পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পাম্পে গাড়ির চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় গতকাল শনিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল পাম্পগুলোতে ভিড় করেন গ্রাহকেরা। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বাংলাদেশের অনেক ফিলিং স্টেশন জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানি মজুত পর্যাপ্ত থাকা এবং চলতি মাসে দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও রাত পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এ সময় চালকদের জ্বালানি সংগ্রহের জন্য হুড়োহুড়ি করতেও দেখা যায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।
মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত পর্যাপ্ত এবং তিনি নাগরিকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের টুকু বলেন, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি আরও জানান, রোববার আরও দুটি জ্বালানি বহনকারী জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটাই আসলে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করছে।
'যদি মানুষ জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে, তবে এটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে।' তিনি আরও যোগ করেন, ফিলিং স্টেশনগুলো পর্যবেক্ষণ করতে এবং অনিয়ম রোধে আগামীকাল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার টন পেট্রোল ছিল যা ১৫ দিনের সরবরাহের জন্য যথেষ্ট। আর অকটেনের মজুত ২৩ হাজার টন, যা ২৫ দিনের জন্য যথেষ্ট। আর ডিজেলের মজুত এক লাখ ২৯ হাজার টন, যা ১৪ দিনের সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত।
কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে দেরি হওয়া সত্ত্বেও সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। ৪ মার্চ পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ এসেছে, যেখানে ৬ মার্চ ও আজ আসার কথা থাকা চালানগুলো রোববার পৌঁছাবে। আরও একটি জাহাজ ১২ মার্চ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিপিসির মার্চের আমদানি সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল; ৩ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৪৫ হাজার টন জেট ফুয়েল পাওয়ার কথা রয়েছে।
এপ্রিলে আসার কথা থাকা চালানের মধ্যে রয়েছে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, ২ লাখ ৯৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, চলমান সংঘাতের কারণে জাহাজ আসতে দেরি হতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি বিক্রি নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বিপিসির তথ্য বলছে, ডিজেলের দৈনিক গড় বিক্রি ফেব্রুয়ারির ১২ হাজার ৮৭৯ টন থেকে বেড়ে ১ থেকে ৪ মার্চের মধ্যে ২৪ হাজার ৪৭৮ টনে দাঁড়িয়েছে। এই চার দিনে মোট বিক্রি হয়েছে ৯৭ হাজার ৯১২ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বেশি।
অকটেনের দৈনিক গড় বিক্রি ফেব্রুয়ারির ১ হাজার ১৭৩ টন থেকে বেড়ে মার্চ মাসের শুরুতে প্রায় ২ হাজার টনে পৌঁছেছে, অর্থাৎ বেড়েছে ৭১ শতাংশ। অন্যদিকে পেট্রোল বিক্রি ফেব্রুয়ারির দৈনিক গড় ১ হাজার ২১২ টন থেকে বেড়ে ১ থেকে ৪ মার্চ সময়ে ২ হাজার ৩৪৫ টনে পৌঁছেছে, অর্থাৎ বেড়েছে ৯৪ শতাংশ।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটায় হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে সরবরাহে চাপ পড়েছে। যদি আমদানি দেরি হয়, তবে কম মজুত বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম ব্যাখ্যা করেন, বাংলাদেশ কৌশলগত মজুতের পরিবর্তে একটি 'রানিং ইনভেন্টরি' বা চলমান মজুত ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
তিনি বলেন, ট্যাঙ্কার, পাইপলাইন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যাঙ্কসহ আমাদের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিনের জন্য পর্যাপ্ত। তবে আমাদের কোনো আনুষ্ঠানিক কৌশলগত মজুত নীতি নেই যেখানে জরুরি অবস্থার জন্য জ্বালানি আলাদা করে রাখা হয়।
তামিম সতর্ক করে বলেন, সংকটের সময় সরবরাহকারীরা যদি 'ফোর্স মেজার' বা অনিবার্য পরিস্থিতির দোহাই দেয়, তবে বিদ্যমান চুক্তিগুলো রক্ষা করা সম্ভব নাও হতে পারে।
খরচ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা পেতে তিনি সরকারকে কমপক্ষে ১৫ দিনের একটি ডেডিকেটেড কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সরকার প্রতিদিনের জ্বালানি কেনার ওপর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ ২ লিটার; ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১০ লিটার; এসইউভি/মাইক্রোবাসের জন্য ২০ থেকে ২৫ লিটার; পিকআপ ভ্যান/লোকাল বাসের জন্য ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল এবং দূরপাল্লার বাস/ট্রাকের জন্য ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল কেনা যাবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই সীমা নির্ধারণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছে, ঘাটতির কারণে নয়।
তবে এই রেশনিং বা সীমিতকরণের সিদ্ধান্তই কাউকে কাউকে ভয়ের কারণে জ্বালানি মজুত করতে প্ররোচিত করেছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, পাবনা, গোপালগঞ্জ ও রাঙামাটির পাম্পগুলো পরিদর্শন করে দ্য ডেইলি স্টারের সংবাদদাতারা দেখেছেন, অধিকাংশ পাম্প বন্ধ অথবা সীমিত পরিমাণে বিক্রি করছে।
শনিবার ঢাকায় মাত্র কয়েকটি স্টেশনে জ্বালানি বিক্রি অব্যাহত থাকলেও বিশাল ভিড় দেখা যায়। এমনকি আগের দিন শুক্রবার মাঝরাতেও তেজগাঁওয়ের পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কর্মচারীরা জানান, সাপ্তাহিক ছুটির কারণে ডিপো বন্ধ থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চট্টগ্রামেও বেশ কয়েকটি স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বন্দরনগরীর ওয়াসা মোড় এলাকার সিএমপি ফিলিং স্টেশনে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক রেজাউল করিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এখানে এসে লাইনে দাঁড়ানোর আগে আমি আজ আটটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরেছি। কিন্তু আধা ঘণ্টা পর যখন আমার পালা এলো, তখন আমাকে জানানো হলো যে আর কোনো জ্বালানি নেই।
রাজশাহীতে সাময়িক বিঘ্নের কারণে কিছু পাম্পে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় কিছু পাম্প বিক্রি বন্ধ করে দেয় এবং অন্যরা সীমিত পরিমাণে বিক্রি করে। একটি ঘটনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পর পুলিশের উপস্থিতিতে জ্বালানি বিক্রি করতে হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পবা উপজেলার রাজশাহী বিমানবন্দরের সামনে মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
রুয়েট এলাকার নয়ন ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল চালক সবুজ আহমেদ বলেন, তিনি প্রতিদিন তার মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন এবং ট্যাংক পূর্ণ করার চেষ্টায় বিভিন্ন পাম্পে ঘুরছেন।
মেসার্স আফরিন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সোলাইমান কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি জ্বালানি প্রাপ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার ফলে চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে।
পটুয়াখালী ও গোপালগঞ্জে রেশনিং বা সীমিতকরণ পদ্ধতিতে বিক্রি শুরু হওয়ার পর গ্রাহকদের ভিড় স্বাভাবিক হয়ে আসে, যদিও ভিড় ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি।
রাঙামাটিতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কল্যাণপুর, রাজবাড়ি, বনরূপা এবং ওল্ড বাস স্ট্যান্ড স্টেশনগুলোতে অকটেনের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।
মন্ত্রী টুকু বলেন, ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাতার ছাড়াও বিকল্প উৎস খুঁজছে। নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাস্তবে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই।
(চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, পাবনা, গোপালগঞ্জ ও রাঙামাটির সংবাদদাতারা এই প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)