কলম্বিয়া: বিশ্বকাপকে ‘না’ বলা একমাত্র আয়োজক
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আজতেকা স্টেডিয়াম। আকাশি-সাদা জার্সিতে 'ফুটবল ঈশ্বর' খ্যাত দিয়েগো ম্যারাডোনা নামছেন মর্ত্যে, আর পরম আরাধ্য সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরছেন মেক্সিকো সিটির গগনবিদারী চিৎকারের মাঝে। কিন্তু ইতিহাসের চাকাটা যদি সামান্য অন্যভাবে ঘুরত? দৃশ্যটা কি এমন হতে পারত না যে, ম্যারাডোনা তার সেই 'হ্যান্ড অব গড' গোলটি করছেন কলম্বিয়ার মেদেয়িন শহরের আতানাসিও গিরাদত স্টেডিয়ামে? ট্রফি হাতে বোগোতার রাজপথে ম্যারাডোনাকে নিয়ে বের হচ্ছে শোভাযাত্রা?
কল্পনাটা রোমাঞ্চকর হলেও বাস্তবের ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। ফিফার নথিপত্রে 'কলম্বিয়া ৮৬' বলে আসলে কোনো টুর্নামেন্টের অস্তিত্বই নেই। নেই কোনো ভিডিও ফুটেজ কিংবা ট্রফি জয়ের ছবি। কারণ, এটি ফুটবলের ইতিহাসের সেই ‘ভুতুড়ে’ বিশ্বকাপ, যা চূড়ান্ত হওয়ার এক দশক পর স্রেফ বাতিলের খাতায় চলে গিয়েছিল। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র দেশ হিসেবে আয়োজকের মর্যাদা পেয়েও শেষ মুহূর্তে ফিফাকে সপাটে 'না' বলে দিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি।
কলম্বিয়াকে বিশ্বকাপের স্বাগতিক করার পেছনের মূল কারিগর ছিলেন আলফোনসো সিনিয়োর কেভেদো। তিনি ছিলেন কলম্বিয়ার কিংবদন্তি ফুটবল সংগঠক, বিখ্যাত ক্লাব মিলিওনারিওসের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফিফার নির্বাহী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। তার ব্যক্তিগত আকাশচুম্বী স্বপ্ন ছিল মাতৃভূমিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। ১৯৭৪ সালে জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই কলম্বিয়াকে ১৯৮৬ আসরের স্বাগতিক ঘোষণা করা হয়।
তৎকালীন কলম্বিয়ান প্রেসিডেন্ট মিসায়েল পাস্ত্রানা তখন গর্ব করে বলেছিলেন, 'আমি সত্যিই খুব সন্তুষ্ট। এটি প্রমাণ করে যে— যখন একটি দেশ কোনো লক্ষ্য স্থির করে এবং তাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তখন সে তা অর্জন করতে পারে।' কিন্তু পাস্ত্রানা তখন জানতেন না, ফিফার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এক সময় তার দেশের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়াবে।
কলম্বিয়া যখন বিড জিতেছিল, তখন বিশ্বকাপ ছিল ১৬ দলের। কিন্তু ১৯৭৪ সালে ফিফার সভাপতি হিসেবে মসনদে বসেন ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঞ্জ। ফুটবলকে স্রেফ খেলা থেকে বিলিয়ন ডলারের করপোরেট পণ্যে রূপান্তরের কারিগর ছিলেন তিনি। তার আমলেই ১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে দলের সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ২৪ করা হয়।
দলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজক দেশের ওপর খরচের বোঝাও বাড়ে জ্যামিতিক হারে। ১৬ দলের জন্য যে অবকাঠামো যথেষ্ট ছিল, ২৪ দলের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় পাহাড়সম। হাভেলাঞ্জের ফিফা কলম্বিয়ার সামনে এমন সব শর্ত হাজির করে, যা দেখে মনে হচ্ছিল এটি কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, বরং কোনো সাম্রাজ্যের অভিষেক অনুষ্ঠান। বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাব্য খরচ ৫ বিলিয়ন কলম্বিয়ান পেসো থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ১০০ বিলিয়ন কলম্বিয়ান পেসো।
বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য ফিফা কলম্বিয়াকে ১২টি শর্ত দিয়েছিল, যা পূরণ করা দেশটির তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে ছিল প্রায় অসম্ভব চ্যালেঞ্জ। ফিফার সেই বিলাসী চাহিদার তালিকায় ছিল:
* প্রথম রাউন্ডের জন্য কমপক্ষে ৪০,০০০ ধারণক্ষমতার ১২টি স্টেডিয়াম।
* নকআউটের পর্বের জন্য কমপক্ষে ৬০,০০০ ধারণক্ষমতার ৪টি স্টেডিয়াম।
* উদ্বোধনী ও ফাইনাল ম্যাচের জন্য কমপক্ষে ৮০,০০০ ধারণক্ষমতার ২টি স্টেডিয়াম।
* বোগোতায় একটি বিশাল যোগাযোগ টাওয়ার নির্মাণ।
* আন্তর্জাতিক মুদ্রার অবাধ চলাচল বৈধ করে ডিক্রি জারি করা।
* ফিফার ডিরেক্টরদের জন্য লিমুজিন গাড়ির বহর প্রস্তুত রাখা।
* সমস্ত ভেন্যু সংযোগকারী একটি ট্রেন নেটওয়ার্ক ও আধুনিক বিমানবন্দর।
* দর্শকদের যাতায়াতের জন্য উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তবে ১৯৮২ সাল নাগাদ দেখা গেল, এসব শর্তের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি কলম্বিয়া। অবকাঠামো নির্মাণের কোনো লক্ষণই নেই। ফিফার পক্ষ থেকে ক্রমাগত চাপ আসতে থাকলে কলম্বিয়া সরকার বুঝতে পারে, এই বিলাসিতা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
কলম্বিয়ার তৎকালীন অবস্থা ছিল শোচনীয়, তাদের ধুঁকতে থাকা অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল রীতিমতো অবাস্তব। দেশটিতে তখন গৃহযুদ্ধ চলছে, মাদক কারবারিদের সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত এবং বিশ্বজুড়ে কফির (প্রধান রপ্তানি পণ্য) দাম কমে যাওয়ায় অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম। তাই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বেলিসারিও বেতানঙ্কুর উপলব্ধি করেছিলেন, সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল বানানো বা ক্ষুধার্তদের অন্নসংস্থান করা অনেক বেশি জরুরি।
১৯৮২ সালের ২৫ অক্টোবর বেতানঙ্কুর টেলিভিশনে এক ভাষণে বিশ্বকে চমকে দেন। অত্যন্ত কঠোর কিন্তু দেশপ্রেমী কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, 'যেহেতু আমরা জনস্বার্থকে মূল্য দিই এবং অপচয় করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে জানি, তাই আমি দেশবাসীকে জানাচ্ছি যে— ১৯৮৬ ফিফা বিশ্বকাপ কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে না।... আমাদের এখানে করার মতো অনেক জরুরি কাজ আছে, ফিফা ও তার সদস্যদের বিলাসিতা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সময় বা অর্থ আমাদের নেই।'
এই ঘোষণায় ভেঙে পড়েন আলফোনসো। আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন, 'কলম্বিয়া একটি ছোট দেশ, যারা বড় কিছু সামলাতে পারে না। আমি কলম্বিয়ার জন্য এই বিশাল কিছু চেয়েছিলাম। কিন্তু কলম্বিয়া আমাকে হতাশ করেছে।'
কলম্বিয়া সরে দাঁড়ালে নতুন স্বাগতিক হওয়ার দৌড়ে নামে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৩ সালে মেক্সিকোকে দায়িত্ব দেয় ফিফা। এর আগে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করা মেক্সিকো ইতিহাস গড়ে প্রথম দেশ হিসেবে দুবার বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়। যদিও ১৯৮৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প মেক্সিকো বিশ্বকাপকেও ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছিল, কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সফলভাবে টুর্নামেন্টটি আয়োজন করতে সক্ষম হয়।
আক্ষেপের বিষয় হলো, যে বিশ্বকাপ তাদের মাটিতে হওয়ার কথা ছিল, সেই ১৯৮৬ সালের আসরে কলম্বিয়া কোয়ালিফাইও করতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বের প্লে-অফে প্যারাগুয়ের কাছে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-২ ব্যবধানে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়।
তবে আজ চার দশক পর বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট বেতানঙ্কুরের সিদ্ধান্তটি ছিল চরম বিচক্ষণতার। ফিফার কর্পোরেট চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে জনগণের ট্যাক্সের টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় ব্যয় করাই ছিল প্রকৃত দেশপ্রেম। আধুনিক যুগে যখন কোনো দেশ বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করে পরে ধুঁকতে থাকে, তখন ১৯৮৬ সালে কলম্বিয়ার সেই 'না' বলার সিদ্ধান্তটি এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়েই বেঁচে আছে।