ভেঙে দেওয়া হলো ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, প্রশাসক নিয়োগ

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

তারল্য সংকট, আমানত তুলে নেওয়া, বিক্ষোভ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ব্যাংক খাতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আজ রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ব্যাংক, আমানতকারী ও জনস্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারার আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক ও বিক্ষোভের মধ্যে গত দুই সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যাংকটি তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

তারল্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক আজ জরুরি সহায়তা হিসেবে ব্যাংকটিকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে।

পবিত্র ঈদুল আজহার আগে শেষ কর্মদিবস ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে রাত ৯টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এরপর ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন ঢাকার মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ ব্যানারে বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবি জানান।

বিক্ষোভের পাশাপাশি আমানত প্রত্যাহারের হারও দ্রুত বাড়তে থাকে।

৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাব উদ্বৃত্তে থাকলেও দুই সপ্তাহের মধ্যে তা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে নেমে আসে।

৩১ মে ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, যা ৭ জুনে কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গ্রাহকেরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।

চাপ সামাল দিতে ব্যাংকটি শাখা পর্যায়ে প্রতি গ্রাহকের জন্য নগদ উত্তোলনের সীমা ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। তবে কিছু গ্রাহক অভিযোগ করেন, ঢাকার কয়েকটি শাখা থেকে মাত্র ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল।

ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় ও গত সপ্তাহে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চায়।

ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর আন্তঃব্যাংক তহবিল স্থানান্তর ও ক্লিয়ারিং কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়েছে। নতুন পাওয়া তহবিল গ্রাহকের উত্তোলন প্রবণতা, খাতভিত্তিক চাহিদা এবং সম্ভাব্য তারল্য প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যবহার করা হবে।

বর্তমানে ব্যাংক খাতে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের, যার পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ২০১৭ সালে গ্রুপটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, তারা ব্যাংকটির প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ নিজেদের ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে সরিয়ে নিয়েছিল।