ইউরেনিয়াম দেশেই রাখার নির্দেশ খামেনির, ট্রাম্পের শর্ত প্রত্যাখ্যান

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনার প্রধান শর্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করল ইরান।

ইরানের শীর্ষস্থানীয় দুটি সূত্রের বরাতে আজ বৃহস্পতিবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতার এই কড়া অবস্থানের কারণে শান্তি আলোচনা এবং যুদ্ধ অবসানের প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ইরানের কাছে থাকা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অবশ্যই দেশটির বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইরানের সঙ্গে যেকোনো শান্তিচুক্তিতে এই শর্ত থাকতে হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

ইসফাহানে নিউক্লিয়ার টেকনোলজি সেন্টার। ছবি: সিএসআইএস থেকে নেওয়া

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে এ বিষয়ে সাফ জানিয়েছিলেন, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণ অপসারণ, মিত্র বা প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার স্পষ্ট নির্দেশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঐকমত্য হলো—সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোনো অবস্থাতেই দেশ থেকে বের করা যাবে না।’

তেহরানে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি সম্বলিত একটি ব্যানার। ৮ মে, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো হলে ভবিষ্যতে আরও হামলার ঝুঁকিতে পড়বে দেশটি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি হোয়াইট হাউস ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যেও সংঘাত শুরু হয়।
 

বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। শান্তি আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধ এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরানের দুই সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের মধ্যে গভীর সন্দেহ রয়েছে যে যুদ্ধবিরতি আসলে ওয়াশিংটনের একটি কৌশল। নতুন করে বিমান হামলা শুরু করার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এটি করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের প্রধান শান্তি আলোচক বাঘের গালিবাফ গতকাল বুধবার বলেন, ‘শত্রুর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

ইরানের প্রধান শান্তি আলোচক বাঘের গালিবাফ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ট্রাম্পও হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘ইরান শান্তিচুক্তিতে রাজি না হলে আরও বড় ধরনের হামলা চালাতে প্রস্তুত ওয়াশিংটন।’

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্রগুলোর তথ্য মতে, কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমাতে শুরু করেছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।

ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভবিষ্যতে আর হামলা চালাবে না—এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা পাওয়া।

তাদের মতে, এসব নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে রাজি ইরান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অর্ধেক মজুদ বিদেশে পাঠাতে রাজি হয়েছিল ইরান।

কিন্তু ট্রাম্পের একের পর এক হামলার হুমকির পর অবস্থান পরিবর্তন করে তেহরান।

এ বিষয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনার মতো বিকল্প পথের কথা ভাবছে ইরান।

আইএইএ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল।

বর্তমানে এর কতটুকু অক্ষত আছে তা স্পষ্ট নয়।