আর্জেন্টিনার হয়ে ‘ব্যর্থ’ মেসি যেভাবে সমালোচনা পেরিয়ে ইতিহাসের নায়ক
‘ক্লাবের মেসি আর জাতীয় দলের মেসি এক নন’— ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় এই একটি নির্মম অপবাদ তাড়া করে বেরিয়েছে লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে যখন একের পর এক রেকর্ড ভাঙছিলেন, শিরোপার পাহাড় গড়ছিলেন, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ তাকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
নিন্দুকদের স্পষ্ট ধারণা ছিল, স্পেনে পাওয়া সাফল্যের পুনরাবৃত্তি তিনি দেশের মাটিতে কখনোই করতে পারবেন না। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সব সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর।
একসময় যাকে জাতীয় দলের ব্যর্থতার প্রতীক ভাবা হতো, সেই মেসিই এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত নায়ক। তিনি প্রমাণ করেছেন, অটুট নিষ্ঠা থাকলে ইতিহাস কীভাবে নিজের হাতে নতুন করে লিখতে হয়।
জন্মভূমির প্রতি অটুট ভালোবাসা
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া এই খুদে জাদুকরের ফুটবলের হাতেখড়ি হয়েছিল বাবা হোর্হের হাত ধরে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তার পায়ে বলের অনন্য জাদু দেখা যায়। ১৯৯৫ সালে তিনি যোগ দেন স্থানীয় ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে।
তবে মাত্র ১১ বছর বয়সে গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যায় তার ক্যারিয়ার এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। চিকিৎসার আকাশচুম্বী খরচ চালানো তার মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
সেই চরম সংকটে ত্রাতা হয়ে আসে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। ন্যাপকিন পেপারে করা সেই ঐতিহাসিক চুক্তির পর স্পেনের লা মাসিয়া একাডেমি থেকেই শুরু হয় বিশ্ব ফুটবলের এক মহানায়কের পথচলা। বার্সার হয়ে ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ১০টি লা লিগাসহ রেকর্ড ৩৫টি শিরোপা জেতেন বর্তমানে ইন্টার মায়ামিতে খেলা এই ফরোয়ার্ড।
বার্সেলোনায় বেড়ে ওঠার কারণে কিশোর বয়সে তার স্পেনের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু নাড়ির টান আর জন্মভূমির প্রতি নিখাদ ভালোবাসায় সেই প্রস্তাব সরাসরি ফিরিয়ে দেন মেসি। তার স্বপ্ন ছিল শুধুই আর্জেন্টিনার বিখ্যাত আকাশি-সাদা জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করা।
২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ যুব বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল ও বুট জিতে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। এরপর ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকেও নাইজেরিয়াকে হারিয়ে জেতেন স্বর্ণপদক। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার যুব পর্যায়ের পথচলা শুরু হয়েছিল রাজার মতোই।
কিন্তু সিনিয়র পর্যায়ে এসে অপেক্ষাটা ছিল দীর্ঘ ও চরম বেদনার। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায় তার দল। এরপর ২০১১ সালে ঘরের মাঠের টুর্নামেন্টেও বিদায় নিতে হয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে।
২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে উঠেও যখন চিলির কাছে টানা দুবার টাইব্রেকারে রানার্সআপ হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়, তখন যন্ত্রণার মাত্রা এতটা তীব্র ছিল যে, ২০১৬ সালে তিনি সাময়িক অবসরের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির মহাকাব্য
বিশ্বমঞ্চে মেসির মহাকাব্যের শুরু ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বদলি নেমে গোল ও অ্যাসিস্ট করে নিজের আগমনী বার্তা জানান দেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাকে মাঠে না নামানোর কোচ হোসে পেকারম্যানের সিদ্ধান্ত আজও ফুটবলবিশ্বে বড় এক রহস্য।
ডাগআউটে বসে মেসির অশ্রুসজল চোখে দলের বিদায় দেখার দৃশ্যটি ছিল যেকোনো ফুটবল ভক্তের জন্য হৃদয়বিদারক। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করলেও কোয়ার্টার ফাইনালে সেই জার্মানির কাছে ৪-০ গোলের হার ছিল বিশাল এক ধাক্কা।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে অধিনায়ক মেসি আর্জেন্টনাক ফাইনালে নিয়ে যান। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে জেতেন টুর্নামেন্ট সেরার গোল্ডেন বল। কিন্তু মারিও গোটজের অতিরিক্ত সময়ের সেই একমাত্র গোলটি মেসির হাত থেকে ট্রফিটি কেড়ে নেয়। ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির বিষণ্ণ মনে হেঁটে যাওয়ার ছবি কাঁদিয়েছে পুরো বিশ্বকে।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আলবিসেলেস্তাদের। গ্রুপ পর্বের বাঁধা কোনোমতে পেরিয়ে শেষ ষোলোতে ফরাসিদের কাছে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় দলকে। মেসি যেন তখন ট্র্যাজিক হিরো।
অবশেষে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ যেন ছিল ঈশ্বরের নিজের হাতে লেখা এক অনন্য চিত্রনাট্য! প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে খাদের কিনারে চলে যাওয়া দলটিকে টেনে তোলেন অধিনায়ক নিজেই। মেক্সিকো ম্যাচ থেকে শুরু হয় মেসির একক আধিপত্য।
ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ঘুচে যায় ৩৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বজয়ের খরা। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ গোল ও চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সে ক্যারিয়ারের সেরা ট্রফি বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেন মেসি, সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো জিতেন গোল্ডেন বল।
ব্যর্থতার অভিযোগ থেকে ইতিহাসের নায়ক
কাতার বিশ্বকাপের আগে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ই ছিল মেসির সিনিয়র ক্যারিয়ার পরিবর্তনের মূল ভিত্তি। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা ঘুচিয়েছিলেন তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও শীর্ষ গোলদাতার পুরস্কারও যায় তার ঝুলিতে।
সাফল্যের সেই ধারা বজায় রেখে ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জেতেন ফিনালিসিমা। এরপর পরম আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি। আর ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনা। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন একদম ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তিনবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে— ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ২০০২ সালের আসরে। এর সবগুলোই ঘটেছে মেসির জাতীয় দলে আসার আগে।
পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মেসি ১৩টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা মিলিয়ে) অংশ নিয়ে দলকে সাতবার ফাইনালে তুলেছেন। জিতেছেন ফিনালিসিমাসহ চারটি মেগা শিরোপা।
আজ ২৪ জুন, ইতিহাসের এই মহানায়কের ৩৯তম জন্মদিন। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির অর্জনের খাতা এখন কানায় কানায় পূর্ণ। যুব বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গোল্ড, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ— সবই এখন তার শোকেসে শোভা পাচ্ছে।
মেসির জন্মদিনে কোটি কোটি ভক্তের প্রত্যাশা একটাই— বিদায়টাও হোক বীরের বেশে। বিশ্বকাপের শুরুতেই দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে তিনি ইতোমধ্যে রাঙিয়ে তুলেছেন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এই দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে আরেকবার শিরোপা উঁচিয়েই ধরতে পারে আর্জেন্টিনা!