ফুটবলের নান্দনিকতা ছাড়িয়ে: বিশ্বকাপজুড়ে বিচিত্র সব অন্ধবিশ্বাসের রাজত্ব
ফুটবল মানে দক্ষতা ও সুনিপুণ কৌশলের পাশাপাশি চরম শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সমন্বয়। মাঠের লড়াইয়ে প্রতিটি সেকেন্ড মেপে ঠিক করা হয় রণকৌশল। কিন্তু এই দৃশ্যত যৌক্তিক খেলার সমান্তরালে মাঠের বাইরে চলে আরেক জগত— যেখানে বিচিত্র সব অভ্যাস, অদ্ভুত আচরণ ও গভীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসই শেষ কথা। সাধারণ দর্শকদের চোখে যা হাস্যকর বা পাগলামি মনে হতে পারে, কিন্তু ফুটবলার কিংবা পাঁড় ভক্তদের কাছে সেটিই অনেক সময় জয়ের টোটকা। ফুটবলের সৌন্দর্যতত্ত্বে কুসংস্কার তাই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে মিশে আছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, যুক্তি বা প্রমাণহীন এসব বিশ্বাস বা অভ্যাস আরও ডালপালা মেলে। কারণ কেবল একটি খেলা ছাপিয়ে ফুটবল পরিণত হয় আশা, বিশ্বাস আর আবেগের এক নাট্যশালায়। মাঠের অনিশ্চয়তাকে বশ করতে খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশ থেকে নিজেদের সাথে করে নিয়ে আসেন বিচিত্র সব আচার, যা বিশ্বকাপকে করে তুলেছে আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয়।
ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই কুসংস্কারগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের ম্যাচগুলোতে এত বেশি প্রতিকূলতা থাকে, যা একজন খেলোয়াড়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই কোনো একটি আচার বা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরা তাদের মনোযোগ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী ড্যান আব্রাহামস বলেছিলেন, 'যৌক্তিকভাবে, এই ধরণের আচারগুলোর সাথে পারফরম্যান্সের কোনো যোগসূত্র নেই। তবে একজন খেলোয়াড় যদি মনে করেন যে, এর গুরুত্ব আছে, তবে ওই কাজটিই সেই খেলোয়াড় কেমন বোধ করবেন সেটির জন্য মূল প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।'
বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতায় পাতায় জড়িয়ে আছে এমন সব শিহরণ জাগানো কুসংস্কারের গল্প।
১৯৫০: ব্রাজিলের 'অভিশপ্ত' সাদা জার্সি
ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যের সাথে হলুদ-নীল জার্সির সম্পর্ক এখন অবিচ্ছেদ্য মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের এক ট্র্যাজিক গল্প। সেসময় দলটি খেলত নীল কলারওয়ালা সাদা রঙের জার্সি পরে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে (নির্দিষ্ট কোনো ফাইনাল ছিল না) উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলের হার ব্রাজিলিয়ানদের মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা ফুটবল ইতিহাসে 'মারাকানাজো' নামে পরিচিত। হারের পর দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র শোক ও সমালোচনা, যার বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ে তৎকালীন সাদা জার্সির ওপর।
ওই জার্সিকে 'অভিশপ্ত' ও 'দেশপ্রেমহীন' হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। মনে করা হতো, জার্সিটি ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৫৩ সালে 'কোরেইও দা মানহা' নামক একটি সংবাদপত্র জার্সির নতুন নকশা চেয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। শর্ত ছিল, নকশায় পতাকার চারটি রঙই— হলুদ, নীল, সবুজ ও সাদা থাকতে হবে। সেখান থেকেই জন্ম হয় বর্তমানের বিখ্যাত 'ক্যানারি' (হলুদ-নীল) জার্সির, যা ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পরে খেলতে নেমে ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
১৯৭৪: ১৪ নম্বর জার্সির জন্য ক্রুইফের জেদ
নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ফুটবলার ইয়োহান ক্রুইফ এবং তার ১৪ নম্বর জার্সি এখন ফুটবলের এক পরম আরাধ্য সংখ্যা। এর শুরুটা হয়েছিল স্রেফ এক অভাবিত ঘটনা থেকে। ১৯৭০ সালে আয়াক্স আমস্টারডামের হয়ে খেলার সময় ক্রুইফের ক্লাব সতীর্থ গেরি মুহরেন নিজের ৭ নম্বর জার্সিটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ক্রুইফ তখন উদার হয়ে নিজের ৯ নম্বর জার্সিটি মুহরেনকে দিয়ে দেন এবং ড্রেসিংরুমের লন্ড্রি বাস্কেট থেকে হাতের কাছে থাকা ১৪ নম্বর জার্সিটি টেনে নেন। সেই ম্যাচে বড় জয়ের পর ক্রুইফ এই সংখ্যাটিকে নিজের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক বানিয়ে ফেলেন।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া নেদারল্যান্ডস দল নামের বর্ণানুক্রমিকভাবে খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর বরাদ্দ করেছিল। তখন তৈরি হয় এক অদ্ভুত জট। নিয়ম অনুযায়ী, ফরোয়ার্ড রুড গিলস পান ১ নম্বর জার্সি আর গোলকিপার ইয়ান জংব্লোড পান ৮ নম্বর। এই বর্ণানুক্রমিক নিয়মে আসলে ক্রুইফের পাওয়ার কথা ছিল ১ নম্বর জার্সি। কিন্তু তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ১৪ নম্বর জার্সি ছাড়া মাঠে নামবেন না। ডাচ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শেষ পর্যন্ত তার এই কুসংস্কারের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল।
১৯৭৮: কেম্পেসের গোঁফ বিসর্জন ও আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয়
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের মহানায়ক ছিলেন মারিও কেম্পেস। কিন্তু টুর্নামেন্টের শুরুতে চিত্রটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। তখন কেম্পেসের মাথায় ছিল লম্বা চুলে আর মুখে স্টাইলিশ 'হর্স-শু' আকৃতির গোঁফ। কিন্তু গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে তিনি জালের দেখা পাননি একবারও। দলের প্রধান স্ট্রাইকারের এই গোলখরায় চিন্তিত হয়ে পড়েন কোচ সেজার লুইস মেনত্তি। তিনি কেম্পেসকে এক বিচিত্র পরামর্শ দেন— প্রিয় গোঁফটি কামিয়ে ফেলতে।
মেনত্তি মনে করিয়ে দেন, বিশ্বকাপের আগে যখন তিনি স্পেনের ক্লাব পর্যায়ে কেম্পেসের খেলা দেখেছিলেন, তখন তিনি ক্লিন শেভড ছিলেন এবং গোলও পাচ্ছিলেন প্রচুর। কোচের কথা বিশ্বাস করে কেম্পেস গোঁফ কামিয়ে ফেলেন এবং অলৌকিকভাবে পরের ম্যাচেই পোল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল পান। এরপর পেরুর বিপক্ষেও তিনি করেন দুই গোল। এমনকি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনালে তার জোড়া গোলেই চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। কেম্পেস পরে হাসিমুখে বলেছিলেন, 'ওই গোঁফটি বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমেই আমার ফুটবল জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হয়েছিল।'
১৯৯০: টাইব্রেকারে গয়কোচিয়ার 'লাকি চার্ম'
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়ার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পেছনে কাজ করেছিল এক অদ্ভুতুড়ে কুসংস্কার। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি পেনাল্টি শ্যুটআউটে গড়ায়। চরম উত্তেজনার সেই মুহূর্তে গয়কোচিয়া প্রচণ্ড প্রকৃতির ডাক অনুভব করেন। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। বাধ্য হয়ে সতীর্থদের আড়ালে তিনি মাঠের মধ্যেই এক কোণায় প্রস্রাব করে নেন। সেই টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জিতে গেলে এটিই তার কাছে টোটকা হয়ে দাঁড়ায়।
সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচটিও যখন শ্যুটআউটে গড়ায়, গয়কোচিয়া সচেতনভাবেই আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। এবারও আর্জেন্টিনা জয়ী হয়ে ফাইনালে পৌঁছায়। যদিও তারা সেখানে হেরে যায় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কাছে। 'লাকি চার্ম' হিসেবে উল্লেখ করে গয়কোচিয়া নিজেই পরে এই বিচিত্র অভ্যাসের কথা স্বীকার করেছিলেন, '১৯৯০ সালে আমি কোনো পথ না পেয়ে এটি করেছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমরা জিতেছিলাম, তাই ইতালির বিপক্ষেও একই কাজ করি এবং সেটি কাজও করেছিল!'
১৯৯৮: বার্থেজের টাক মাথায় ব্লঁর চুমু
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে ফ্রান্সের প্রথম শিরোপা জয়ের পেছনে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল লরাঁ ব্লঁ ও ফাবিয়ান বার্থেজের সেই বিশেষ আচার। প্রতিটি ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে ডিফেন্ডার ব্লঁ এগিয়ে যেতেন গোলরক্ষক বার্থেজের দিকে এবং তার চকচকে ন্যাড়া মাথায় এক বড়সড় চুমু খেতেন। মাঠের এই বিচিত্র ও আবেগি দৃশ্য ভক্তদের কাছেও দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ফাইনালের পর্যন্ত ব্লঁ প্রতিটি ম্যাচে এই নিয়ম মেনে চলেছিলেন।
সেবার ফরাসি দলের কেবল এই একটিই কুসংস্কার ছিল না। টুর্নামেন্ট চলাকালীন পুরো দলের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম নির্ধারিত ছিল যা তারা কঠোরভাবে মেনে চলতেন। যেমন— টিম বাসের ভেতরে প্রতিটি খেলোয়াড় সব সময় একই সিটে বসতেন এবং ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর নিয়মিত বাজানো হতো গ্লোরিয়া গেনরের বিখ্যাত ডিস্কো গান 'আই উইল সারভাইভ'। ফ্রান্স দল আজ পর্যন্ত বিশ্বাস করে, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক জয়ে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এসব ছোট ছোট আচারের এক দারুণ মানসিক প্রভাব ছিল।
২০০৬: দমেনেখের কাছে যখন ট্যাকটিকসের চেয়ে বড় রাশিচক্র
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত ও অদ্ভুত কুসংস্কারের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৬ সালে ফ্রান্স দলের কোচ রেমোঁ দমেনেখের হাত ধরে। তিনি ফুটবল ট্যাকটিকসের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতেন রাশিচক্র বা জ্যোতিষশাস্ত্রে। তার বিশ্বাস ছিল, বৃশ্চিক বা স্করপিও রাশির খেলোয়াড়রা দলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ তারা অবাধ্য এবং সব সময় মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়। এই বিচিত্র বিশ্বাসের বলি হয়েছিলেন কিংবদন্তি রবার্ত পিরেস। আর্সেনালের হয়ে ফর্মে থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র স্করপিও হওয়ার কারণে তাকে বিশ্বকাপ দলে রাখেননি দমেনেখ।
দমেনেখের এই খামখেয়ালিপনা সেখানেই শেষ হয়নি। তিনি আরও মনে করতেন, সিংহ বা লিও রাশির খেলোয়াড়রা রক্ষণে খুব ভালো পারফর্ম করে। তবে তাদের ক্ষেত্রেও তিনি কিছুটা সতর্ক থাকতেন। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের স্কোয়াডে পাঁচজন লিও রাশির খেলোয়াড় থাকলেও একজনও বৃশ্চিক রাশির ফুটবলার ছিল না। ফরাসি সংবাদমাধ্যম এই নিয়ে তখন ব্যাপক হাস্যরস করলেও দমেনেখ তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়া দলটি ফাইনালেও উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিনেদিন জিদানের সেই কুখ্যাত ঢুঁশ আর ইতালির কাছে হার ঠেকাতে পারেনি দমেনেখের কোনো রাশিচক্রই।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে কুসংস্কারগুলো কখনোই হারিয়ে যাবে না। সময়ের সাথে সাথে এগুলো হয়তো বিবর্তিত হবে বা আধুনিক রূপ নেবে, কিন্তু খেলার ভেতরে এগুলো মিশে থাকবে চিরকাল। কোনো খেলোয়াড়ের নির্দিষ্ট জুতো আগে পরা থেকে শুরু করে কোনো ভক্তের জয়ের জন্য নির্দিষ্ট টি-শার্ট না ধুয়ে পরে থাকা— এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়। এটি এক গভীর আবেগ আর বিশ্বাসের নাম। শেষ পর্যন্ত এসব আচার ফল নির্ধারণ করুক বা না করুক, এগুলো খেলোয়াড় আর ভক্তদের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করে।