যখন এক যুবরাজ খেলা থামিয়ে দিয়েছিলেন: বিশ্বকাপের সবচেয়ে অদ্ভুত হস্তক্ষেপ

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

বিশ্বকাপ মানেই কেবল মাঠের লড়াই, গোল আর গ্যালারির উন্মাদনা নয়। অনেক সময় মাঠের বাইরের নাটকীয়তাও ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। তবে ফুটবলের মহাযজ্ঞের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে যা ঘটেছিল, তা কেবল নাটকীয় বললেও কম বলা হবে! সেটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত, নজিরবিহীন ও বিতর্কিত অধ্যায়, যেখানে রেফারির সিদ্ধান্ত বদলে দিতে সরাসরি মাঠে নেমে এসেছিলেন একটি দেশের যুবরাজ!

স্পেনের ভায়াদোলিদে ফ্রান্স ও কুয়েতের মধ্যকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচটিতে ঘটেছিল সেই বিস্ময়কর ঘটনা, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের দেয় আলোচনার খোরাক।

১৯৮২ সাল ছিল কুয়েতের ফুটবলের জন্য ঐতিহাসিক বছর। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল পারস্য উপসাগরের এই ছোট দেশটি। নিজেদের প্রথম ম্যাচে তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের বিপরীতে ১-১ গোলে ড্র করে তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের মোকাবিলা করতে হয় ইউরোপের আরেক শক্তিশালী দল ফ্রান্সকে। মিশেল প্লাতিনির নেতৃত্বে সেই ফরাসি দলের বিপক্ষে ভালো কিছু করে দেখানো ছিল কুয়েতের জন্য হিমালয় জয়ের সমান।

তেমনটা ঘটেনি। ম্যাচ শুরু হওয়ার পর থেকেই মাঠের দখল নিয়ে নেয় ফ্রান্স। তাদের একটানা আক্রমণের মুখে কুয়েতের রক্ষণভাগ হয়ে পড়ে এলোমেলো।

ফ্রান্স তখন ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে চালকের আসনে, খেলার বয়স ৭৯ মিনিট। ফরাসি মিডফিল্ডার আলঁ জিরেসে বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন এবং দুর্দান্ত শটে তা জালে জড়ান। স্বাভাবিক নিয়মে স্কোরলাইন হওয়ার কথা ছিল ৪-১। কিন্তু সেখানেই শুরু হয় বিপত্তি।

গোলের সময় কুয়েতের ডিফেন্ডাররা হঠাৎ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই জিরেসেকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেননি। তারা ভেবেছিলেন, রেফারি হয়তো অফসাইড বা অন্য কোনো কারণে খেলা থামানোর সংকেত দিয়েছেন। কীভাবে? তাদের দাবি ছিল, বাঁশির শব্দ শুনতে পেয়েছেন তারা।

'রহস্যময়' সেই বাঁশির শব্দ ভেসে এসেছিল আসলে গ্যালারি থেকে। ম্যাচ রেফারির দায়িত্বে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের মিরোস্লাভ স্তুপার অবশ্য শুরুতে কানে তোলেননি সেসব। তিনি গোলের বাঁশি বাজান। কুয়েতের খেলোয়াড়রা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। তারা বলতে থাকেন, গ্যালারির সেই শব্দ শুনে তারা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং খেলা থামিয়ে দিয়েছেন। তাই গোলটিকে বৈধ বলা অন্যায়।

মাঠের পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই ঘটে এক অভাবনীয় কাণ্ড, ফুটবল মাঠে যে দৃশ্য কেউ কখনও দেখতে চাইবেন না। কুয়েত ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (কেএফএ) তৎকালীন সভাপতি ও দেশটির রাজপরিবারের সদস্য শেখ ফাহাদ আল-আহমদ আল-জাবের আল-সাবাহ— যিনি 'প্রিন্স ফাহাদ' নামে পরিচিত ছিলেন— গ্যালারি থেকে নেমে সরাসরি মাঠে ঢুকে পড়েন!

ফ্রান্সের খেলোয়াড় মানুয়েল আমোরোসের ভাষায়, 'আমরা দেখলাম কুয়েতের যুবরাজ মাঠে নামছেন। তার সঙ্গে ছিল ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা।'

প্রিন্স ফাহাদ রেফারির কাছে গিয়ে সরাসরি তর্কে লিপ্ত হন এবং নিজের খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেন। তার দাবি ছিল একটাই, এই গোল বাতিল করতে হবে। বেশ কয়েক মিনিট ধরে খেলা বন্ধ থাকে। আর বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল, বিশ্বকাপের মতো আসরে একজন ফুটবল সংগঠক বা রাজপরিবারের সদস্য কীভাবে রেফারির ওপর প্রভাব খাটাচ্ছেন।

সবাইকে আরও স্তম্ভিত করে দিয়ে রেফারি স্তুপার যুবরাজের হুমকির কাছে মাথা নত করেন। তিনি জিরেসের দেওয়া বৈধ গোলটি বাতিল করে দেন এবং ড্রপ বলের মাধ্যমে খেলা পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেন। ফরাসি খেলোয়াড়রা তখন রাগে ফুঁসছিলেন। আমোরোস পরে টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, 'তিনি (প্রিন্স ফাহাদ) এমন আচরণ করেছিলেন যেন তিনিই ফিফার প্রেসিডেন্ট!'

তবে কুয়েতের ওই 'জয়' বেশিক্ষণ টেকেনি। মিনিট দশেকের মধ্যেই ফ্রান্স আবারও গোল করে এবং শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানেই ম্যাচটি জিতে নেয়। কিন্তু কুয়েতের যুবরাজ ও রেফারির মাধ্যমে ঘটা নাটকীয়তা ফুটবলের স্বচ্ছতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

ম্যাচ শেষে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা চরম কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। মাঠে এমন নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়ায় রেফারি স্তুপারকে আজীবনের জন্য আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনায় নিষিদ্ধ করা হয়। অন্যদিকে, প্রিন্স ফাহাদকে দিতে হয় জরিমানা। কুয়েত তাদের শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।

প্রিন্স ফাহাদ সেদিন ক্ষণিকের জন্য একটা গোল রুখে দিতে পেরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ফুটবলের চিরায়ত সত্যকে বদলাতে পারেননি। আর ১৯৮২ সালের পর থেকে কুয়েত এখন পর্যন্ত পারেনি বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরতে। সেই 'অভিশপ্ত' মুহূর্তটিই হয়তো তাদেরকে ঠেলে দিয়েছে এক দীর্ঘ বিরহের পথে।