এক্সপ্লেইনার

ভারতের ‘ককরোচ’ উড়ে গেল পাকিস্তানেও, বার্তা কী?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন দক্ষিণ এশিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

কয়েক দিনের মধ্যে কোটি কোটি অনুসারী পাওয়া এই অনলাইন আন্দোলন শুধু ভারতীয় তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অনাস্থার প্রতীক হয়েই ওঠেনি; বরং সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানেও একই ধরনের ‘ককরোচ’ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে।

পাকিস্তানে ইতোমধ্যে ‘ককরোচ আওয়ামী পার্টি’, ‘ককরোচ আওয়ামী লীগ’ এবং ‘মুত্তাহিদা ককরোচ মুভমেন্ট’ নামে একাধিক অনলাইন পেজ ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, এটি নিছক ইন্টারনেট মিম নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি ক্ষোভের নতুন ডিজিটাল ভাষা। আর সেই ভাষার প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ’—যে প্রাণীকে সাধারণত অবহেলা করা হয়, কিন্তু নির্মূল করা কঠিন।

ছবি: পার্টির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

যে মন্তব্য থেকে জন্ম

এই আন্দোলনের সূচনা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে কিছু বেকার যুবক ও অনলাইন কর্মীকে ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তিনি আসলে ভুয়া ডিগ্রিধারীদের বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়ে যায়।

এই ক্ষোভকে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক রূপ দেন অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণ ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে জনসংযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা এই তরুণ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি ভারতীয় তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

কে এই অভিজিৎ দীপকে?

অভিজিৎ দীপকে ভারতের পুনেতে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং বর্তমানে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক রিলেশনসে স্নাতকোত্তর করছেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ, ডিজিটাল ন্যারেটিভ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত তৈরির বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের আম আদমি পার্টির (এএপি) ডিজিটাল প্রচারণা টিমে কাজ করেন। বিশেষ করে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে মিমভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণায় তার ভূমিকা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, দীপকে নিজেকে কোনো প্রচলিত রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেননি। বরং তিনি বলেছেন, এই আন্দোলন তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

তার ভাষায়, ভারতের যুবসমাজ চাকরির সংকট, পরীক্ষা জালিয়াতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং মতপ্রকাশের সংকুচিত পরিবেশে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে।

ছবি: পার্টির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

‘ককরোচ’ কেন প্রতীক?

দলটির নামই আসলে একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। ‘ককরোচ’ এমন একটি প্রাণী, যাকে সবাই ঘৃণা করে, কিন্তু সহজে ধ্বংস করা যায় না। দীপকে এই প্রতীক ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন—রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানদের কাছে অবহেলিত তরুণরাই একসময় সবচেয়ে বড় প্রতিরোধশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

দলটির স্লোগানও ব্যঙ্গাত্মক: ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস’। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে। সদস্য হওয়ার শর্তও ছিল ব্যঙ্গপূর্ণ—বেকার হতে হবে, দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা অনলাইনে থাকতে হবে, পেশাদারভাবে অভিযোগ করতে জানতে হবে ইত্যাদি।

তবে এই ব্যঙ্গের আড়ালে ছিল গুরুতর রাজনৈতিক বার্তা। তাদের ঘোষণাপত্রে বলা হয়: প্রধান বিচারপতিদের অবসরের পর রাজ্যসভায় পদ দেওয়া যাবে না, ভোট কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি থাকতে হবে, নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ, করপোরেট মালিকানাধীন মিডিয়ার লাইসেন্স বাতিল এবং দলবদলকারী সংসদ সদস্যদের ২০ বছর নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা।

বিজেপিকেও ছাড়িয়ে গেল সিজেপি

দ্য ইকোনমিক টাইমস বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির উত্থান বিস্ময়কর। কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারী সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

এই দ্রুত জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে। কারণ এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের তরুণদের বড় অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থাশীল এবং তারা বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি সরাসরি রাজনৈতিক শক্তি না হলেও এটি ভারতীয় রাজনীতিতে ডিজিটাল প্রতিবাদের নতুন ধারা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মিম, ট্রল, ব্যঙ্গ ও রিলস—এসব এখন রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

পাকিস্তানে কেন ছড়িয়ে পড়ল?

ভারত থেকে পাকিস্তানে এই আন্দোলনের বিস্তারকে অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

পাকিস্তানের তরুণদের মধ্যেও বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, সেনা-প্রভাবিত রাজনীতি এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। ফলে ভারতীয় তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ পাকিস্তানি তরুণদের কাছেও পরিচিত ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

পাকিস্তানে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ আওয়ামী পার্টি’ নিজেদের পরিচয় দিয়েছে ‘যুবকদের রাজনৈতিক ফ্রন্ট’ হিসেবে। আরেকটি পেজের বায়োতে লেখা হয়েছে: ‘যাদের সিস্টেম ককরোচ মনে করেছে, আমরা সেই জনগণের কণ্ঠস্বর।’

এই ভাষা আসলে রাষ্ট্রীয় অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও তরুণদের হতাশা, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা অনেকটা একই।

ছবি: এক্স (সাবেক টুইটার) থেকে নেওয়া

পাকিস্তানি অনুসারীদের নিয়ে বিতর্ক

সিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে যে দলটির বড় অংশের অনুসারী পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশ থেকে এসেছে। কেউ কেউ দাবি করেন, এতে বিদেশি বট অ্যাকাউন্টও থাকতে পারে।

ভারতের বিজেপি-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, এই আন্দোলনের পেছনে ‘পাকিস্তানি প্রভাব’ রয়েছে। বিজেপি নেতা তাজিন্দর বাগ্গা পর্যন্ত এটিকে ‘পাকিস্তান জনতা পার্টি’ বলে কটাক্ষ করেন।

এর জবাবে অভিজিৎ দীপকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দাবি করেন, তাদের ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ অনুসারী ভারতীয়। তার প্রশ্ন ছিল, ‘আপনারা কেন ভারতের ৯৪ শতাংশ তরুণকে পাকিস্তানি বলছেন?’

পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে দীপকের বার্তা কী?

অভিজিৎ দীপকের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি অনুসারীদের সরাসরি শত্রু হিসেবে দেখছেন না। বরং তিনি বারবার জোর দিয়েছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের সমস্যাগুলো অভিন্ন।

যখন তাকে পাকিস্তানি অনুসারীদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি মূলত দুটি বার্তা দেন।

প্রথমত তিনি বলেন, তরুণদের ক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো ভুল। তার মতে, বেকারত্ব, হতাশা ও রাজনৈতিক অনাস্থা বাস্তব সমস্যা, যেগুলোকে ‘বিদেশি প্রভাব’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত, তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রতিবাদ সীমান্ত মানে না। পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে কেউ এই আন্দোলনের পোস্ট দেখলে বা সমর্থন করলে সেটি স্বাভাবিক, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই এক।

তিনি সমালোচকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘৯৪ শতাংশ ভারতীয় তরুণকে পাকিস্তানি বলা হচ্ছে কেন?’—এই বক্তব্যের মধ্যেই তার রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। অর্থাৎ, সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো তরুণদের অসন্তোষকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখাতে চাইছে, অথচ এটি আসলে দেশের ভেতরের বাস্তব ক্ষোভ।

রাষ্ট্রীয় চাপ ও সেন্সরশিপ বিতর্ক

সিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ার পর তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ভারতে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে দীপকে ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করেন।

এরপর তিনি অভিযোগ করেন, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে এবং ওয়েবসাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ বলেও অভিযুক্ত করেন।

দ্য ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, এই ঘটনাগুলো আরও বেশি তরুণকে সিজেপির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। কারণ, অনেকের কাছে এটি এখন শুধু মিম নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন।

দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রতিবাদ-সংস্কৃতি

বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছে। এখানে প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তৃতার বদলে মিম, ট্রল, ব্যঙ্গ ও হাস্যরস রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ভারত থেকে পাকিস্তানে এই আন্দোলনের ছড়িয়ে পড়া দেখিয়ে দেয়, সীমান্ত আলাদা হলেও দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের হতাশা অনেকটাই এক। চাকরির সংকট, রাজনৈতিক অনাস্থা, দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা অভিন্ন।

এই বাস্তবতায় ‘ককরোচ’ হয়ে উঠেছে অবহেলিত তরুণদের প্রতীক। যাদের সমাজ ও রাষ্ট্র তুচ্ছ করে, তারাই নিজেদের ‘ককরোচ’ পরিচয়ে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে। আর সেই ভাষাই এখন ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল প্রতিবাদের নতুন রূপ হয়ে উঠেছে।