নওগাঁর প্যারা সন্দেশ: কালীতলা থেকে সারাদেশে

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির কথা বললে প্রথমেই যে নামটি মাথায় আসে তা হলো 'প্যারা সন্দেশ'। জেলার প্রায় সব দোকানেই এই মিষ্টি পাওয়া যায়।

তবে শহরের সবচেয়ে পুরোনো দোকানের খোঁজ করলে যে কেউ দেখিয়ে দেবে কালীতলার 'মা নওগাঁ প্যারা সন্দেশ'। দোকানের নাম ফলকে লেখা আছে শত বছরের পুরোনো দোকান। তবে কারও কারও দাবি, এই মিষ্টির দোকানের বয়স দেড়শ বছরের বেশি।

কালীতলায় শ্রী শ্রী বুড়াকালী মাতা মন্দিরের পাশেই দোকানটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বৈদ্য রতন দাস। প্রায় ৫৮ বছর বয়সী রতন কমপক্ষে ৩০ বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছেন।

এর আগেও তিনজন স্বত্বাধিকারীর তথ্য জানা যায়। এর মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দাস প্রায় ৩০ বছরের ব্যবসার পাট চুকিয়ে সুরেশ চন্দ্র দাস নামে ব্যক্তির দোকান বিক্রি করে দেন। তবে ময়রা বিমল মোহন্ত থেকে যান। রতন জানিয়েছেন, সুরেশ চন্দ্রই এই দোকানের নাম মা নওগাঁ প্যারা সন্দেশ রেখেছিলেন।

যতদূর জানা যায়, এই দোকানের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ধীরেন্দ্রনাথ দাসের বাবা মহেন্দ্রী দাসের হাতে। মুখে মুখে রয়ে গেছে সেই ইতিহাস।

জনশ্রুতি অনুসারে, মহেন্দ্রী দাস ছিলেন বিহারের এক নবাবের ময়রা। এক যুদ্ধে নবাব পরাজিত হলে প্রাণ বাঁচাতে তিনি দিনাজপুর হয়ে নওগাঁয় আসেন। এরপর নওগাঁয় প্যারা সন্দেশ তৈরি করেন। মহেন্দ্রীর মৃত্যুর পর তার ছেলে ধীরেন্দ্র দাস বাবার পেশায় হাত দেন। কালক্রমে এই মিষ্টির খ্যাতি বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

রতনের ছেলেও বেছে নিয়েছেন পৈত্রিক ব্যবসা। সৈকত দাস বলেন, 'আমার জানামতে, শহরের সবচেয়ে পুরাতন মিষ্টির দোকান এটাই। প্যারা সন্দেশের শুরুটাও এখান থেকে হয়েছিল। এখন আরও অনেক দোকানে প্যারা সন্দেশ বানায়। আমাদের দোকানের মূল খ্যাতি অবশ্য এই প্যারা সন্দেশের সুবাদেই। আরও কিছু মিষ্টি আমরা বানাই, তবে প্যারা সন্দেশটাই মূল।'

মিষ্টি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সৈকত বলেন, 'এই সন্দেশ বানানো সহজ। এক কেজি প্যারা সন্দেশ বানানোর জন্য প্রায় ছয় লিটার তরল দুধ লাগে। সাত লিটার হলে আরও ভালো। এর সঙ্গে এক কেজি চিনি যোগ করতে হয়। প্রথম ধাপে তরল দুধের সঙ্গে চিনি মিশায়ে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর তৈরি করা হয়। এরপর দুই হাতের তালু দিয়ে রোল করে সামান্য চাপ দিলেই তৈরি হয়ে যায় প্যারা সন্দেশ। প্রতিটি মিষ্টি প্রায় আধা ইঞ্চি চওড়া ও দুই ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে।'

প্রতিদিন প্রায় ১০০ কেজি মিষ্টি তৈরি হয় এই দোকানে। সৈকত আরও বলেন, 'আমাদের নিজেদের কারখানা আছে, সেখানেই বানানো হয়। বগুড়া, রাজশাহী, জয়পুরহাটের বিভিন্ন দোকানে পাইকারি দামে আমরা সন্দেশ সরবরাহ করি। প্যারা সন্দেশ সব সময়ই চলে, তবে পূজার সময় বিক্রি বাড়ে।'

প্যারা সন্দেশ এক সময় কেবলমাত্র নৈবদ্য হিসেবে বিক্রি হলেও এখন পূজা-পার্বণ ও অন্যান্য উৎসব-আনন্দে ক্রেতার পছন্দের তালিকায় থাকে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি।

নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক বলেন, 'আমরা তো বহু আইটেম বানাই। সেসবও খুব ভালো চলে। তবে এই মিষ্টির (প্যারা সন্দেশ) একটা আলাদা ঐতিহ্য, আলাদা খ্যাতি আছে। এ জন্য বাইরে থেকে কেউ এলে প্রথমেই প্যারা সন্দেশের খোঁজ করে।'