ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণসহ যেসব উপকার করে আমলকি
খাদ্যতালিকায় সহজলভ্য কিন্তু পুষ্টিগুণে অসাধারণ একটি ফল আমলকি। গ্রামবাংলার পরিচিত এই ফলটি আকারে ছোট হলেও উপকারিতায় বিশাল। টক স্বাদের এই ফলটি আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কাঁচা আমলকি, শুকনো আমলকি, আমলকির আচার কিংবা আমলকির রস—বিভিন্নভাবে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে জায়গা করে নিয়েছে আমলকি। শুধু স্বাদ নয়, রোগপ্রতিরোধ থেকে শুরু করে ত্বক, চুল ও হজমশক্তি ভালো রাখতেও আমলকির জুড়ি নেই।
দেশে-বিদেশে সুপারফুড হিসেবে পরিচিত এই ফলটির প্রতি দিনকে দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘সি’-এর প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে আমলকি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমলকি কেন এত উপকারী? প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আমলকি রাখলে শরীরে কী কী উপকার পাওয়া যায়? চলুন এ বিষয়ে জেনে নিই ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারের সিনিয়র পুষ্টিবিদ শরীফা আক্তার শাম্মির কাছ থেকে।
তিনি জানান, আমলকি এমন একটি ফল যা কাঁচা অবস্থায় যেমন উপকারী, তেমনি প্রক্রিয়াজাত করলেও এর পুষ্টিগুণ অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ থাকে। আমলকিতে থাকা ভিটামিন ‘সি’ তাপ সহনশীল হওয়ায় রান্না বা শুকানোর পরও এর কার্যকারিতা বজায় থাকে। এ ছাড়া এতে থাকা পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ট্যানিন যৌগ শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকি নিয়মিত খেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, হজমশক্তি উন্নত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে পারে।
আমলকির পুষ্টিগুণ কী কী?
আমলকি ভিটামিন ‘সি’-এর অন্যতম সমৃদ্ধ উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকিতে প্রায় ৪৫০–৬০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে, যা কমলা বা লেবুর চেয়েও বহু গুণ বেশি। এছাড়া এতে রয়েছে—
শক্তি: ৪৪ কিলোক্যালরি
পানি: ৮১–৮৩ গ্রাম
শর্করা: ১০.৫ গ্রাম
খাদ্যআঁশ: ৪.৩ গ্রাম
প্রোটিন: ০.৯ গ্রাম
চর্বি: ০.৬ গ্রাম
ভিটামিন এ: ২৯০ আইইউ
ভিটামিন ই: ০.১৬ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন): ০.০৩ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি২ (রাইবোফ্লাভিন): ০.০১ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি৩ (নিয়াসিন): ০.২ মিলিগ্রাম
ক্যালসিয়াম: ২৫ মিলিগ্রাম
আয়রন: ০.৩ মিলিগ্রাম
ফসফরাস: ২০ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম: ১৯৮ মিলিগ্রাম
এ ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল, ট্যানিন এই উপাদানগুলো মিলেই আমলকিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টিকর ফল হিসেবে পরিচিত করেছে।
আমলকির উপকারিতা
১. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
আমলকিতে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘সি’ শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত আমলকি খেলে সর্দি-কাশি, জ্বর ও মৌসুমি সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
২. হজমশক্তি উন্নত করে
আমলকিতে থাকা ফাইবার ও প্রাকৃতিক অ্যাসিড হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
৩. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
আমলকি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা ক্রোমিয়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।
৪. হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখে
আমলকির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) কমাতে সাহায্য করে। ফলে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
৫. ত্বক উজ্জ্বল ও সুস্থ রাখে
ভিটামিন ‘সি’ কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, যা ত্বক টানটান ও উজ্জ্বল রাখে। নিয়মিত আমলকি খেলে ব্রণ, দাগ ও বলিরেখা কমে।
৬. চুলের যত্নে কার্যকর
আমলকি চুলের গোঁড়া মজবুত করে, চুল পড়া কমায় এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। চুল পাকা রোধ করতেও আমলকির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
কম ক্যালরিযুক্ত ও ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় আমলকি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৮. লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়
আমলকি লিভার ডিটক্সিফিকেশনে সহায়তা করে। লিভারে জমে থাকা ক্ষতিকর টক্সিন বের করে শরীরকে সতেজ রাখে।
৯. চোখের স্বাস্থ্যে উপকারী
ভিটামিন ‘এ’ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং চোখের শুষ্কতা কমায়।
কাঁচা আমলকি না প্রক্রিয়াজাত—কোনটি ভালো?
কাঁচা আমলকি সবচেয়ে বেশি উপকারী। তবে যারা কাঁচা আমলকির টক স্বাদ সহ্য করতে পারেন না, তারা আমলকির রস, শুকনো আমলকি বা আমলকির মোরব্বা পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন। তবে অতিরিক্ত চিনি বা লবণ দিয়ে তৈরি আমলকি পণ্য নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
কারা সাবধান থাকবেন?
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বা অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির ক্ষেত্রে খালি পেটে আমলকি খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া কিডনিতে পাথরের সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত আমলকি খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদ পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে খাদ্যতালিকায় রাখবেন আমলকি?
- সকালে একটি কাঁচা আমলকি
- আমলকির রস পানির সঙ্গে মিশিয়ে
- সালাদে কুচি করা আমলকি
- শুকনো আমলকি গুঁড়ো করে হালকা পরিমাণে
সব মিলিয়ে, সহজলভ্য এই ফলটি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলে শরীর পায় বহুমুখী উপকার। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে আমলকি গ্রহণ সুস্থ জীবনের পথে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।



