ইফতারে বেগুনি: অজান্তেই এক প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি গ্রহণ করছেন না তো?
রমজান মাসে ইফতারের টেবিল আমাদের সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা, সঙ্গে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি এসব মিলিয়েই যেন এক পরিচিত চিত্র। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর গরম গরম বেগুনির প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক। কিন্তু পুষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো—আমরা কি বুঝে খাচ্ছি, নাকি কেবল অভ্যাসের বশে কিংবা মুখরোচক বলে খাচ্ছি?
বিষয়টি নিয়ে জানব এমএইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুলের কাছ থেকে।
তিনি বলেন, ইফতারে আমরা সাধারণত খাবারের পরিমাণের দিকে খেয়াল করি না। বিশেষ করে ভাজাপোড়া খাবার অল্প দেখালেও ক্যালরি অনেক বেশি হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, ‘ভাত তো খাইনি, কয়েকটা বেগুনি খেলে তেমন কিছু হবে না।’ বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ ক্যালরি শুধু খাবারের ধরন দিয়ে নয়, তার প্রস্তুত প্রণালী দিয়েও নির্ধারিত হয়। রমজানে অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি ও হজমের সমস্যার অন্যতম কারণ।
একটি বেগুনির ভেতরের গল্প
একটি বেগুনির মধ্যে থাকে পাতলা স্লাইস করে কাটা বেগুন, বেসনের প্রলেপ এবং ডিপ-ফ্রাই করার সময় শোষিত তেল। এ ছাড়া চালের গুড়া ও কর্নফ্লাওয়ারও ব্যবহার করা হয়ে থাকে মচমচে করার জন্য।
গড়ে হিসাব করলে দেখা যায়—
- বেগুন থেকে আসে প্রায় ৩–৪ ক্যালরি
- বেসন থেকে আসে প্রায় ৩৫–৪০ ক্যালরি
- তেল থেকে আসে প্রায় ৪৫ ক্যালরি
অর্থাৎ একটি বেগুনি প্রায় ৮৫–৯৫ ক্যালরি সরবরাহ করে। সহজ করে বললে, একটি মাঝারি বেগুনি প্রায় ৯০ ক্যালরি। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—বেগুন নিজে কম ক্যালরিযুক্ত হলেও তেলই বেগুনিকে উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারে পরিণত করে।
একটি বেগুনির ক্যালরি তার আকার, বেসনের পরিমাণ ও তেল শোষণের ওপর নির্ভর করে ৮০–১২০ ক্যালরির মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। ডিপ-ফ্রাই করা খাবারের এনার্জি ডেনসিটি বেশি হওয়ায় একই পরিমাণ খাবারে বেশি ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যায়।
ভাতের সঙ্গে তুলনা করলে
বাংলাদেশে এক প্লেট রান্না করা ভাত সাধারণত ২৫০–৩০০ গ্রাম হয়ে থাকে। ৩০০ গ্রাম ভাত থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৩৮০–৪০০ ক্যালরি।
এক প্লেট ভাত ≈ ৪০০ ক্যালরি।
এখন যদি হিসাব করি,
৪০০ ক্যালরি ÷ ৯০ ক্যালরি ≈ ৪.৪
অর্থাৎ প্রায় ৪–৫টি মাঝারি বেগুনি খেলে আপনি এক প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি গ্রহণ করছেন।
ইফতারের বাস্তব চিত্র
ইফতারের সময় অনেকেই ৪–৬টি বেগুনি অনায়াসে খেয়ে ফেলেন। এর সঙ্গে থাকে পেঁয়াজু, ছোলা, মুড়ি, শরবত। ফলে শুধু বেগুনি থেকেই প্রায় ৩০০–৪০০ ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করছে। তারপর মূল খাবার (ভাত, রুটি বা বিরিয়ানি) তো আছেই।
ফলাফল দিনশেষে ক্যালরি গ্রহণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়। রোজা থাকায় দিনের বেলায় খাবার না খেলেও সন্ধ্যায় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
ক্যালরি সমান হলেও প্রভাব সমান নয়
ভাতের ক্যালরি মূলত কার্বোহাইড্রেট থেকে আসে, যা শরীরের প্রধান শক্তির উৎস। এতে ফ্যাটের পরিমাণ খুব কম। অন্যদিকে বেগুনির ক্যালরি আসে কার্বোহাইড্রেট (বেসন) ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফ্যাট (তেল) থেকে। আর ডিপ-ফ্রাই করা খাবার হজমে বেশি সময় নেয়। তা ছাড়া—
- অস্বস্তি ও গ্যাসের ঝুঁকি বাড়ায়
- রক্তে চর্বির মাত্রা বাড়াতে পারে
- দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি ও মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে
রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরকে ধীরে ধীরে খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দেওয়া উচিত। শুরুতেই অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার খেলে পাকস্থলীতে চাপ পড়ে।
তাহলে কীভাবে ভারসাম্য রাখবেন?
বেগুনি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সচেতনভাবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই হলো মূল কৌশল।
- ১–২টি বেগুনিতে সীমাবদ্ধ থাকুন
- ফল, শসা, টমেটো, ছোলা দিয়ে প্লেট ভারসাম্যপূর্ণ করুন
- সম্ভব হলে অল্প তেলে বা এয়ার ফ্রাই পদ্ধতিতে তৈরি করুন
- ইফতারের পর মূল খাবারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন
সচেতন ইফতার, সুস্থ রমজান
রমজানের মূল শিক্ষা সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। সেই শিক্ষা খাদ্যাভ্যাসেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখবেন, ইফতারে ৪–৫টি বেগুনি মানেই এক প্লেট ভাতের সমান ক্যালরি। তাই আনন্দের সঙ্গে ইফতার করুন, তবে জেনে-বুঝে। রমজানে সুস্থতাই হোক আমাদের লক্ষ্য।



