পল্লী বিদ্যুতের লাভজনক সমিতিগুলোতে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর চিন্তা
পল্লী বিদ্যুতের লাভজনক ২১টি সমিতির জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ‘ক্রস-সাবসিডি’ বা ভর্তুকি ভাগাভাগি ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সারা দেশের গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায়।
‘ক্রস-সাবসিডি’ ব্যবস্থায় মূলত শিল্পপ্রধান এলাকার পল্লী বিদ্যুতের লাভজনক সমিতিগুলোর উদ্বৃত্ত আয় দিয়ে লোকসানে চলা গ্রামীণ ও আবাসিক এলাকার সমিতিগুলোর ঘাটতি মেটানো হয়।
বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণ করতে কাজ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এর অংশ হিসেবে তারা সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। ওই প্রস্তাবে লাভজনক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে (পিবিএস) আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শহরের বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো যে দামে পাইকারি বিদ্যুৎ কেনে, লাভজনক সমিতিগুলোর ক্ষেত্রেও সেই একই দাম কার্যকরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রস্তাব পাস হলে পল্লী বিদ্যুতের ভেতরের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। বর্তমানে আরইবির অধীনে ৮০টি সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি সমিতি লাভজনক। মূলত এই লাভজনক সমিতিগুলোর উদ্বৃত্ত আয় দিয়েই লোকসানি সমিতিগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরইবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বাস্তবতা হলো, গুটিকয়েক লাভজনক সমিতিই পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামোকে টিকিয়ে রেখেছে।
বিইআরসিতে জমা দেওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩টি লাভজনক সমিতি তাদের উদ্বৃত্ত আয় থেকে ৬১টি লোকসানি সমিতিকে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা দিয়েছে। মূলত আবাসিক গ্রাহকদের কম বিল এবং বিশালসংখ্যক ভর্তুকিপ্রাপ্ত গ্রাহক থাকার কারণেই ওই সমিতিগুলো লোকসানের মুখে পড়ে।
পিডিবি ২১টি লাভজনক সমিতিকে চিহ্নিত করলেও আরইবির তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। আরইবির হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে লাভজনক ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৩টি সমিতি এবং এগুলোর প্রায় সবই শিল্পাঞ্চলের।
আরইবি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সরকার যদি পাইকারি দাম বাড়িয়ে লাভজনক সমিতিগুলোর আয়ের বড় অংশ নিয়ে নেয়, তবে পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আর্থিক সংকটে পড়বে।
লাভজনক সমিতি কোনগুলো
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আরইবি বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৯ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ দিচ্ছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৭৭ শতাংশই তাদের। বিদ্যুতের ব্যবহারের দিক থেকেও জাতীয় সরবরাহের প্রায় ৫৭ শতাংশ যায় আরইবির মাধ্যমে।
তবে এলাকাভেদে গ্রাহকের ধরনে বড় পার্থক্য রয়েছে। আরইবির মোট বিদ্যুতের ৫৬ শতাংশই ব্যবহার করেন আবাসিক গ্রাহকেরা। কিন্তু আবাসিক এলাকার চেয়ে শিল্পাঞ্চলের সমিতিগুলোর আয় ও লাভ অনেক বেশি।
গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) সবচেয়ে বেশি ৬১৫ কোটি টাকা আয় করেছে ঢাকা-১ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এরপর গাজীপুর-১ সমিতি ৫৬৫ কোটি টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ-১ সমিতি ৫২২ কোটি টাকা আয় করেছে।
পিডিবি চিহ্নিত অন্য লাভজনক সমিতিগুলো হলো—চট্টগ্রাম-১ ও ৩, গাজীপুর-২, ময়মনসিংহ-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-২ ও ৪, নরসিংদী-১ ও ২, কুমিল্লা-২ ও ৩, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং কক্সবাজার।
লাভজনক সমিতিগুলোর সহায়তা পাওয়ার পরও আরইবির আর্থিক সংকট কমছে না। বিইআরসিতে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) আরইবির লোকসান ছিল ১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি এবং আগামী অর্থবছরে ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত অর্থবছরে আরইবির প্রতি ইউনিটে (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) লোকসান ছিল ৩৪ পয়সা, যা এখন বেড়ে ৪৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই ঘাটতি আরও বেড়ে ৫০ পয়সা হতে পারে। এ কারণে খুচরা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
আরইবি তাদের প্রস্তাবে বলেছে, ‘পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ও সঞ্চালনের খরচ বাড়লে সেই বাড়তি বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই গিয়ে পড়বে। আমাদের ৯০ শতাংশ গ্রাহকই আবাসিক। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ (১ কোটি ৬৩ লাখ) “লাইফলাইন” বা প্রান্তিক গ্রাহক, যারা প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৬৩ পয়সা বিল দেন। অথচ আমাদের গড় খুচরা দাম পড়ে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।’
বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পিডিবির কর্মকর্তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, শিল্পপ্রধান সমিতিগুলো এখন শহুরের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির মতোই কাজ করছে। তাই তাদের আর পাইকারি দামে ছাড় বা সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া ‘ক্রস-সাবসিডি’ কাঠামো দুর্বল করা হলে শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকির চাপই বাড়বে। অথবা বাধ্য হয়ে গ্রামীণ পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বড় শিল্পাঞ্চলের গুটিকয়েক সমিতিই যা আয় করে তাতে পুরো গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে টিকে থাকে।
তিনি বলেন, লাভজনক সমিতির সংখ্যা খুবই কম। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো কয়েকটি শিল্পাঞ্চলের বাইরে বেশির ভাগ সমিতিই বাস্তবে লাভজনক নয়। এখন যদি লাভজনক সমিতিগুলোর ওপর পাইকারি বিদ্যুতের বাড়তি খরচের বোঝা চাপানো হয়, তবে দুর্বল সমিতিগুলোকে সাহায্য করার ক্ষমতা তাদের কমে যাবে। তখন সরকারের ভর্তুকি কমার বদলে উল্টো আরও বাড়বে।
শামসুল আলম আরও বলেন, এই প্রস্তাবটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে করপোরেট করার পুরোনো বিতর্ককে আবার উসকে দিতে পারে। অতীতে পল্লি বিদ্যুতায়ন খাতে এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব নিয়ে আগামীকাল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গণশুনানি শুরু করবে বিইআরসি।