে, প্রত্যেকের হাতেই দিনে ২৪ ঘণ্টা সময় থাকে। টাইম ম্যানেজমেন্ট ও সঠিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে দিনশেষে আপনি ব্যস্ততার অজুহাতে অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেবেন, নাকি সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করবেন।
ভীতি
ব্যক্তিগত বা কর্মজীবনে নতুন কোনো পরিস্থিতি কিংবা কাজ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমরা অনেক সময় বলি, ‘খুব ব্যস্ত আছি, এর জন্য সময় করে উঠতে পারব না।’ প্রকৃতপক্ষে, এটি সময়ের অভাব নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বা নতুন কিছুর মুখোমুখি হওয়ার ভীতি থেকে অনেকেই ‘ব্যস্ততা’ শব্দটিকে এক ধরনের ‘সেফ এক্সিট’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
কমফোর্ট জোন
অনেকেরই হয়তো যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা রয়েছে, সামাজিকভাবেও তারা একটি ভালো অবস্থানে রয়েছেন এবং তাদের জীবনযাত্রার মানও ঈর্ষণীয়। এ ধরনের অনেক মানুষ নতুন কিছু শেখা বা আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত না করে বরং নিজেদের কমফোর্ট জোনে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ব্যস্ততাকে তারা অকাট্য যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
‘আমি ব্যস্ত’ বলার অভ্যাস কেন ত্যাগ করবেন?
অসম্মানজনক শোনাতে পারে
কাজের অনুরোধ, দাওয়াত বা সোশ্যাল মিটআপের ক্ষেত্রে আপনি যদি বলেন, ‘আমি ভীষণ ব্যস্ত, সময় করে উঠতে পারব না’, তাহলে এই কথাটি শুধু আপনার অসম্মতিই প্রকাশ করে না, বরং অপর পক্ষের কাছে রূঢ়ও মনে হতে পারে। তার মনে হতে পারে যে তিনি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নন। অনেক ক্ষেত্রে ‘ব্যস্ততা’ শব্দটিও অন্যের কাছে অসম্মানজনক বলে মনে হতে পারে। তাই কারও সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে সরাসরি না বলে, পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেতে পারে।
গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়
আপনি যখন কাউকে বারবার নিজের ব্যস্ততার কথা বলেন, তখন অন্যদের কাছে মনে হতে পারে যে আপনি সময় ব্যবস্থাপনায় খুব একটা দক্ষ নন। কারণ কমবেশি সবার জীবনেই ব্যস্ততা রয়েছে। তাই ব্যস্ততার কারণে কাউকে সরাসরি ‘না’ না বলে, আপনার অপারগতার সুনির্দিষ্ট কারণটি তুলে ধরুন। এতে পারস্পরিক সম্পর্কে ইতিবাচকতা বজায় থাকে।
সম্পর্ক নষ্ট হয়
আপনি যখন সবার সামনে বারবার বলতে থাকেন যে আপনি সব সময় ব্যস্ত, তখন তা আপনার সম্পর্কগুলোকে দুর্বল করে তুলতে পারে। কেন জানেন?
কারণ সব সময় ব্যস্ততার কথা বললে আপনি নিজের এবং আশপাশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেন। ফলে মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে আপনাকে আর সম্পৃক্ত করতে চায় না। এর ফলে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। তাই নিজের ব্যস্ততার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সময় বের করা এবং প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এতে সম্পর্কের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।
তাই চাইলে একটি নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। কর্মজীবন বা ব্যক্তিজীবন—যেখানেই হোক না কেন, কেউ যখন আপনার শরণাপন্ন হয়ে বলে, ‘আপনি মনে হয় অনেক ব্যস্ত। আপনাকে বিরক্ত করলাম না তো? একটু সময় হবে কি আপনার?’ তখন এর উত্তরে ‘আমি ব্যস্ত আছি’ না বলে আমরা বলতে পারি, ‘আপনার, আমার—আমাদের সবারই তো ব্যস্ততা রয়েছে। আসুন, কথা বলি। কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ আর যদি ওই সময়ে ব্যস্ত থাকেনও, তাহলে সেটা জানিয়ে বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাওয়া যে, জরুরি কোনো বিষয় কি না। অন্যথায় আপনি পরে ফোন করে বিস্তারিত আলাপ করবেন।


