আশা ভোসলের স্মৃতিচারণায় সাবিনা ইয়াসমিন, ফাহমিদা নবী ও কনকচাঁপা
ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে মারা গেছেন।
আজ রোববার দুপুরে ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন ছেলে আনন্দ ভোসলে।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোসলে। প্রায় ৮ দশক ধরে সংগীত জগতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এ সময়ে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন।
১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্রে প্রথম গান রেকর্ড হয় তার। শুরুতে মূলত নাচের গান বা হালকা ধরনের গানের জন্য পরিচিতি পেলেও, পরে গজল এবং ধ্রুপদী সংগীতেও সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
ক্যারিয়ারে বহু সম্মাননা পেয়েছেন আশা ভোসলে। এর মধ্যে আছে—১৯৮১ সালে প্রথমবার জাতীয় পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয়বার জাতীয় পুরস্কার, ২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ও ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ।
২০২২ সালে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের শেষ গানটি রেকর্ড করেন। ৯১ বছর বয়সে ‘সাইয়াঁ বিনা’ নামে একটি একক গান প্রকাশ করে প্রয়াত স্বামী আর ডি বর্মনকে উৎসর্গ করেন।
তার কণ্ঠে উল্লেখযোগ্য হিন্দি গানের মধ্যে রয়েছে— ‘ভোমরা বাড়ে নাদান’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দাম মারো দাম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘রঙ্গিলা রে’, ‘রাধা ক্যায়সে না জালে’, ‘কাহিঁ আগ লাগে’, ‘রোজ রোজ আঁখো তলে’ প্রভৃতি।
আশা ভোসলের কণ্ঠে বাংলা গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘আকাশে সূর্য আছে যতদিন’, ‘আকাশে আজ রঙের খেলা’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘খুব চেনা চেনা মুখখানি তোমার’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘মহুয়ায় জমেছে আজ’, ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’, ‘আমি খাতার পাতায় চেয়েছিলাম’, ‘কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায়’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ ইত্যাদি।
গুণী এ শিল্পীর প্রয়াণে শোকার্ত হয়েছেন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের তারকারাও। তারা কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে।
সাবিনা ইয়াসমিন
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোসলের গান নিয়ে কথা বলার মতো কোনো শব্দ আমার কাছে নেই। তার কণ্ঠের গান মুগ্ধ হয়ে শুধু শুনেছি, আজীবন শুনে যাব।
আমার সঙ্গে আশাজির প্রথম দেখা হয়েছিল ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ে যখন মুম্বাই গিয়েছিলাম, সেই সময়। আর ডি বর্মনের সুরে তার স্টুডিওতেই দেখা হয়েছিল এই কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে। খুব অমায়িক একজন মানুষ। খুব বেশি কথা হয়নি। তবে এতবড় শিল্পী হলেও কোনো অহংকার দেখিনি তার মধ্যে। বড় শিল্পীরা বুঝি এমনই হয়। আর ডি বর্মনের কাছে ‘অন্যায় অবিচার’ সিনেমার গানগুলোর অনেক প্রশংসা করেছিলেন আশাজি।
তারপর বাংলাদেশে যখন এসেছিলেন তখন ইন্টারকন্টিনেন্টালে ছিলেন। আমার কণ্ঠে অনেক গান শুনেছিলেন। এটা আমার জন্য পরম প্রাপ্তি। এমন সিগনেচার ভয়েজ খুব বেশি আসে না। খুব মন খারাপ হলো তার মৃত্যুর খবর শুনে। তার গান নিয়ে মন্তব্য করার সাহস আমার সত্যি নেই।
ফাহমিদা নবী
আশা ভোসলে নেই শুনে মনটা অনেক খারাপ লাগছে। কী বলব জানি না, কিন্তু আর একজন আশা আর জন্মাবেন না, সেটা জানি। একজন আশা ভোসলে আর তার সংগীতের সৌন্দর্য, জ্ঞান ও জাদুকরী কণ্ঠ, ছোট থেকেই আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। তাকে অনুসরণ করতাম।
যে কারণে তার ঢং, স্পষ্টতা, মায়া, রোমান্স—পুরোটাই ছিল যা চাই, ঠিক তার মতোই। এই শিল্পীর কখনোই মৃত্যু হবে না। তিনি গানে গানে বেঁচে থাকবেন শ্রোতার মনে, আজীবন। যা রেখে গেছেন, তা কখনোই শেষ হওয়ার নয়।
কনকচাঁপা
আশা ভোসলের মৃত্যুর খবর শুনে মর্মাহত, শব্দটা এখানে সঠিক হচ্ছে না। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি। যদিও তিনি এই মর্ত্যের, এই পৃথিবীর মানুষ। একবার জন্মালে মারা যেতেই হবে, জানি। কিন্তু তাদের সুরের মৃত্যু কোনোদিন হবে না। আগামী একশ বছরে তাদের মতো মানে একজন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলের মতো কণ্ঠশিল্পী আর আসবে না, আশাও করতে পারি না।
তিনি যে দৈহিকভাবে বেঁচে ছিলেন তখন আমার মনে হতো এই একই পৃথিবীর কোনো এক জায়গায় আমিও বেঁচে আছি। আরেক প্রান্তে তিনি আছেন। আমি অনুভব করতাম কোনো না কোনোভাবে আশা ভোসলের নিশ্বাস আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আশা ভোসলের কণ্ঠ ছিল অনবদ্য। তার কণ্ঠের সঙ্গে অন্য কারো কণ্ঠের কোনো ধরনের মিল নেই। মধু যেমন পানির গ্লাসে ঢাললে আলাদা করা যায়। মুক্তার দানা যেমন সুন্দর, সবসময় সমুজ্জ্বল থাকে। তেমনি তার কণ্ঠও একদম আলাদা।
আজীবন তার কণ্ঠের গান শুনে যাব। এই ধরনের খবর আসলে নেওয়া যায় না। আমি খুব মর্মাহত হয়েছি তার মত্যুর খবরে।
