আমরা কারও দ্বারা প্রভাবিত নই: ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা
এবার বিশ্বকাপে খেলা ছাপিয়েও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিতর্কিত রেফারিং। একাধিক ম্যাচে রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখিত অভিযোগ জানাতে দেখা গেছে একাধিক দলকে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে সেই বিতর্ক উঠে তুঙ্গে। প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয় দাবানলের মতো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ফিফা প্রধানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনকলের পর। তবে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলছেন, তারা কারও দ্বারা প্রভাবিত নন।
৪৮ দলের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ৯৬ ম্যাচ শেষ হওয়ার পর রেফারিংয়ের মান, ভিএআর-এর কার্যকারিতা এবং ম্যাচ অফিশিয়ালদের ওপর আসা নানা চাপ নিয়ে মুখ খুলেছেন কলিনা। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ফিফা রেফারিং সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এটি কারও দ্বারা প্রভাবিত হয় না।
তবে কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় বেশি ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে কিছু জিনিস প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও হতে পারে বলে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি, ‘শুরুতেই বলা যাক, কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে আমরা এবার ৫০% বেশি ম্যাচ খেলে ফেলেছি। এখনও আটটি বড় ম্যাচ বাকি আছে। সামগ্রিকভাবে আমরা খুশি। তবে অল্প সময়ে এত বেশি ম্যাচ হওয়ায় কিছু বিষয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। তেমন কিছু ঘটলে পরের ম্যাচের জন্য নিজেদের শতভাগ প্রস্তুত করতে তারা আরও কঠোর পরিশ্রমের জন্য তৈরি থাকে।’
তার মতে, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই, তবে সেসব যেন ভিত্তিহীন না হয়, ‘সিদ্ধান্ত নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা সবসময়ই ফুটবলের অংশ। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগের কোনো স্থান এই খেলায় নেই। ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ অফিশিয়ালদের সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। এমন অভিযোগের কারণে অনেক সময় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা রেফারি ও তাদের পরিবারের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি মোটেও সঠিক নয়।’
রেফারিং বিভাগের ওপর ফিফা প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না উল্লেখ করে কলিনা বলেন, ‘কেউ দাবি করতে পারে না যে ফিফা রেফারিং কারও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, এমনকি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দ্বারাও নয়। তিনি আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন এবং সবসময় ফিফা টিম ওয়ানের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন দেখিয়েছেন।’
আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের চরম বিতর্ক ও কলিনার ব্যাখ্যা:
চলমান টুর্নামেন্টে রেফারিং ও ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও চরম বিতর্ক তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে ম্যাচের কিছু ফাউল এবং পেনাল্টি বা গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় তুমুল বিতর্ক চলছে।
সাধারণত টুর্নামেন্ট চলাকালীন সুনির্দিষ্ট কোনো ম্যাচ বা ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতে চান না ফিফার এই রেফারিং প্রধান। তবে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের এই চরম বিতর্ক নিয়ে এবার নিজেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন কলিনা।
গোলের আগে আক্রমণের সময়ে (বিল্ড-আপ) ভিএআর-এর ভূমিকা পরিষ্কার করতে গিয়ে কলিনা এই ম্যাচের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচে মিশরের ১৯ নম্বর জার্সিধারী মারওয়ান আত্তিয়া স্পষ্টভাবেই আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, ফাউল মানে ফাউলই। ফাউলটি স্পষ্ট মনে হোক বা না হোক, রেফারি যদি মাঠে এটি দেখতে না পান, তবে ভিএআর সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে। গোল থেকে দূরত্ব কতখানি ছিল বা ঘটনার কতক্ষণ পর গোল হয়েছে, সেটির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।’
একই ম্যাচের শেষদিকে তৈরি হওয়া আরও একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে কলিনা বলেন, ‘আবার যদি গোলের আগে কোনো ফাউল না থাকে, তবে ভিএআর রেফারিকে সেই অনুযায়ী পরামর্শ দেয়। যেমন ওই ম্যাচেরই শেষদিকে মোহামেদ সালাহ ও হুলিয়ান আলভারেসের মধ্যকার ঘটনাটিকে রেফারি এবং ভিএআর সাধারণ ফুটবলীয় যোগাযোগ (কন্ট্যাক্ট) হিসেবেই গণ্য করেছিল। কারণ ডিফেন্ডার আগে বল স্পর্শ করেছিলেন এবং পরে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।’
তবে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের বিল্ডআপে ম্যাক অ্যালিস্টারের মিশরের হামদি ফাথির জার্সি ধরে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় কেন ভিএআর হস্তক্ষেপ করেনি, সেই ব্যাপারে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ট্রাম্পের ফোনকল:
দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ গোলে হারানোর ম্যাচে লাল কার্ড দেখেছিলেন বালোগান। কিন্তু শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়ে তা প্রত্যাহার করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই জানান যে, সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে তিনি ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন। শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। কড়া বিবৃতি দেয় ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্থা উয়েফা। ট্রাম্পের ফোনকলের পরপর বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ায় তা নিয়ে চরম সমালোচনা চলে ফুটবল বিশ্বে। কিন্তু এই ব্যাপারে আর নতুন করে কিছু বলেননি কলিনা।
একই রকম ঘটনায় বিভিন্ন ম্যাচে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আসায় রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠছিল।