বিপিসির এলপিজি আমদানি এখনই সংকট কাটাতে পারবে না

মোহাম্মদ সুমন
মোহাম্মদ সুমন

দেশজুড়ে রান্নার গ্যাসের সংকট এবং অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির মুখে সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) জিটুজি (সরকার টু সরকার) ভিত্তিতে এলপি গ্যাস আমদানির অনুমতি দিয়েছে। সরকার আশা করছে, এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা দূর হবে এবং সংকট কাটবে।

তবে বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এখনই এই উদ্যোগ স্বস্তি আনবে এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, এলপিজি পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত লাইটারেজ জাহাজ এবং ডেডিকেটেড জেটি বিপিসির নেই। এই লজিস্টিক ঘাটতির কারণে এখনই আমদানি শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

এত দিন দেশে এলপিজি আমদানির পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমান ব্যবস্থায় বিপিসি কেবল বাল্ক বা খোলা আকারে এলপিজি আমদানি করতে পারবে, যা পরে বেসরকারি অপারেটররা তাদের টার্মিনালে সিলিন্ডারজাত করে বাজারে ছাড়বে। বিপিসি সরাসরি খুচরা বিক্রি বা সিলিন্ডারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবও দায়ী। কিন্তু সরকার সরবরাহের দিকেই বেশি জোর দিচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা আগে কখনো এভাবে এলপিজি আমদানি করিনি, তাই আমাদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা আমদানি করলেও তা সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করব না। সেই বেসরকারি কোম্পানিগুলোই বিতরণ করবে, যারা এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তারা চাইলেই সরবরাহ ও দামে প্রভাব খাটাতে পারবে।'

অনুমতি মিললেও শর্ত জুড়েছে মন্ত্রণালয়

বিপিসি সূত্র জানায়, গত ১০ জানুয়ারি এলপিজি আমদানির অনুমতি চায় সংস্থাটি। ১৮ জানুয়ারি মৌখিক সম্মতির পর গত মঙ্গলবার লিখিত অনুমোদন দেয় জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তবে এতে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

শর্ত অনুযায়ী, আমদানির পরিমাণ, পেমেন্ট পদ্ধতি, খালাস ও বিতরণের পরিকল্পনা এবং অপারেটর চূড়ান্ত করতে বিপিসিকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে।

জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারকে আমদানি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, 'সরকার যুক্ত হলে বাজার তদারকি সহজ হবে এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যাবে।'

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক ও অপারেশন) মণি লাল দাশ জানান, তারা ইন্দোনেশিয়া, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, 'যারা কম দাম ও দ্রুত সরবরাহের প্রস্তাব দেবেন, আমরা তাদের সঙ্গে এগোব।'

তবে তিনি স্বীকার করেন, এলপিজি খালাসের জন্য কুতুবদিয়ার আউটার অ্যাংকরেজ থেকে বিশেষায়িত লাইটারেজ জাহাজে করে গ্যাস আনতে হয়, যা বিপিসির নেই। সংকট সমাধানে ৫-৭ হাজার টনের ছোট চালানে আমদানি বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে লাইটারেজ জাহাজ ভাড়ার কথা ভাবছে বিপিসি।

বিপিসির প্রকিউরমেন্ট কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে।

সরবরাহ ঘাটতিই একমাত্র কারণ নয়

বাজারের তথ্য বলছে, এলপিজি আমদানিতে কোনো ঘাটতি নেই। গত তিন বছরে আমদানি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ২৩ লাখ টন, ২০২৪ সালে ১৪ দশমিক ৪২ লাখ টন এবং ২০২৫ সালে ১৪ দশমিক ৬৫ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে আমদানি ১৮ শতাংশ বেড়েছে এবং গড় আমদানি খরচ ১৪ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ৭৫ টাকায় নেমেছে। অথচ খুচরা বাজারে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও ঢাকা ও চট্টগ্রামে তা ১ হাজার ৭৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, 'সমস্যা আমদানির পরিমাণে নয়, ব্যবস্থাপনায়। গত ছয় মাসে আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে খরচ কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বেড়েছে। এটা কৃত্রিম সংকটের ইঙ্গিত দেয়। সরকার আমদানি করে সেই একই সিন্ডিকেটের হাতে বপণনের ভার দিলে সংকট কাটবে না। আমদানির পাশাপাশি তদারকি জোরদার করতে হবে।'

বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, এলপিজি বাজারের ৯৮-৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। ২৫টি কোম্পানি আমদানি করলেও মাত্র চারটি কোম্পানি বাজারের ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৭.৯৬ শতাংশ, মেঘনা ফ্রেশ ১৬.২৪ শতাংশ, যমুনা স্পেসটেক ১২.৩৮ শতাংশ এবং ইউনাইটেড আইগ্যাস ৯.১১ শতাংশ বাজার দখল করে আছে।