বান্দরবানে নামছে সাঙ্গু-মাতামুহুরীর পানি, স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
বিপৎসীমার নিচে নেমেছে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি। ধীরে ধীরে বান্দরবানের প্লাবিত জনপদ থেকে পানি সরে যাচ্ছে।
ঘরভর্তি কাদামাটি, ভেঙে পড়া বসতঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী, পানীয় জলের সংকট আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব নিয়েই এখন নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে জেলার হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের।
আজ সোমবার জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান কাদা জমে রয়েছে ঘর-বাড়ি, দোকানপাট ও রাস্তাঘাটে।
অনেক বাড়ির মেঝে কাদায় ঢেকে গেছে, ভিজে নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যারা কোনোমতে ঘর টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন, তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাদা পরিষ্কার করে আবার বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন। কেউ ভেজা খাট-বিছানা ও কাপড় শুকাচ্ছেন, আবার কেউ ভেঙে যাওয়া দেয়াল, বেড়া ও রান্নাঘর মেরামতে ব্যস্ত।
তবে যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। অনেকেই এখনো জানেন না কবে আবার নিজের ঘরে ফিরতে পারবেন, কিংবা নতুন করে কোথায় আশ্রয় গড়ে তুলবেন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক বাসিন্দা জানান, টানা পাঁচ দিন পানিবন্দি থাকার পর গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে পানি নেমে যায়। কিন্তু পানি চলে গেলেও দুর্ভোগ যেন আরও বেড়েছে। কাদা ও ময়লায় ভরে গেছে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। অনেক সড়ক এখনো চলাচলের অনুপযোগী। পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানির অভাবে ঘর পরিষ্কার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মংহ্লা মারমা বলেন, পানি নেমে গেছে, কিন্তু ঘরভর্তি কাদামাটি। সকাল থেকে পরিষ্কার করছি, পুরো ঘর পরিষ্কার করতে সারা দিন লেগে যাবে।
পৌরসভার মেম্বারপাড়ার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বন্যার সময় পাঁচ দিন পানিবন্দি ছিলাম। গতকাল বিকেল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তখন যেমন কষ্ট ছিল, এখন তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে। চারদিকে কাদা আর ময়লা। ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও মেরামত করতে অনেকদিন সময় লাগবে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সোমবারও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, দুই নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে। সোমবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি ১২ দশমিক ৮০ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ১১ দশমিক ১৬ মিটারে নেমে এসেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত না থাকলে পানি আরও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (১৩ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত) জেলায় ১১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যে পড়ে। তবে উজানে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় অনেক মানুষ নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনো খাদ্যসংকটে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।