ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় উত্তাল জাবি, প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিতে রাতভর বিক্ষোভ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তারে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে রাতভর বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এসময় তারা প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলমসহ প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করেছেন।
গতরাত দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হল ঘুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তারা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নেন।
গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে জোর করে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বুধবার আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার রাতেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। পরে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে তারা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করা হবে বলেও জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার, কুইক রেসপন্স টিমে নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বারবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রক্টর নৈতিকভাবে দায়িত্বে থাকার অধিকার হারিয়েছেন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘গত দুই বছরে একের পর এক ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই সর্বসম্মতিক্রমে তাদের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।’
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘গত আড়াই বছরে নারী শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রক্টরিয়াল বডি এসব ঘটনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। আমরা হতাশ। তাদের আর সময় দেওয়ার সুযোগ নেই।’
রাত আড়াইটার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধ করলে প্রক্টরিয়াল বডি ব্যবস্থা নেয়। তবে বাইরের কেউ অপরাধ করলে সেটি মূলত পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত ফৌজদারি বিষয়।’
তার এই বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দাবি জানালেই কোনো প্রক্টর পদত্যাগ করতে পারেন না। তদন্তের মাধ্যমে প্রক্টরিয়াল বডির কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।’
তবে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান।
ভোর ৫টার পর প্রক্টর রাশিদুল আলম সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেন, গত ১৮ মাসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করেছেন। পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা জাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর মামলা করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীরা পুনরায় তার পদত্যাগ দাবি করলে প্রক্টর বলেন, উপাচার্য তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়াতেই বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত।
এর জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষকেরা আমাকে উপাচার্য বানিয়েছেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নয়। তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রক্টরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। গাফিলতির প্রমাণ মিললে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাত দিনের মধ্যে তদন্তের ফল জানানো হবে।’
তবে শিক্ষার্থীরা এ আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
