এক্সপ্লেইনার

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবারও ‘মুসলিম ফ্যাক্টর’?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘বাবা, পায়ে ধরি বাবা, আমারে বাঁচাও, বাবা’—এমন আর্তি নিয়ে এক বৃদ্ধা পড়ে যান তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিকের পায়ে। কান্নায় ভেঙে পড়া সেই নারীর পদবি মণ্ডল। তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ।

গত ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত ভারতীয় গণমাধ্যম ‘সংবাদ প্রতিদিনের’ এক ভিডিও প্রতিবেদনে এমন দৃশ্য দেখা গেল।

ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ‘এসআইআর’ থেকে কাদের নাম বাদ গেল?—এমন তথ্য-সম্বলিত প্রতিবেদনটিতে দেখা গেল ‘বেঁচে থাকার’ এই আর্তি শুধু একজনের নয়। লাখো মানুষের।

জানা গেল—এমনও পরিবার আছে, স্বামী বিদেশে। তাই তার নাম নেই ভোটার তালিকায়। এমনও পরিবার আছে—মায়ের নাম ভোটার তালিকায়, অথচ বাবার নাম বাদ।

অন্য এক পরিবারে বাবার নাম আছে; কিন্তু মায়ের নাম নেই। ভাইয়ের নাম আছে তো বোনের নাম নেই; বোনের নাম আছে তো ভাইয়ের নাম নেই। আবার ভাইয়ের নাম আছে তো ভাইয়ের স্ত্রীর নাম নেই।

কোথাও বোনের নাম আছে তো বোনের স্বামীর নাম নেই।

এ ছাড়াও, একটি ৫ সদস্যের পরিবারে মা-বাবাসহ ৪ জনের নাম আছে। কিন্তু, বাদ পড়েছেন একজন।

ভোটার তালিকায় বাদ পড়া মানুষদের আতঙ্ক-আক্ষেপ-আর্তনাদ শোনা গেল ‘সংবাদ প্রতিদিনের’ সেই প্রতিবেদনটিতে।

ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়ায় হিন্দু মতুয়াদের অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোয়। সেসব প্রতিবেদনে এটাও জানানো হয়—এই মতুয়াদের নাম বাদ যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশটির খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

শুধু হিন্দু মতুয়া নয়, সংখ্যালঘু মুসলমানসহ অন্যান্যদের নাম বাদ পড়েছে নতুন ভোটার তালিকায়।
ভারতের নির্বাচন কমিশন একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যেসব নথিপত্র জমা দেওয়ার কথা বলেছে, সেগুলো জমা দেওয়ার পরও ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ যাচ্ছে।

কেন নাম বাদ যাচ্ছে এর কারণ কেউ বলছে না—এমনও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

গত ১৯ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ভোটে ব্রাত্য হয়ে কাগজই খুঁজে চলেছেন রব্বানিরা’। এতে বলা হয়, মুফতি মহম্মদ গোলাম রব্বানির নাম ছিল ২০০২ সালের ভোটের তালিকায়। কিন্তু, তার বাকি সব কাগজপত্রে ‘মুফতি’ শব্দটি নেই। যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির ফাঁদে আটকে গিয়ে প্রথমে ‘বিচারাধীন’ তালিকায়। তার পরে বাতিল।

এসব চলছে পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ‘ক্ষোভ’, ‘সংকট’।

গত ১৩ এপ্রিল বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটার ৭ কোটি ৬০ লাখ। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এটি মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৯৪ আসনের বিধানসভা নির্বাচন।
ফল জানা যাবে ৪ মে।

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
তৃণমূলের ‘তুরুপের তাস’।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গে ‘মুসলিম’ ইস্যু বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ও পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী বিজেপির মূল চাওয়া ‘মুসলিমপ্রেমী মমতার বিদায়’ তথা কলকাতায় ‘শাসক দলের পরিবর্তন’।

বিজেপির শীর্ষ নেতা থেকে পাড়া-মহল্লার সমর্থক অনেকের অভিযোগ—প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী মুসলমান ও রোহিঙ্গারা এসে পশ্চিমবঙ্গ ‘ছেয়ে ফেলেছে’। তাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকায় এর বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে তৃণমূল। এই সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোটে তৃণমূল বারবার বিজয়ী হচ্ছে।

ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে ‘ঘুসপেটিয়া’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটিও ব্যাপকহারে ব্যবহার করছে বিজেপি।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন নগরীর শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের খেতমজুরও।

অনেকের আক্ষেপ—সব দিক থেকে একজন ভারতীয় হয়েও ভোটের তালিকায় নাম না থাকা ভীষণ লজ্জার। এই লোকলজ্জা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

নিজের বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ও ভোটার তালিকায় নাম তুলতে সাধারণ মানুষজনকে আদালত পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। তারা একে ‘হেনস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

যাদের নাম ভোটার তালিকায় নাম নেই, তাদেরকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। বন্দি শিবিরে রাখা হবে—এমন হুমকিও নাকি দেওয়া হচ্ছে ভুক্তভোগীদের।

এই বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন তৃণমূল ক্রমাগত অভিযোগ তুলছে বিজেপির বিরুদ্ধে।

তৃণমূলের দাবি—বিজেপির কারণেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়েছে। তারা মূলত ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে চায়। কিন্তু, এখন হিন্দু-মুসলমান সবারই নাম বাদ পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—গত নির্বাচনে বিজেপি যেসব আসনে ৫ থেকে ১০ হাজার ভোটে হেরে গিয়েছিল সেসব আসনে ভোটারের নাম কাটা গেলে তা বিজেপিকে লাভবান করবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু, এই নাম কাটা যাওয়ার ঘটনাগুলো বিজেপির জন্য ‘হিতে বিপরীত’ হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।

গত ১৬ এপ্রিল সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জয়ন্ত ঘোষাল এক পডকাস্টে বলেন, ভোটার তালিকাকে ঘিরে পরিস্থিতি যা হয়েছে তাতে বলা যায় যে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট এক জোটে তৃণমূলের কাছে চলে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘সবার চাকরি হয়ে যাবে’—এমন বয়ান প্রচার করা হচ্ছে।
তার প্রশ্ন—‘তাহলে (দেশে) এত লোকের চাকরি নেই কেন?’

জয়ন্ত ঘোষাল মনে করেন, ‘বিজেপি বাঙালিদের ভালোবাসতে পারছে না। তাদের অপমান করছে। ছোট করছে। এখন আরও নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে, মুসলমান ভোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে যাচ্ছে না।’

বিজেপিকে ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোট নিয়ে লড়াই করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক।

প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে বিজেপি এবারের বিধানসভা নির্বাচনে একজন মুসলিম প্রার্থীও দেয়নি। তারা শাসকদলের সমালোচনা করতে গিয়েও মুসলিমবিরোধিতাকেই সামনে নিয়ে আসছে।

বিজেপি বলছে—হিন্দুদের জন্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তৎকালীন যুক্তবঙ্গকে ভেঙে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি করলেন; সেই পশ্চিমবঙ্গেই হিন্দুরা ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে।

বিজেপি শীর্ষ নেতাদের টকশো দেখে জানা যায়, তারা পশ্চিমবঙ্গকে ‘মিনি বাংলাদেশ’ বা ‘মিনি পাকিস্তান’ হওয়া থেকে ঠেকাতে জোরদার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

এই ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটকে অনেকে মমতার ‘তুরুপের তাস’ বলেও মন্তব্য করছেন।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন—বিজেপি এতটাই মুসলিমবিরোধী বয়ান ছড়াচ্ছে যে, মুসলমানদের কেউ কেউ বর্তমান শাসকদলের পরিবর্তন চাইলেও বাস্তবতা তাদেরকে তৃণমূলের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।


বিজেপির ‘বাজি’


২০২১ সালের বদলা নিতে চায় বিজেপি। সেবছর তা ২০০ আসনের বেশি নিয়ে সরকার গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করে দলটি পেয়েছিল ৭৭ আসন। সেবছর তাদের এমন পরাজয়ের জন্য হাসি-ঠাট্টায় পড়তে হয়েছিল।

সম্প্রতি, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে বিজেপি জোটের বিজয় তাদেরকে ‘চাঙ্গা’ করেছে।

রাজ্য বিজেপির নেতারা বলছেন—বিজেপি মানে উন্নয়ন। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকার আসছে।

‘সংখ্যালঘুরাই ধর্মকে ইস্যু করে। তাদের কারণেই “সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক” পরিভাষাটি সৃষ্টি হয়েছে।

সংখ্যাগুরুদের ক্ষেত্রে “ভোটব্যাংক” ব্যবহার করা হয় না,’ দাবি বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের। তিনি একসময় রাজ্য বিজেপির সভাপতি ছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান মুখ বা নির্বাচনে বিজয়ী হলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন—তা নিশ্চিত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২৯৪ আসনেই তিনি ‘প্রধান মুখ’। তিনি ভোটারদেরকে তার কথা মাথায় রেখে বিজেপির প্রতীক ‘পদ্মফুলে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তাই বিজেপি বিজয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা।

এর আগে তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার প্রতিটি আসনেই ‘তার মুখের’ প্রচার করেছিলেন। অর্থাৎ, প্রতিটি আসনেই তার কথা মনে রেখে জনগণ ভোট দেবে বলে প্রত্যাশা করেন।

গত ১৩ এপ্রিল প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘আজ তক বাংলা’-র এক ভিডিও প্রতিবেদনে বিজেপি নেতা শুভেন্দুকে বলতে শোনা যায়—‘প্রতিটি হিন্দু গ্রামে বিজেপি, তৃণমূল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু, কোনো মুসলিম গ্রামে বিজেপির ঝাণ্ডা দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ তারা সরকারের সব সুবিধা নেয়।’

শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। মমতার মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন তিনি।

শুভেন্দুর ভাষ্য: তৃণমূল বিভাজনের রাজনীতি করছে। তাই তিনি ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ করতে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা।

২০২১ সালে শুভেন্দু তার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনে প্রধানমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন। এবার তিনি নন্দীগ্রামের পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এলাকা ভবানীপুর থেকেও নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। এই ভবানীপুরে শুভেন্দুর প্রধান প্রতিপক্ষ তার এক সময়ের ‘নেত্রী’ তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা।

এবারও তিনি মমতাকে পরাজিত করার ইচ্ছা পোষণ করছেন।

শুভেন্দু মনে করেন, গত ৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। দুর্নীতি, হত্যা-রাহাজানি বেড়েছে। 

রোজগারের জন্য যুবকরা রাজ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।

তার মতে—পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এবার বিজেপিতেই ভরসা রাখছে।

অনেক হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি হিসেবে মুসলমানদের দেখা যাচ্ছে, উল্লেখ করে এই বিজেপি নেতা আরও বলেন, ‘শিক্ষিত মুসলমানরা এসব করে না। তাই শিক্ষিত মুসলমানদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।’

আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্ব দূর, তুষ্টিকরণ বন্ধ, নারী সুরক্ষা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও জানান এই বিরোধীদল নেতা।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কোনো মুসলমান প্রার্থী দেয়নি। এমনকি, ‘মুসলিম ভোটের প্রয়োজন নেই’ বলেও বিভিন্ন সময় রাজ্য বিজেপির নেতাকর্মীদের বলতে শোনা গেছে।

তাই বিজেপির এমন ‘বাজি’ কতটা সাফল্য আনতে পারে আগামী ৪ মে তা দেখা যাবে।


ভবানীপুর কি ‘কুরুক্ষেত্র’
 

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা উত্তম কুমার, সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র—এমন আরও অনেক সুপরিচিত মানুষের বাস ছিল ভবানীপুরে।

ভবানীপুর কলকাতার অন্যতম অভিজাত এলাকা। এই কেন্দ্রের বিধায়ক বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নানা ভাষাভাষী ও ধর্মমতের মানুষ ভবানীপুরে থাকেন বলে এই এলাকাকে ‘মিনি ভারতবর্ষ’ বলেও সমীহ করা হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় ভবানীপুর আসনটিকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বলে প্রচার করা হচ্ছে। ‘ভোটার প্রতিক্রিয়া’ অনুষ্ঠানগুলোয় স্থানীয়দের ‘দিদির প্রত্যাবর্তন’ ও ‘দিদির পরিবর্তন’—উভয়ই প্রত্যাশা করতে শোনা যাচ্ছে।

Mamata Banerjee, Bhabanipur Election 2026, Suvendu Adhikari, Voter List Deletion, SIR Process, Narendra Modi, Bishnupur Rally, Women Reservation Bill, West Bengal Assembly Election, TMC vs BJP, Minority Votes, Bhabanipur vs Nandigram
ভবানীপুরে সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: স্টেটসম্যান

অর্থাৎ, একদল বলছেন যে তারা তাদের এই সম্মানজনক আসনে বর্তমান বিধায়ক ও মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই আবারও দেখতে চান। অপরপক্ষ বলছে, মানুষ ‘নতুন মুখ’ খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের অনেকে ভবানীপুর আসনটিকে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের মমতা ও বিজেপির শুভেন্দুর জন্য ‘কুরুক্ষেত্র’ বলে মন্তব্য করছেন।

কেননা, মুখ্যমন্ত্রী মমতার একমাত্র আসন ভবানীপুর। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীর দুই আসনের একটি ভবানীপুর, অন্যটি নন্দীগ্রাম। শুভেন্দু একটিতে হেরে গেলে আরেকটিতে জেতার সুযোগ থাকছে।

কিন্তু, একমাত্র আসনটিতে মমতা হেরে গেলে এর প্রভাব তৃণমূল তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়বে।

এক বিজেপি সমর্থকের বক্তব্য: ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে নিজেকে “বাংলার মেয়ে” বলতেন। এখন বলছেন, “ভবানীপুরের মেয়ে”—এ থেকেই বুঝে নিন, তার কী অবস্থা?’

অন্যদিকে, এক তৃণমূল সমর্থকের প্রশ্ন—‘শুভেন্দু কে?’

মনে রাখা দরকার—গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। পরে ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ধরে রাখেন মমতা।

এবার কার ভাগ্যে কী ঘটে তা দেখার বিষয়।
 

ছোট দলের বড় ভূমিকা?
 

রাজ্য কংগ্রেসের নেতা ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী অধীর রঞ্জন চৌধুরী মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ক্রমাগত বাড়ছে। গত ১৬ এপ্রিল জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এই নেতা বলেন, ‘বাংলা এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে আক্রান্ত।’

রাজ্যের সব কৃষকদের ফসল বীমার আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী।
কংগ্রেসের নেতা ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী অধীর রঞ্জন চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

তার দাবি, দিদি (মমতা) ও নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিশ্রান্ত।

এই দুই প্রধান দলের প্রতি বিরক্ত ভোটাররা কংগ্রেস বা বাম দলগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটারদের অনেককেও এমনটিই বলতে শোনা যাচ্ছে।

তবে দীর্ঘদিনের শাসক দলকে বদলানো ও হিন্দুত্ববাদী বিজেপির হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষায় ছোট দলগুলোর যে বড় ভূমিকা রাখতে পারতো তা বর্তমান তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণের ফলে সম্ভব হচ্ছে না বলেও মনে করছেন একাংশ।

কারও আশা—২০২১ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি কোনো আসন না পেলেও এবার তাদের ‘খাতা খোলার’ সম্ভাবনা আছে। তবে, সরকার গঠনের মতো অবস্থানে তারা নেই, বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন—একটি নির্বাচনে সাধারণত মূল আলোচনার বিষয় থাকে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলাতে ব্যর্থ সরকার, ইত্যাদি।

অথচ, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূলকে সরাতে বিজেপি মূলত ‘মুসলিম ফ্যাক্টর’কেই সামনে তুলে আনছে। তারা ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধ’কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেল—বিজেপির নেতাকর্মীরা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতার ‘মুসলিমপ্রীতি’র বিরোধিতাকেই তাদের নির্বাচনী প্রচারণার ‘মূল বাণী’ হিসেবে তুলে ধরছেন।

এসব থেকে বের হয়ে ‘পরিবর্তনের’ ডাক দিতেও শোনা গেল তৃণমূল-বিজেপিবিরোধীদের।
 

উপসংহার


২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ছিল ৯ কোটির বেশি। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১০ কোটির বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১১ সালের হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু প্রায় ৭১ শতাংশ, মুসলিম প্রায় ২৭ শতাংশ।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সংখ্যা বেড়ে ৩০ শতাংশ হতে পারে।

২০১১ সালের হিসাব থেকে আরও জানা যায়—পশ্চিমবঙ্গের তখন জেলা ছিল ১৯টি। এখন বেড়ে হয়েছে ২৩টি।

২০১১ সালের তথ্য অনুসারে—মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় মুসলিমদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় হিন্দু-মুসলিম প্রায় সমান সংখ্যক। বীরভূম ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় মুসলিম ৩৫ শতাংশের বেশি।

এ ছাড়াও, ৬ জেলায় মুসলিমদের সংখ্যা ২৫ শতাংশের ওপরে।

এমন বাস্তবতায় গত বিধানসভার মতো আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও ‘মুসলিম ফ্যাক্টর’ কতটা নিয়ামকের ভূমিকা নেয়, তা দেখা যাবে ৪ মের ফলাফলে।