পড়ালেখায় সন্তানের আগ্রহ বাড়ানোর ১০ কৌশল

রবিউল কমল
রবিউল কমল

শিশু যত বড় হয়, পড়ালেখা ও হোমওয়ার্কের দায়িত্ব তত নিজের কাঁধে নিতে হয়। কিন্তু অনেকে পড়ায় মনোযোগ বা আগ্রহ খুঁজে পায় না। শিশুদের জন্য এটা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। দেখা যায়, অনেক শিশু নিয়মিত ও সময়মতো হোমওয়ার্ক শেষ করতে পারে। আবার অনেকে অনীহা বোধ করে, পড়তে বসতে চায় না।

শিশুদের এ সমস্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন বাবা-মা। কিন্তু অভিভাবকের জন্য সন্তানের পড়াশোনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি হলেও, জোর করে পড়তে বসানো ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, জোর করা ও উৎসাহ দেওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।

সবচেয়ে ভালো হয় ইতিবাচক উপায়ে সন্তানের ভেতর আগ্রহ জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু জোর করে পড়াতে বসালে পড়ার প্রতি বিরক্তি তৈরি হয়।

শিশুদের মধ্যে কীভাবে পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যায় বা মনোযোগ বাড়ানো যায়, তা নিয়ে অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ থাকছে এই লেখায়।

কারণ খুঁজে বের করা

সন্তানের পড়ালেখার অনাগ্রহের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। শুরুতে সেই কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আর সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করতে পারলে সমাধান করাও সহজ হয়।

সম্ভাব্য কিছু কারণ হতে পারে—ঠিকমতো বুঝতে না পারা, সবকিছু একঘেয়ে লাগা, শেখার ধরন অনুযায়ী না পড়ানো, স্কুল নিয়ে দুশ্চিন্তা বা ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব।

সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা

পড়ার পরিবেশ যত সহজ হবে, সন্তানের অনীহা তত কমবে। এজন্য পড়ার জায়গার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

শান্ত জায়গা: যেখানে কোনো শব্দ বা মোবাইল-টিভির ঝামেলা নেই।
খাবার ও পানি: হালকা নাস্তা ও পর্যাপ্ত পানি মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: পেন্সিল, রাবার, ক্যালকুলেটর, খাতা সব হাতের কাছে রাখতে হবে।

আর সবকিছু প্রস্তুত থাকলে অজুহাত কমে যায়।

হোমওয়ার্ক পরিকল্পনা

সন্তানের জন্য একটি গঠনমূলক রুটিন বানাতে পারেন। প্রতিদিন কখন ও কীভাবে পড়বে তা জানা থাকলে ওদের মধ্য দায়িত্বশীলতা গড়ে উঠলে।

পরিকল্পনায় যা যা রাখতে হবে, প্রতিদিন কখন পড়বে, কতক্ষণ পড়বে, কখন ও কতক্ষণ বিরতি নেবে, কোন কাজ আগে করবে (যেগুলোর ডেডলাইন কাছাকাছি)।

পরিকল্পনা তৈরিতে সন্তানকে যুক্ত করুন। তাহলে সে মানতে আগ্রহী হবে।

চাপ কমালে পড়া সহজ হয়

চাপ বা দুশ্চিন্তায় থাকলে পড়ালেখায় মন বসে না। তাই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান, তার কথা শুনুন। পড়ার ফাঁকে বা পরে চাপ কমাতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এজন্য হেঁটে আসা, গান শোনা বা ছবি আঁকতে বলতে পারেন।

রেজাল্ট নয়, শিখবে আনন্দে

শুধু নাম্বার বা রেজাল্টের পেছনে না ছুটে ছোট ছোট সাফল্য উদযাপন করুন। তাহলে সন্তান আনন্দে শিখবে। যেমন কঠিন অঙ্ক নিজে নিজে সমাধান করলে বাহবা দিন। রচনা বা প্রজেক্টের খসড়া শেষ করলে ছোট কিছু উপহার দিন, হতে পারে চকলেট বা আইসক্রিম।

এতে শেখার আনন্দ বাড়ে এবং আগ্রহ তৈরি হয়।

ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করা

বড় কাজকে ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করে নিন। এতে কাজ সহজ লাগবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে। যেমন একদিনে একটি অধ্যায় পড়া, ২০ মিনিট নোট রিভিশন, বই থেকে ৫টি অনুশীলনী সমাধান ইত্যাদি।

ভিন্ন কৌশল

সব শিশু একভাবে শেখে না। কেউ দেখে শেখে, কেউ শুনে, কেউ লিখে। যে পদ্ধতিতে সন্তান স্বচ্ছন্দ বোধ করে না, তা বদলে নতুন কৌশল ব্যবহার করুন।

টানা পড়া নয়

একটানা পড়লে মনোযোগ কমে যায়, বিশেষ করে ছোটদের ক্ষেত্রে। তাই মাঝে মাঝে বিরতির সুযোগ করে দিন। এজন্য টাইমার ব্যবহার করতে পারেন, প্রতি ৩০ মিনিট পর বিরতির সুযোগ রাখুন। তবে বিরতি ৫–১০ মিনিটের বেশি দীর্ঘ হবে না।

শরীরচর্চায় উৎসাহ দিন

নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ কমে। তাই আপনার সন্তানকে খেলাধুলা ও ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করুন। এই যেমন পড়ার আগে বা বিরতিতে হালকা হাঁটা, বাইরে একটু খেলাধুলা। এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, মনও চাঙা থাকে।

পাশে থাকুন

সন্তানের সঙ্গে পজিটিভ সম্পর্ক বজায় রাখুন। সবসময় ওর পাশে থাকুন। তাহলে সে সাহস হারাবে না। দরকার হলে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলুন, বাড়তি সহায়তার ব্যবস্থা করুন, তাকে মন খুলে কথা বলার সুযোগ দিন এবং তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। আপনি পাশে থাকার মানে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

ওপরের পরামর্শগুলো মেনে চললে পড়ালেখাকে আর যুদ্ধ মনে হবে না। আর সবসময় মনে রাখবেন, অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু জোর করে শেখাতে যাবেন না। বরং সন্তানের ভেতর আগ্রহ তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি মনে হয়, কোনো বিষয়ে আপনার সন্তান বেশি পিছিয়ে পড়ছে, তাহলে বাড়তি সহায়তা নিতে দ্বিধা করবেন না।