সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে
শরীরের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় মুখের যত্ন নেওয়া বেশি জরুরি। নিয়মিত ব্রাশ করলে দাঁতে গর্ত (ক্যাভিটি) বা মাড়ির রোগ প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মুখের ভেতরের উপকারী জীবাণু ঠিক থাকে। তবে সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ না করলে মুখে নানা সমস্যা হয়।
অবশ্য প্রত্যেকের দাঁতের যত্ন নেওয়ার রুটিন আলাদা। কেউ খুব দ্রুত ব্রাশ করেন, আবার কেউ নিয়মিত ব্রাশ, ফ্লস ও মাউথওয়াশ ব্যবহার করেন। কিন্তু ডেন্টিস্টের কাছে খুব বেশি যাওয়া হয় না।
এখন প্রশ্ন হলো, দাঁত সুস্থ রাখতে আসলে কী করা উচিত?
বিবিসি সায়েন্স ফোকাস এই প্রশ্নটি করেছিল ডেন্টিস্ট ও ইফ ইউর মাউথ কুড টক বইয়ের লেখক ড. কামি হসের কাছে।
তিনি জানিয়েছেন, আমরা কোথায় ভুল করি এবং কীভাবে দাঁত ব্রাশ করা উচিত।
কীভাবে দাঁত ব্রাশ করা উচিত
আমাদের অনেকের সকালের রুটিন প্রায় এক রকম। ঘুম থেকে উঠে ফল, পরোটা, কফি, জুসের মতো অ্যাসিডিক খাবার খাই। তারপর সঙ্গে সঙ্গে দাঁত ব্রাশ করি। এরপর হয়তো মাউথওয়াশ ব্যবহার করি এবং ফ্লস করি।
আবার কেউ কেউ খাওয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করি। তারপর নাশতা করি।
কিন্তু ড. হস বলছেন, এই ক্রমটা ভুল।
তার মতে, সকালে নাশতার আগে দাঁতের যত্ন নেওয়ার সঠিক ধাপগুলো হলো অ্যালকালাইন (ক্ষারধর্মী) মাউথওয়াশ ব্যবহার, ফ্লস করা, জিহ্বা পরিষ্কার করার স্ক্র্যাপার ব্যবহার এবং সবশেষে ব্রাশ করা। হ্যাঁ, ব্রাশ সবার শেষে, শুরুতে নয়!
ড. হস বলেন, 'রাতে ঘুমের সময় দাঁতের ওপর প্লাক জমে যায়। মাউথওয়াশ সেই জমে থাকা খাবারের কণা ও প্লাক আলগা করে, যেন সহজে পরিষ্কার করা যায়।'
এরপর তিনি ফ্লস ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে ফ্লস বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলেন। কিছু ফ্লসে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক ওয়াক্স বা এমন উপাদান থাকে, যা মুখের জন্য ভালো নয়।
ড. হসের পরামর্শ, সিল্ক বা নাইলনের তৈরি ফ্লস ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।
এরপর আসে জিহ্বা পরিষ্কার।
'জিহ্বায়ও অনেক জীবাণু থাকে। এগুলো মুখে দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে এবং খাবারের স্বাদের অনুভূতি কমাতে পারে,' বলেন তিনি।
সবশেষে, হালকা ক্ষারধর্মী টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দেন তিনি।
কেমন মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত
অনেকে মনে করেন, মাউথওয়াশের কাজ হলো মুখের সব ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলা। কিন্তু ড. হস বলছেন, এটা দাঁতের জন্য আদৌ ভালো পদ্ধতি নয়। তিনি মুখকে তুলনা করেছেন একটি বাগানের সঙ্গে।
তার ভাষ্য, 'আপনার মুখ হলো বাগান আর ওরাল মাইক্রোবায়োম হলো সুন্দর ফুল ও গাছপালা। এখন আপনি কি পুরো বাগানে এসিড ঢেলে দেবেন, নাকি কেবল আগাছাগুলো তুলে ফেলবেন?'
খুব শক্তিশালী অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ মুখের ভালো ও খারাপ দু'ধরনের জীবাণুকেই মেরে ফেলে। এটি দাঁতের জন্য খারাপ।
ড. হসের পরামর্শ, অ্যান্টিসেপটিক নয়, বরং অ্যালকালাইন মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। তাহলে মুখের পিএইচ ঠিক থাকবে। কারণ মুখ অতিরিক্ত অ্যাসিডিক হয়ে গেলে দাঁতের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু সহজেই বেড়ে ওঠে।
দাঁতে ক্যাভিটি (গর্ত) কেন হয়
ড. হস ব্যাখ্যা করেন, মুখের পিএইচ যখন অ্যাসিডিক হয়ে যায়, তখনই দাঁতে ক্যাভিটি বা মুখের রোগ হয়।
স্বাভাবিক অবস্থায় মুখের পিএইচ ৭, যা বেশি অ্যাসিডিক না, আবার বেশি ক্ষারধর্মীও না। কিন্তু আমরা যখন খাই বা পান করি, তখন খাবার ও হজমকারী এনজাইমের কারণে পিএইচ প্রায় পাঁচ দশমিক পাঁচে নেমে যায়। তখন যেসব ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিডিক পরিবেশ পছন্দ করে তারা দ্রুত বাড়তে থাকে। অর্থাৎ খারাপ ব্যাকটেরিয়া বাড়তে থাকে।
এরা চিনি ও খাবার খেয়ে আরও অ্যাসিড তৈরি করে। তখন মুখ আরও বেশি অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে। এভাবে মুখের মধ্যে একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি হয়।
বিবিসি সায়েন্স ফোকাস বলছে, পিএইচ যখন পাঁচ দশমিক পাঁচে নামে, তখন দাঁতের এনামেলের খনিজ পদার্থ (হাইড্রোক্সি-অ্যাপাটাইট) গলতে শুরু করে। একে বলে ডিমিনারালাইজেশন।
তবে ভয়ের কিছু নেই। কারণ এই প্রক্রিয়া উল্টানো সম্ভব। খাওয়া বন্ধ হলে, ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে লালার সাহায্যে দাঁত আবার খনিজ ফিরে পায়।
ড. হস বলেন, কেউ যদি অতিরিক্ত বাজে খাবার না খায় এবং বারবার না খায়, তাহলে এই ক্ষয় ও পুনর্গঠনের মধ্যে ভারসাম্য থাকে। তখন আর ক্যাভিটি হয় না।
কিন্তু কেউ যদি অতিরিক্ত চিনি প্রসেসড খাবার, সহজ কার্বোহাইড্রেট, অ্যাসিডিক খাবার বেশি খায় বা ঘন ঘন খায়, তাহলে ক্ষয় বেশি হয়। তখন পুনর্গঠন কম হয় ও দাঁতে গর্ত তৈরি হয়, যাকে আমরা ক্যাভিটি বলি।


