কাজ জানেন, কিন্তু মিটিংয়ে কথা বলতে পারেন না?
নিজের কাজটি আপনি ভালোই জানেন। কোনো প্রকল্প নিয়ে কী সমস্যা হচ্ছে, সেটিও বুঝতে পারছেন। এমনকি সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানও হয়তো মাথায় আছে। কিন্তু মিটিং শুরু হলে অন্যরা একের পর এক কথা বলে যাচ্ছেন, আর আপনি চুপ করে শুনছেন। কিছু বলার কথা ভাবলেও মনে হচ্ছে, আরেকটু পরে বলি। সেই ‘পরে’ আর আসছে না। মিটিং শেষ হওয়ার পর মনে হচ্ছে, কথাটা তখন বললেই তো হতো!
কাজে দক্ষ হওয়া আর মিটিংয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারা সব সময় একসঙ্গে আসে না। বিশেষ করে নতুন কর্মস্থল, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কিংবা অনেক মানুষের সামনে কথা বলতে হলে দ্বিধা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি মিটিংয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলাই লক্ষ্য নয়। প্রয়োজনের সময় নিজের মতামত, প্রশ্ন বা কাজের অগ্রগতি স্পষ্টভাবে জানাতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কেন কথা আটকে যায়, আগে সেটি বুঝুন
মিটিংয়ে চুপ থাকার কারণ সবার এক নয়। কারও মনে হয়, তার কথাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ ভুল কিছু বলে ফেলবেন ভেবে অপেক্ষা করেন। আবার কারও বক্তব্য তৈরি করতে একটু সময় লাগে। ততক্ষণে আলোচনা অন্য বিষয়ে চলে যায়। কখন আপনার কথা বলতে বেশি সমস্যা হচ্ছে, সেটি খেয়াল করুন। পরিচিত সহকর্মীদের ছোট মিটিংয়েও কি একই সমস্যা হয়, নাকি শুধু বস বা ঊর্ধ্বতন কেউ থাকলে? নিজের কাজ নিয়ে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কিন্তু নতুন কোনো মতামত দিতে গিয়ে থেমে যান? কারণটি ধরতে পারলে সমাধানও নির্দিষ্ট করা সহজ হবে।
প্রস্তুতি শুধু কাজের নয়, কথারও
মিটিংয়ের আগে রিপোর্ট বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করলেই প্রস্তুতি শেষ নয়। কী বলতে চান, সেটিও আগে থেকে ভেবে রাখতে পারেন। মিটিংয়ের আলোচ্য বিষয় জানা থাকলে দুই-তিনটি পয়েন্ট লিখে রাখুন। আপনার কাজের অগ্রগতি কী, কোনো সমস্যা আছে কি না, অন্য কারও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন কি না কিংবা আলোচনায় আপনার কোনো প্রস্তাব আছে কি না—ছোট করে নোট করুন। পুরো বক্তব্য লিখে মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি মূল শব্দ সামনে থাকলেই কথা শুরু করা সহজ হতে পারে। হঠাৎ মতামত চাওয়া হলেও তখন একেবারে শূন্য থেকে ভাবতে হবে না।
মিটিংয়ের শুরুতেই একবার কথা বলুন
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ আলোচনায় যোগ দেওয়া আরও কঠিন মনে হতে পারে। তাই সুযোগ থাকলে মিটিংয়ের শুরুর দিকেই ছোট কিছু বলার চেষ্টা করুন। সেটি বড় কোনো মতামত হতে হবে না। নিজের কাজের একটি সংক্ষিপ্ত আপডেট দিতে পারেন, আগের আলোচনার সঙ্গে কোনো তথ্য যোগ করতে পারেন বা প্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন করতে পারেন। শুরুতেই একবার কথা বলা হয়ে গেলে পরেরবার আলোচনায় যোগ দেওয়া তুলনামূলক সহজ লাগতে পারে। অন্যদিকে ‘একেবারে নিখুঁত একটি পয়েন্ট পেলেই কথা বলব’ ভেবে অপেক্ষা করলে পুরো মিটিংই কেটে যেতে পারে।
কথা নিখুঁত করে তারপর বলার অপেক্ষা করবেন না
মাথার মধ্যে একটি বাক্য বারবার সাজাচ্ছেন। কোন শব্দ ব্যবহার করবেন, শুরুটা ঠিক হচ্ছে কি না, অন্যরা কী ভাববেন—এসব ভাবতে ভাবতেই অন্য কেউ একই কথা বলে ফেললেন। মিটিংয়ের কথোপকথন লিখিত প্রতিবেদন নয়। সেখানে প্রতিটি বাক্য নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন নেই। আপনার বক্তব্য পরিষ্কার হলেই যথেষ্ট। একটি সহজ কাঠামো অনুসরণ করতে পারেন। প্রথমে সমস্যাটি বা মূল বিষয়টি বলুন, এরপর প্রয়োজন হলে কারণ বা তথ্য দিন, শেষে আপনার প্রস্তাবটি জানান। এতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কথা দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাও কমে।
অন্যের কথার সূত্র ধরে শুরু করুন
নিজে থেকে নতুন প্রসঙ্গ শুরু করতে অস্বস্তি হলে অন্য কারও বক্তব্যের সঙ্গে নিজের পয়েন্টটি যুক্ত করতে পারেন। কোনো সহকর্মী একটি সমস্যা তুলে ধরলে তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক তথ্য যোগ করুন। কেউ কোনো প্রস্তাব দিলে আপনি সেটির আরেকটি দিক তুলে ধরতে পারেন। আবার কারও বক্তব্য পুরোপুরি বুঝতে না পারলে প্রশ্ন করাও আলোচনায় অংশ নেওয়ার একটি উপায়। সব সময় নতুন বা চমকপ্রদ কোনো ধারণা দিতে হবে, এমন নয়। ভালো প্রশ্ন করা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করা বা আলোচনাকে পরিষ্কার করাও মূল্যবান অংশগ্রহণ।
কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন না
বিশেষ করে অনেক মানুষের মিটিংয়ে ‘এবার নিশ্চয়ই কেউ আমাকে বলতে বলবেন’ ভেবে বসে থাকলে সেই সুযোগ নাও আসতে পারে। আলোচনা দ্রুত এগোলে কয়েকজন মানুষই বারবার কথা বলতে পারেন। কথার মাঝখানে কাউকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে একজনের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর ছোট বিরতি পেলে নিজের পয়েন্টটি তুলুন। অনলাইন মিটিং হলে হাত তোলার সুবিধা থাকলে সেটিও ব্যবহার করতে পারেন। কেউ আপনার আগে কথা শুরু করে ফেললে হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। পরের সুযোগটির জন্য নিজের বক্তব্যটি ধরে রাখুন।
নিজের জানা বিষয়ে প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না
মিটিংয়ে প্রশ্ন করলে অন্যরা ভাববেন আপনি বিষয়টি জানেন না, এমন ভয় থাকতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জায়গায় প্রশ্ন না করলে পরে ভুল বোঝাবুঝি আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দায়িত্ব, সময়সীমা বা প্রত্যাশা পরিষ্কার না হলে তখনই নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো। অনেক সময় আপনার যে প্রশ্নটি আছে, একই প্রশ্ন অন্যদের মনেও থাকতে পারে। তবে এমন তথ্য যা আগে থেকেই দেওয়া হয়েছে বা সহজেই দেখে নেওয়া সম্ভব, সেটি বারবার জিজ্ঞেস না করে মিটিংয়ের আগে প্রস্তুতি নেওয়াই ভালো।
মিটিংয়ের পর নিজের অংশগ্রহণ দেখুন
প্রতিটি মিটিং শেষে নিজেকে ‘আজও ভালো বলতে পারলাম না’ বলে বিচার না করে নির্দিষ্টভাবে দেখুন কী হয়েছে। অন্তত একটি প্রশ্ন করেছেন? নিজের কাজের আপডেট দিয়েছেন? একটি মতামত যোগ করেছেন? তাহলে সেটিও অগ্রগতি। পরের মিটিংয়ের জন্য ছোট লক্ষ্য রাখতে পারেন, অন্তত একবার কথা বলবেন। সেটি স্বাভাবিক হয়ে এলে দুইবার আলোচনায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করুন। এভাবে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
মিটিংয়ে ভালো করার অর্থ সবচেয়ে বেশি কথা বলা নয়। আবার শুধু কাজ জানলেই অন্যরা সব সময় আপনার ভাবনা বুঝে নেবেন, সেটিও নয়। আপনার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য, ভালো কোনো প্রশ্ন বা কার্যকর প্রস্তাব থাকলে সেটি সঠিক সময়ে তুলে ধরাও কাজেরই অংশ। তাই নিখুঁতভাবে বলার অপেক্ষা না করে ছোট ছোট সুযোগ থেকেই নিজের কথা বলার অভ্যাস তৈরি করুন।



