ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে কারা?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে যুদ্ধ শুরু ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ।

বর্তমানে আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের পথ হিসেবে আবারও সামনে এসেছে কাতার। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরব।

যুদ্ধ বন্ধে ইতোমধ্যে কাতারের একটি আলোচক দল তেহরানে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইরান সফর করছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও।  

আজ শুক্রবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।

কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে যারা

যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই সক্রিয় হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের বরাতে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তিন মিত্র দেশের নেতারা পৃথকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন।

তারা বলেন, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। ট্রাম্পের কাছে তারা আলোচনার সুযোগ চেয়েছেন।

এদিকে এক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, যুদ্ধ বন্ধ ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে একটি চূড়ান্ত সমঝোতা তৈরির লক্ষ্যে আজ শুক্রবার তেহরানে গেছে কাতারের একটি প্রতিনিধিদল।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই দলটি ইরানে গেছে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতার ভূমিকা থেকে দূরে ছিল কাতার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কেন আবারও মধ্যস্থতা করতে চায় কাতার

রয়টার্স জানায়, ইরানের হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাস লাফান এলাকায় হামলার কারণে দেশটির প্রায় ১৭ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা কমে গেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, যার বড় অংশই ছিল কাতারের।

এ অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও অর্থনীতি আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইরান সফরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

পাকিস্তানের ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি সফরে আজ ইরানে রওনা হয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির।

এ সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক শান্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে তার।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্ল্যান বি’

সুইডেনে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

সুইডেনে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আমি এটিকে অতিরঞ্জিতও করতে চাই না, আবার খাটোও করতে চাই না। আরও কাজ বাকি আছে। আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাইনি। তবে আশা করছি, পৌঁছাতে পারব।’

ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ওপর ইরানের শুল্ক আরোপের পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন রুবিও।

তিনি বলেন, ‘আমরা খুব কঠিন একপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছি। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে প্রেসিডেন্টের হাতে অন্য বিকল্পও রয়েছে।’

রুবিও আরও বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ প্রয়োজন হবে।

যা বলছে ইরান

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্স জানান, এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। তবে দু’পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। একইসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় দেশটি।

এ যুদ্ধের প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে এবং জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।  

গত ৮ এপ্রিল একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যেকোনো সময় ফের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ইরানের বন্দরগুলো চাপে রয়েছে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।